আপনিও নেই তো নজরদারিতে?

Slider সারাবিশ্ব

bb7adb8eea5b0aecbe25eb63269ab953-5a2433e102b8e

 

 

 

 

সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্তের জন্য সামরিক বাহিনীর বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে নিউইয়র্ক নগর পুলিশ। সেলফোন সিগন্যাল ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান নির্ণয়ের এই প্রযুক্তি অন্য বেশ কয়েকটি শহরের মতোই নিউইয়র্ক পুলিশ ব্যবহার করছে। ২৫ নভেম্বর বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্টিংরেস নামের এ বিশেষ ডিভাইস দিয়ে গোপনে বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর নজরদারি করা যায়। সেলফোন সিগন্যাল ব্যবহার করে এই নজরদারির কাজটি করা হয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ফোনটি ব্যবহার না করলেও সেলফোন টাওয়ার ব্যবহার করে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে পুলিশ। এমনকি এই ডিভাইসের অত্যাধুনিক কিছু সংস্করণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ফোনে যাবতীয় তথ্যও সংগ্রহ করতে পারে পুলিশ বিভাগ। ছোট এই যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধের জন্য এরই মধ্যে নিউইয়র্কের নাগরিক সমাজ দাবি জানিয়েছে।
নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘনে এই যন্ত্র ভয়াবহ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে লিগ্যাল এইড সোসাইটির আইনজীবী জেরোম গ্রেকো এপিকে বলেন, ‘আমরা এমনকি এ-ও জানি না যে এই যন্ত্র কোন মাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকারকে ভয়াবহভাবে খর্ব করছে।’

আমেরিকার ২৪টি অঙ্গরাজ্যের অন্তত ৭২টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই যন্ত্র ব্যবহার করছে। কিন্তু এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ যন্ত্রটি ব্যবহারের অনুমোদন পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এফবিআইয়ের সঙ্গে এর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে চুক্তিতে আসতে হয়।
এ বিষয়ে এফবিআইয়ের এক মুখপাত্র বলেন, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চুক্তির আওতায় যন্ত্রটি তৈরি করে হ্যারিস করপোরেশন। এই চুক্তি এমনভাবে তৈরি, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত কোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ না পায়। কিন্তু কোনো একটি তদন্তে নিযুক্ত কর্মকর্তা চাইলে তদন্তের জন্য এই যন্ত্র ব্যবহারের কথা সরকারি কৌঁসুলিকে জানাতে পারেন।
নিউইয়র্কে গত বছর পর্যন্ত এই যন্ত্রের ব্যবহারের বিষয়টি গোপন ছিল। সে সময় নিউইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন নিউইয়র্ক পুলিশকে এই যন্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য করে। সে সময়ই জানা যায় যে ২০০৮ সাল থেকে অন্তত ১ হাজার তদন্তে এই যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক পুলিশের তথ্যমতে, ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন অপহরণ, যৌন নিপীড়ন, হত্যা, ডাকাতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করতে স্টিংরেস ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে বের করতেও এই যন্ত্রের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। যদিও এসব অর্জনকে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার জলাঞ্জলি দেওয়ার বিপরীতে অনেক ছোট অর্জন বলে আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের আইনজীবী জেনিফার লিঞ্চ বলেন, ‘আমাদের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে অযৌক্তিক তল্লাশি ও নজরদারি থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা রাষ্ট্র পত্তনের সময়ই কিছু অধিকারকে সুরক্ষা দিয়েছেন, যেখানে সরকারি হস্তক্ষেপকে সীমিত করা হয়েছে। স্টিংরেসের মতো প্রযুক্তি এই সবকিছুকেই খর্ব করছে।’
এদিকে বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগে থেকে পরোয়ানা জারিসহ বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব করেছেন। বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এরই মধ্যে কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। কিন্তু নিউইয়র্কে এখনো এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন মহল থেকে সৃষ্ট প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রযুক্তিটি ব্যবহারের আগে পরোয়ানা জারির বাধ্যবাধকতা চালুর কথা বলেছে, কিন্তু এখনো বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি।
এদিকে বিনা পরোয়ানায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রমাণ সংগ্রহের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক মামলাই আটকে যাচ্ছে বিভিন্ন আদালতে। দুই মাস আগেই ওয়াশিংটন ডিসির আপিল আদালতে যৌন হয়রানির একটি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া পেয়েছেন, শুধু তাঁর বিরুদ্ধে সংগৃহীত প্রমাণাদি বিনা পরোয়ানায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করার কারণে। একইভাবে গত মাসে নিউইয়র্কের আদালত একটি খুনের মামলায় একই ধরনের আদেশ দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, স্টিংরেস ব্যবহারের আগে একজন বিচারকের কাছ থেকে এ-সম্পর্কিত অনুমতি নিতে হবে। শুধু সন্দেহের বশে কারও বিপরীতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না।
এ অবস্থায় নাগরিক সমাজের নেতারা আশা করছেন, শিগগিরই নিউইয়র্ক পুলিশ বিনা পরোয়ানায় স্টিংরেস প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে সরে আসবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকারের প্রতি সরকারের সব মহল যথাযথ সম্মান দেখাবে। এ বিষয়ে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের জন্য একটি আইনি রক্ষাকবচ তৈরি করবে, যা স্থাপিত হবে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মূল ভিত্তির ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *