সরকারি দর কাগজে, বাজারে ধস : কোরবানির চামড়ায় বঞ্চিত গরিব-এতিমরা

Slider ফুলজান বিবির বাংলা


সরকার কাগজে-কলমে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে মিলেনি তার প্রতিফলন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পানির দামে বিক্রি হয়েছে কাঁচা চামড়া। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এতিমখানা, মাদ্রাসা ও গরিব মানুষ। কারণ প্রতি বছর কোরবানির চামড়ার টাকাই হয়ে ওঠে বহু এতিম শিক্ষার্থীর খাবার, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অন্যতম ভরসা। কিন্তু এবার কম দামে চামড়া বিক্রি হওয়ায় সেই অর্থও কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের লোকসানের পাশাপাশি বঞ্চিত হয়েছেন গরিব ও এতিমরাও।

ঈদুল আজহা এলেই কোরবানির পশুর চামড়া ঘিরে নতুন আশায় বুক বাঁধেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বছরের এই একটি সময়েই কিছু বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয় তাদের জন্য। কিন্তু এবারও সেই আশায় বড় ধাক্কা লেগেছে। সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও বাজারে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে বিক্রি হয়েছে কাঁচা চামড়া। ফলে চামড়া সংগ্রহ করে বড় আড়ত ও ট্যানারিতে বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

একই সঙ্গে প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ মাদ্রাসা ও এতিমখানার কর্তৃপক্ষও। কোথাও কোথাও কম দামে বিক্রি করতে না পেরে কাঁচা চামড়া ফেলে দিতেও দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ডাস্টবিন ও নর্দমায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া।

কোরবানির পশুর চামড়ার সরকারি মূল্য নির্ধারণ থাকলেও বাস্তব বাজারে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি– এমন অভিযোগ উঠেছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। ফলে পানির দামে বিক্রি হয়েছে কাঁচা চামড়া, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন গরিব মানুষ, এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো। প্রতি বছর কোরবানির চামড়ার অর্থ এতিম শিক্ষার্থীদের খাবার, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বড় একটি সহায়তা হলেও এবার কম দামের কারণে সেই আয়ের উৎস উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অনেক জায়গায় চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিতেও দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচা চামড়ার বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের একটি শক্তিশালী চক্র। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া কিনছেন এবং পরে আরও কম দামে বিক্রি করছেন।
এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা প্রতি বছরই ঘটে। তবে এখন পর্যন্ত যতটুকু চামড়া সংগ্রহ হয়েছে, তাতে আমরা মনে করি গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। গতকাল পর্যন্ত ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় চামড়া কেনা হয়েছে

এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত

কোরবানির পশুর চামড়া শুধু একটি পণ্যের নাম নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে গরিব, এতিম ও মাদরাসা ভিত্তিক সামাজিক সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রতি বছর কোরবানিদাতাদের বড় একটি অংশ পশুর চামড়া মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা অসচ্ছল মানুষের কল্যাণে দান করেন। সেই চামড়া বিক্রির টাকায় বছরের বিভিন্ন সময় এতিমদের খাবার, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার খরচের একটি অংশ জোগাড় হয়। ফলে চামড়ার দাম যত কমে, সরাসরি ততটাই কমে যায় গরিব ও এতিমদের প্রাপ্য অর্থ। বাজারে চামড়ার দরপতন মানে শুধু একটি শিল্পখাতের সংকট নয়, এর প্রভাব গিয়ে পড়ে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের ওপর।

এদিকে কোরবানির সময় কাঁচা চামড়ার দাম ঠিক রাখতে এবারও সরকার দাম নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত দামের প্রতিফলন বাজারে দেখা যায়নি। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো।

অনেক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশার তুলনায় অর্ধেকেরও কম অর্থ পেয়েছে, কোথাও কোথাও চামড়া বিক্রি করতেই পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা হাসানুর রহমান বলেন, কেউ কিনতে আসেনি আমরা চামড়া মাদ্রাসায় দিয়ে দিয়েছি। আমার মামার প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার গরুর চামড়াও গতকাল রাত পর্যন্ত কেউ নেয়নি। পরে সেটাও মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছে। আর পুরান ঢাকায় আমার ভাই ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকার গরুর চামড়া মাত্র ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছে।

সরকার নির্ধারিত দাম বাজারে অকার্যকর

সরকার এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দেয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। কিন্তু বাস্তবে সেই দাম কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। শুধু তাই নয় গত বছরের চেয়েও এবার কম দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া।

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে গত বছরের তুলনায় প্রতি পিস গরুর চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া এবারও ছাগলের চামড়া কিনতে তেমন আগ্রহ দেখাননি ব্যবসায়ীরা।

ট্যানারি-আড়তদার সিন্ডিকেটের অভিযোগ

রাজধানীর মুগদা এলাকার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, দাম কম পাওয়া যায় এই জন্য এবার কম দামে চামড়া কিনেছি। তারপরেও দাম পাইনি। ছোট গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়, মাঝারি ৩০০ থেকে ৫০০ আর বড় গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় কিনেছি। কিন্তু বিক্রি করেছি গড়ে ৪৫০ টাকায়। কম দামে কিনেও লস করেছি।

তিনি বলেন, অনেকে কালকে ফোন দিয়েছিল চামড়া নেওয়ার জন্য। দাম না পাওয়ায় তাদের চামড়াও আনি নাই। এনে লস করার কোনো মানে আছে?
চামড়ার বাজার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন পুরোনো ব্যবসায়ী আবুল হাসান। তিনি বলেন, ২৫-৩০ বছর আগে একটা চামড়া বিক্রি করেছি ২৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ওই সাইজের গরুর চামড়া এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। ৪০০ টাকার চামড়া কিনে শ্রমিকের খরচও ওঠে না। এই ব্যবসা করবে কে? এই খাত ধ্বংস করা হচ্ছে।

সরকার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দাম কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি পিস গরুর চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কম দামে চামড়া কিনেও লোকসানের মুখে পড়েছেন। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের একটি সিন্ডিকেট পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

পাশেই থাকা আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী প্রশ্ন তুলে বলেন, চামড়ার জুতার দাম কি কমেছে? কমেনি। তাহলে গরুর চামড়ার দাম এত কম কেন? এখানে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে, অথবা এই শিল্পটা ধ্বংস করার পাঁয়তারা চলছে।

কম দামের প্রভাব পড়েছে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোতেও। রাজধানীর জামিয়া কোরআনিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক হাফেজ ফয়জুল্লাহ বলেন, এতিমখানার জন্য ২০ জন মাদ্রাসার ছাত্র বিভিন্ন এলাকায় বাসায় ঘুরে ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করেছে। প্রায় ৮০টি চামড়া সংগ্রহ হয়েছিল। বিক্রি করেছি মাত্র ৩২ হাজার টাকায়। পুরো দিনের কষ্টটাই বৃথা গেছে। তাই আজ আর চামড়া আনতে যাইনি।

রাজধানীর লালবাগ পোস্তার ব্যবসায়ীরা জানান, সন্ধ্যার আগে যারা চামড়া নিয়ে এসেছেন তাদের কাছ থেকে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় চামড়া কেনা হয়েছে। তবে রাতে চামড়ার মান নষ্ট হতে শুরু করায় দামও অর্ধেকে নেমে আসে। ফলে পরে যারা চামড়া নিয়ে এসেছেন, তাদের কাছ থেকে মান অনুযায়ী কম দামে কিনতে হয়েছে।

যদিও ট্যানারি মালিকরা বলছেন, বাজারে খুব বেশি সমস্যা হয়নি। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা প্রতি বছরই ঘটে। তবে এখন পর্যন্ত যতটুকু চামড়া সংগ্রহ হয়েছে, তাতে আমরা মনে করি গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। গতকাল পর্যন্ত ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় চামড়া কেনা হয়েছে। এর সঙ্গে লবণ ও আড়তের খরচ যোগ করলে সরকার নির্ধারিত দামের মধ্যেই পড়ে।

তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে। তাদের দাবি, সরকার প্রতিবছর দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে সেই দামের কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। ফলে কোরবানির চামড়া ঘিরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা বরাবরের মতোই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। আর এর সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে গরিব, এতিম ও ছোট ব্যবসায়ীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *