
মো জাকারিয়া : শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি সেবা—এই তিনটি খাত একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। একটি জাতির ভবিষ্যৎ, মানুষের জীবনমান এবং দেশের টেকসই উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে এই খাতগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সেবার মানের ওপর। তাই এসব খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো স্থান থাকতে পারে না।
হাসপাতাল কোনো সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি মানবিক ও জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যায়, তখন সে একজন গ্রাহক হিসেবে নয়, বরং একজন অসহায় নাগরিক হিসেবে যায়। তাই স্বাস্থ্যসেবাকে অতিরিক্ত মুনাফার প্রতিযোগিতায় পরিণত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার; এটি অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নয়।
একইভাবে শিক্ষা কোনো পণ্য নয়; এটি জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। একটি শিশু সঠিক শিক্ষা পেলে সে শুধু নিজের জীবনই গড়ে না, সমাজ ও রাষ্ট্রকেও এগিয়ে নিয়ে যায়। সুশিক্ষিত মানুষ দুর্নীতিকে ঘৃণা করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখে। তাই শিক্ষাখাতে দুর্নীতি মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করা।
ভূমি সেবাও মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, খাজনা বা অন্যান্য ভূমি সেবায় হয়রানি, অনিয়ম ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ায় এবং রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি আস্থা নষ্ট করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু যখনই এসব খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখন কিছু মানুষ নানা অজুহাতে সেই
উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন হলো—জনস্বার্থের চেয়ে কি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ বড় হতে পারে? বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে যদি মানসম্মত সেবা নিশ্চিত না হয়, তাহলে সেটি শুধু অনিয়ম নয়, জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণাও বটে। যেখানে অনিয়ম থাকবে, সেখানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে—সে প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালীই হোক না কেন।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন রোগী মানসম্মত চিকিৎসা পাবে, একজন শিক্ষার্থী সঠিক শিক্ষা পাবে এবং একজন নাগরিক ভূমি সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হবে না। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে সেবা হবে অধিকার, দুর্নীতি নয়; সততা হবে মূল্যবোধ, অনিয়ম নয়।
দল-মত, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি সেবায় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। কারণ এই লড়াই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; এই লড়াই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, সুশাসিত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার জন্য। জনকল্যাণের স্বার্থে যে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগকে সমর্থন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি সেবায় অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। এটিই হবে প্রকৃত জনকল্যাণের পথ।
