
গাজীপুর: ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটিকরপোরেশনের প্রথম নির্বাচন হয়। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে হওয়া ওই নির্বাচনে মেয়র হয় বিএনপির কেন্দ্রিয় নেতা অধ্যাপক এম এ মান্নান। বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অধ্যাপক মান্নানকে তখন মেয়র হতে হয়েছে। ওই নির্বাচনে বিএনপির একটি বড় অংশ তীব্র বিরোধীতা করলেও তৃনমূল মানুষের কারণে মান্নান মেয়র হন। আর এডভোকেট আজমত উল্লাহ খানও নিজ দলের একটি বড় অংশের তীব্র বিরোধীতার কারণে পরাজিত হন। এই অবস্থায় অধ্যাপক মান্নান মেয়রের চেয়ারে বসলেও মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। এর কারণ ছিল সরকারী দল আওয়ামীলীগের তীব্র বিরোধীতা, তার দল বিএনপির একটি বড় অংশের অসহযোগিতা ও শত্রুতা। মেয়রের চেয়ার থেকে অধ্যাপক মান্নান একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই গ্রেপ্তারের নেপথ্যে আওয়ামীলীগের একটি বড় অংশ ও বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এক সাথে কাজ করেছেন। বিশেষ করে ওই সময় ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে পুলিশ ও গাজীপুরের সাংবাদিকদের একটি অংশ সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে সরকারী দলে থাকা ওই সাংবাদিকেরা অধ্যাপক মান্নানের চারপাশে ভ্রমরের মত আষ্টেপিষ্টে লেগে থেকে তার গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট তৈরী করেন। কথিত আছে মান্নানকে গ্রেপ্তারের সময় ঢাকার বাসা পর্যন্ত পুলিশের পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনজন সাংবাদিক ছিলেন। অধ্যাপক মান্নানকে গ্রেপ্তার করে গাজীপুর ডিবি অফিসে নিয়ে আসার পর এসপি হারুনের রুমে মিষ্টি বিতরণের দায়িত্বে ছিলেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও। বিএনপির নেতা ও গাজীপুর সিটির প্রথম মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নানকে গ্রেপ্তার করার প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ও মিষ্টিবিতরণকারীদের অধ্যাপক মান্নান চিনতে পেরেছিলেন তবে গ্রেপ্তারের পর। অধ্যাপক মান্নানকে একাধিকবার মেয়রের চেয়ার থেকে কারাগারে পাঠিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসা আসাদুর রহমান কিরণ সঙ্গতকারণেই ওই কুশিলব সাংবাদিকদের আস্থাভাজন ছিলেন। বিএনপির একটি অংশ ও আওয়ামীলীগের একটি বড় অংশ সহযোগিতা করে মান্নানকে মেয়রের চেয়ার থেকে কারাগারে রেখে কাউন্সিলর কিরণকে দিয়ে সিটি পরিচালনা করেন। ওই সময়ে আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও সাংবাদিকদের একটি অংশ কিরণের আস্থাভাজন হয়ে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছেন। এরপর জাহাঙ্গীর আলমের পালা। অধ্যাপক মান্নানকে মেয়াদপূূরণ করতে না দিয়ে লূটপাট করা রাজনৈতিক ও সাংবাদিকদের সেই চক্র জাহাঙ্গীরের সাথে মিশে যায়। শুধু মেশা নয়, মিডিয়া দেখভালের দায়িত্ব পালন করে ওই কুশিলবরা। জাহাঙ্গীরের টাকায় রাতারাতি বড় লোক হওয়া ওই কুশিলবরাই জাহাঙ্গীরকে ব্ল্যাকমেইল করে চেয়ার থেকে নামিয়ে দেয়। বিশেষ করে মেয়র মান্নানকে গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট ও জাহাঙ্গীরকে চেয়ার ছাড়া করার প্রেক্ষাপট তৈরী করে একই চক্র। জাহাঙ্গীরের পর তার মা জায়েদা খাতুনের নির্বাচনেও একই চক্র জাহাঙ্গীরের আস্থাভাজন ছিলেন। বর্তমানে গাজীপুর সিটির প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারও ওই চক্রের হাতে। মেয়র পদে মনোনয়ন পেয়ে মেয়র হতে চাইলে জনগনের পালস বোঝার জন্য শওকত সরকারকে নিকট অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে অধ্যাপক মান্নান ও জাহাঙ্গীর আলমের দু:সময় আসার সংকেত বুঝে উঠতে না পারা ও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রাপ্ত ভোট অনেকটাই চোখ খোলে দিতে পারে। শওকত সরকারের বাড়ি কাশিমপুর থানায় ধানের শীষের পরাজয়, টঙ্গীর একশ কেন্দ্র সহ গাজীপুর-২ ও ১ আসনে ফেল করা কেন্দ্র গুলোতে ধানের শীষের ভোট বিশ্লেষন থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনে চলা উচিত। অনেকে চায় শওকত সরকার মেয়র হউক। তবে তিনি মেয়রের যোগ্য কি না তার পরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে বিএনপি। তিনি যদি ভালো করেন তবে বিএনপি অবশ্যই মনোনয়ন দিবেন। আর যদি চক্করে পড়ে ছিটকে পড়েন তবে ইতিহাস হয়ে যাবেন এটাই স্বাভাবিক।
নগরবাসীর ধারণা, ভুলে গেলে মহাভুল হবে যে, এই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট মান্নান ও জাহাঙ্গীরকে হাতে হাড়িকেন ধরিয়ে দিয়ে এখন শওকত সরকারকে আলো দেখাচ্ছেন। গাজীপুর নগরবাসী চায়, তাদের ভোটে নির্বাচিত মেয়র পূর্ণমেয়াদে ক্ষমতায় থাকুক। ভালো কাজ করলে পরের বার ভোট দিবে না করলে দিবে না। তবে জনগনের ভোটে নির্বাচিত মেয়রকে বার বার জেলে রেখে বা চেয়ার থেকে নামিয়ে দিয়ে মানুষের টাকা লুটপাট করার প্রক্রিয়া নগরবাসীর পছন্দ নয়। গাজীপুর সিটিকরপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোন নির্বাচিত মেয়র মেয়াদপূরণ করতে না পারার আক্ষেপ যেন আর করতে না হয়, সে আশা ভোটারদের। পাশাপাশি যারা মেয়র হতে চাইবে তাদেরও জনগনের পালস বুঝে ষড়যন্ত্রকারী কতিপয় বিএনপি-আওয়ামীলীগ ও কুশিলবদের থেকে দূরে থাকতে হবে। না হয় ইতিহাস ইতিহাসের গতিতেই চলবে। কারণ ইতিহাস ইতিহাসের গতিতেই চলে। কেউ লিখুক বা না লিখুক, প্রকৃতিগতভাবেই ইতিহাস লেখা হয়ে যায়। আর ইতিহাসের পরিণতি বাধ্য হয়েই ভোগ করতে হবে এটাই বাস্তবতা।
