কারা রেখেছিল মতিঝিলের ‘ছাতা বোমা’?

Slider জাতীয়


রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম ও নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা মতিঝিল থেকে শক্তিশালী ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধারের আট দিন পার হলেও অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে নগরের নিরাপত্তা নিয়ে। এক্ষেত্রে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর অকেজো থাকা। ফলে বিস্ফোরকটি কে বা কারা রেখে গেছে, তারা কোন দিক দিয়ে এসেছে কিংবা ঘটনার আগে-পরে তাদের গতিবিধি কেমন ছিল, তার কোনো ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার মতো কার্যকর আলামতও মেলেনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে জানান, প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রাকে লক্ষ্য করেই আইইডিটি রাখা হয়েছিল। শোভাযাত্রাটি ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। আর ঠিক সেই পথেই একটি ছাতার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল শক্তিশালী এই বিস্ফোরক।

তিনি জানান, দায়িত্বে থাকা এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ছাতার ভেতর থেকে লাল আলো জ্বলতে দেখে সন্দেহ করেন এবং বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ডিএমপি কন্ট্রোল রুমে জানান। পরে সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে রথযাত্রার পথ পরিবর্তন করা হয় এবং শর্ট সার্কিটের অজুহাত দেখিয়ে এলাকাটি দ্রুত খালি করা হয়। পরে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে আইইডিটি নিষ্ক্রিয় করে। যদিও নিষ্ক্রিয় করার ওই প্রক্রিয়ায় এক পথচারী আহত হন।

সিটিটিসির বোমা বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইইডিটির ভেতরে প্রায় এক থেকে দেড় কেজি সালফার, বৈদ্যুতিক সার্কিট, দুটি ৯ ভোল্ট ব্যাটারি এবং জিআই পাইপের ভেতরে অসংখ্য লোহার বিয়ারিং বল ব্যবহার করা হয়েছিল। বিস্ফোরণে সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করতেই এসব স্প্লিন্টার ব্যবহার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে খয়েরি রঙের ছাতার পোড়া কাপড়, ছাতার বাঁট, ব্যাটারির খণ্ডাংশ, ছাতার রড, জিআই পাইপের টুকরা এবং ১২টি বিয়ারিং বল উদ্ধার করা হয়েছে।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আইইডিটি অত্যন্ত সুকৌশলে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে কেউ কৌতূহলবশত ছাতাটি খুলতে গেলে কিংবা হাতলের সুইচে চাপ দিলেই শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া এটি কোনো সাধারণ বিস্ফোরক ছিল না; বরং সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করতে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক তৈরি করা হয়।
তদন্ত চলছে। তবে এই মুহূর্তে নতুন করে জানানোর মতো কোনো তথ্য নেই। এখন পর্যন্ত কেউ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা সম্ভব হয়নি
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদ

তবে ঘটনার আট দিন পরও তদন্তকারীরা নিশ্চিত হতে পারেননি, এটি কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সুপরিকল্পিত হামলা ছিল নাকি অন্য কোনো নাশকতাকারী চক্রের কাজ ছিল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত এগোচ্ছে।

ঘটনার পরপর মতিঝিল থানা-পুলিশের পাশাপাশি তদন্তে নামে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এটি কোনো সংগঠিত জঙ্গি গোষ্ঠীর কাজ নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সমীচীন হবে না
সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, তদন্ত চলছে। তবে এই মুহূর্তে নতুন করে জানানোর মতো কোনো তথ্য নেই। এখন পর্যন্ত কেউ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা সম্ভব হয়নি।

সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এটি কোনো সংগঠিত জঙ্গি গোষ্ঠীর কাজ নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

নগর নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা না হলেও উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ, কয়েক মাস আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলোতে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এরপর কিছু ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের সময় পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে হলেও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে যেগুলো সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতার দিকে ইঙ্গিত করে। এর মধ্যে রয়েছে, কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ ও পরবর্তীতে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার; তদন্তে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্ভাব্য অনলাইন যোগাযোগের প্রমাণ; পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ সংগঠন ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি)-সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল লিংকের তথ্য যাচাই এবং নতুন উগ্রবাদী সেল হিসেবে আলোচনায় আসা ‘ফাতাহ কমব্যাট গ্রুপ’-এর কার্যক্রম। সর্বশেষ মতিঝিল থেকে শক্তিশালী আইইডি উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জঙ্গি নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিরোধমূলক অভিযান পরিচালনা ছিল পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর মূল কাজ। তবে বর্তমানে তারা নিয়মিত অন্যান্য অপরাধ দমন, মাদক উদ্ধার, ছিনতাই প্রতিরোধ ও নিয়মিত মামলার তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত আছে। এতে তাদের মূল দায়িত্বে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর পাশাপাশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল সংকটকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অতীতে সন্ত্রাসবাদ দমনে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিটিটিসিতে পদায়ন করা হলেও সম্প্রতি সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হচ্ছে না। দীর্ঘদিন এ বিষয়ে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা অনেক দক্ষ কর্মকর্তাকে অন্যান্য ইউনিটে বদলি করার ফলে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এখন সন্ত্রাসবাদ দমনে গঠিত বিশেষায়িত দুই সংস্থা, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সম্প্রতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক জানান, সিটিটিসির অধীনে শুধু কাউন্টার টেরোরিজম নয়, আরও কয়েকটি বিভাগ রয়েছে এবং সব বিভাগই সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *