আনচেলত্তির ভুল পরিকল্পনায় ব্রাজিলের ভরাডুবি

Slider খেলা

মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের ড্রয়ের পর কার্লো আনচেলত্তির ফাঁকফোকর বের হয়েছিল। পর্যালোচনার পর সেই ভুলগুলো শুধরে নেন কোচ। হাইতির বিপক্ষে এই ইতালিয়ান ট্যাকটিশিয়ানের গেম প্ল্যান বেশ ভালোভাবে কাজ করেছিল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের ফিরে পায় সেলেসাওরা। আর জাপানের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো জয়ে যেন তাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে উঠেছিল।

প্রতি ম্যাচেই উন্নতি। কখনো নরওয়ের বিপক্ষে না জিতলেও শেষ ষোলো উতরে যাওয়ার বিশ্বাস ছিল মনে। কিন্তু ২৪ বছর ধরে চলা একটি গেরোতে আটকে গেল তারা। ২০০২ সালের পর থেকে নকআউটে ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষের কাছে হেরে চলেছে সেলেসাওরা। এবারও পারল না।

বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। আসলে এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। বলা যাবে না ব্রাজিল তাদের মতো খেলেছে। মূলত নরওয়ের বিপক্ষে আনচেলত্তির পরিকল্পনা কাজে আসেনি।

শুরু থেকে ব্রাজিল নরওয়ের জন্য ফাঁদ পাততে চেয়েছিল। প্রতিপক্ষকে বল দিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটা খুব কমই কাজ করেছে। প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারেসের পেনাল্টি মিস হয়েছে। গোলটা হলে খেলা ভিন্ন ধাঁচের হতো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সেলেসাওরা তাদের প্রথার বাইরে গিয়ে খেলার বাজি ধরেছিল। যখন সুযোগ এসেছিল, তারা সেটা লুফে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

নরওয়ে গোলকিপার নাইলান্ড ভালো কিছু সেভ করেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, অনেক বেশি শট ছিল ব্রাজিলের। কিন্তু তারা প্রায় সময় বল দিয়ে রেখেছিল নরওয়ের পায়ে। শেষ করতে হয়েছে হারের যন্ত্রণা নিয়ে। মাথা ও বাঁ পা দিয়ে গোল করে তাদের ‘জাতীয় শত্রু’ হয়ে গেছেন হালান্ড।

দ্বিতীয়ার্ধে কিছু অদলবদল ব্রাজিলিয়ান দলকে আরও দুর্বল করে ফেলে। নরওয়ে ম্যাচে ফিরে আসে এবং ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয় আনচেলত্তির দলকে।

বল নরওয়ের পায়ে রেখে আক্রমণে যাওয়ার কৌশল শুরুতে এতটুকু কাজে লাগেনি। প্রথম ১০ মিনিটে ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষের পজেশন ছিল ৮০ শতাংশ।

ম্যাচ শুরু হওয়ার দুই মিনিট যেতেই নরওয়ের গোল। বার্গের সেই গোলটি সোরলোথের অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। গোল না হলেও ব্রাজিল কিছুটা চমকে গিয়েছিল। ছন্দ ও জায়গা খুঁজে পেতে তারা বেশ সময় নিয়েছে। খেলোয়াড়রা যখন পজিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরপর ব্রাজিল সেরা মুহূর্তের মুখোমুখি হয়। বলের ওপর চাপ তৈরি করে গোলের সুযোগ তৈরি করে।

এভাবেই রায়ান দুইবার চ্যালেঞ্জ জেতেন। কুনহাকে দিয়ে গোল বানানোর সুযোগ করে দেন মার্তিনেল্লিকে। কুনহার আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে হিমশিম খায় নরওয়ে। তিনি ডি বক্সের মধ্যে ফাউলের শিকার হন। কাউন্টার অ্যাটাকের সুফল পায় ব্রাজিল। কিন্তু নাইলান্ড বড় ধাক্কা দেন। গিমারেসের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন।

বল দখলে না রাখলেও ব্রাজিলকে এই সময়ে ভুগতে দেখা যায়নি। জায়গা খুঁজে বের করে তারা বল নিয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ডানপাশে রায়ান সমর্থন পাচ্ছিলেন না। তবে বাম দিকে মার্তিনেল্লি ও ভিনির বোঝাপড়া ছিল ভালো। সাত নম্বর জার্সিধারীরা ভালো একটি সুযোগ নস্যাৎ করে দেন নাইলান্ড।

অন্যদিকে নরওয়ে পায়ে বল রেখেছিল বেশিরভাগ সময়। কিন্তু সৃজনশীলতার অভাব ছিল। হালান্ডকে সরাসরি পাস দিতেই বেশি মনোযোগী ছিল তারা। আর তাকে আটকাতে মাগালায়েস ও মারকুইনহোস ব্যস্ত ছিলেন। এই সময়ে জায়গা কিছুটা বের হয়ে যায়। সেই সুযোগে ওডেগার্ড দারুণ সুযোগ পান। কিন্তু আলিসন শেষ মুহূর্তে দারুণ সেভে প্রথমার্ধ দুই দলের দিকেই রাখেন।

দ্বিতীয়ার্ধের চিত্রনাট্য ছিল একই। ব্রাজিল কাউন্টার অ্যাটাকে নরওয়েকে চাপে রাখার চেষ্টা করেছিল। দ্রুতই তার সুফল পেয়ে যায়। কুনহার বদলি নামেন এন্দ্রিক। আক্রমণের গভীরতা বাড়ে। এক মিনিটেরও কম সময়ে সাফল্যের দেখা পেতে বসেছিলেন তিনি। ভিনির থ্রু বল ধরে শুধু গোলকিপারকে পেয়েও লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন এন্দ্রিক।

দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ মিনিট পর থেকে খেলা শারীরিক লড়াইয়ে রূপ নেয়। রায়ানের একটি শট নরওয়ের জন্য বিপদ ডেকে এনেছিল। তবে নরওয়েও হালান্ডকে ক্রস দিয়ে ব্রাজিলকে চাপে রাখতে তৎপর ছিল।

২২তম মিনিটে আনচেলত্তি আরেকবার পরিবর্তন আনেন। মার্তিনেল্লির বদলে দানিলো সান্তোস ও নেইমারকে রায়ানের বদলি নামান। তারপর থেকেই ব্রাজিল যেন ছন্দ হারায়। তাদের মোমেন্টাম হারানোর পর নরওয়ে জায়গা পেয়ে যায়।

শেলড্রুপের একটি শক্তিশালী শট ঠেকান আলিসন। নরওয়ের আক্রমণের ধার বাড়তে থাকে। বল ডিফেন্সের ডানদিক দিয়ে বেশি যাওয়ার কারণে গিমারেসের বদলি করা হয় এদারসনকে। কিন্তু লাভ হয়নি। শেলড্রুপের একটি ক্রস ব্রাজিলের বক্সের মধ্যে খুঁজে পায় হালান্ডকে। তার মার্কার মাগালায়েস যেন চমকে উঠেছিল। ধুমকেতুর মতো হালান্ডের আবির্ভাব ঠাহর করতে পারেননি তিনি। নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারের শক্তিশালী হেড নিখুঁতভাবে জালে জড়ায়। একে তো বলের দখল নেই, শক্তি নেই, সৃজনশীলতাও নেই। এমন সময়ে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল মহাবিপদের সম্মুখীন হয়।

তবুও ব্রাজিল সংগঠিত আক্রমণের চেয়ে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখাতেই মনোযোগ দেয়। বাঁ পায়ের শক্তিশালী শটে হালান্ড গোল করেন। ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে নেয় নরওয়ে। নাইলান্ডও দুর্ভেদ্য ছিলেন।

মূলত বলের দখল ছেড়ে দিয়ে ব্রাজিল নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে। মাত্র ৩৪ শতাংশ বল পজেশন, যা তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বনিম্ন। নরওয়ে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে তাদের প্রধান অস্ত্র হালান্ডকে দিয়ে। আনচেলত্তির পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে, ছিল মারাত্মক ভুল। আর দারুণ কয়েকটি সুযোগ পেয়েও সেগুলোকে গোলে রূপ দিতে না পারার দায় তো ছিলই। বলা যায়, এই হারের ব্রাজিলের বিদায়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *