
মো জাকারিয়া গাজীপুর: বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে মাদক। এক সময় সীমিত পরিসরে থাকা মাদকের বিস্তার এখন শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থাৎ যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের ভয়াল থাবায় আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে ধ্বংস হচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্ভাবনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু একজন মানুষের শরীর ও মনকেই ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবারের সুখ-শান্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনীতির ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের কর্মক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, সন্ত্রাস, পারিবারিক সহিংসতা ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
প্রায়ই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে বহু মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী গ্রেপ্তার হন এবং আইনের আওতায় আসেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে বড় মাদক কারবারি বা মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আবার নতুন করে শুরু হয় মাদকের ব্যবসা। এতে সমাজে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয় না।
মাদকের ভয়াবহ ক্ষতি
মাদকের কারণে—
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ে।
পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।
চুরি, ছিনতাই, হত্যা, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধের প্রবণতা বাড়ে।
কর্মক্ষম যুবশক্তি ধ্বংস হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
মানসিক ও শারীরিক নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হয়।
অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
একটি বাস্তবধর্মী উদাহরণ
ধরা যাক, একটি এলাকার একজন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী বন্ধুর প্ররোচনায় মাদক গ্রহণ শুরু করল। শুরুতে পরিবার বিষয়টি বুঝতে পারেনি। ধীরে ধীরে সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, পরিবারের টাকা চুরি করতে শুরু করে এবং পরে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তার ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং পরিবারকে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। এমন ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই দেখা যায়।
প্রতিকারে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
মাদক নির্মূলে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
প্রতিটি ওয়ার্ড, গ্রাম ও মহল্লায় মুরুব্বী, শিক্ষক, ইমাম, যুবসমাজ, জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের নিয়ে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা, আলোচনা, প্রচারণা ও নজরদারি পরিচালনা করবে।
যদি কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি বা সেবনের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে তা গোপনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো উচিত। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক, সামাজিক বা অন্য কোনো প্রভাব খাটিয়ে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
অভিভাবকদেরও সন্তানের চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের প্রতি নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
আমাদের অঙ্গীকার
মাদকমুক্ত সমাজ গঠন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং তরুণদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার হোক— “মাদককে না বলি, সুস্থ সমাজ গড়ি।”
মূল লক্ষ্য একটাই— মাদকমুক্ত সমাজ, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
