দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ফ্রাঙ্কো, কিংবদন্তি এই আর্জেন্টাইন জাদুকরকে ডাকা হয় ফুটবল-ঈশ্বর নামে। তার প্রসঙ্গ এলে মাঠের সব জাদুকরী নৈপুণ্য আর বিতর্ক একইসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়! তিনি নিজেও ফিফার অনুরোধে নিজের পছন্দের পাঁচটি মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে দুটি মিশ্র অনুভূতিই তুলে ধরেছেন। ফুটবল, রাজনীতি, সামাজিক আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ– সবক্ষেত্রেই অবদান ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী ম্যারাডোনার।
১৯৬০ সালের অক্টোবরে ম্যারাডোনার জন্ম আর্জেন্টিনার লানুস এলাকায়। বুয়েনস আয়ার্সের দক্ষিণ উপকণ্ঠের দরিদ্র অঞ্চলে বেড়ে ওঠার ফাঁকেই কিশোর বয়সে তিনি ফুটবল প্রতিভা দেখিয়ে নজর কাড়েন। ৮ বছর বয়সে পাড়ায় খেলতে গিয়ে এক ট্যালেন্ট স্কাউটের নজরে পড়েন ম্যারাডোনা। ১২ বছর বয়সে বুয়েনস আয়ার্সের জুনিয়র দল লস সেবোলিটাস এবং চার বছরের ব্যবধানে অভিষেক হয় আর্জেন্টাইন প্রিমেরা ডিভিশনে। যেখানে তিনি আর্জেন্টিনোস জুনিয়রর্সের হয়ে খেলতে নামেন লিগটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে। ৫ বছরে দলটির জার্সিতে ১৬৭ ম্যাচে করেন ১১৫ গোল।
মাত্র ১৬ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় ম্যারাডোনার। জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি ৯১ ম্যাচে ৩৪ গোল করেন। ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসিই কেবল ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং সিনিয়র বিশ্বকাপ দুই আসরেই গোল্ডেন বল জিতেছেন। ম্যারাডোনা জেতেন ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালে, আর মেসি ২০০৫ ও ২০১৪ সালে। ১৯৮২ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই ম্যারাডোনা বিতর্কের সূচনা করেন।
ইতালির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি বিশেষভাবে স্মরণীয়, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার ক্লদিও জেন্টাইল ম্যারাডোনাকে আক্রমণাত্মকভাবে মার্কিং করছিলেন। কিন্তু প্রতিবাদ করায় তাকেই উল্টো হলুদ কার্ড দেখতে হয়। অবশ্য টুর্নামেন্টজুড়েই বারবার ফাউলের শিকার হয়ে আসছিলেন সে সময়ের আর্জেন্টাইন কিশোর। ব্রাজিল ম্যাচে ৮৫ মিনিটে মেজাজ হারিয়ে জোয়াও বাতিস্তার বুকে লাথি করে বসেন। লাল কার্ড দেখা সেই ঘটনা নিয়ে পরে তিনি ফিফার ভিডিওতে ৩-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা এবং দর্শকদের তুমুল উল্লাসে বিরক্ত হয়ে ভুল মানুষকে আঘাত করার কথা স্বীকার করেন। আর্জেন্টিনাও বিদায় নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডেই।
ম্যারাডোনার স্মরণীয় আসর ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর পথে ম্যারাডোনা ছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়। পুরো আসরে তিনি ম্যাচের মাঝে বদলি ওঠেননি, করেছেন ৫টি করে গোল ও অ্যাসিস্ট। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে তিনি করেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দুটি গোল। ফরাসি পত্রিকা লেকিপ তাকে আখ্যা দেয় ‘অর্ধেক ফেরেশতা, অর্ধেক শয়তান’ হিসেবে। রিপ্লেতে দেখা যায়, প্রথম গোলটি তিনি হাত দিয়ে করেছিলেন।
যা নিয়ে পরে ম্যারাডোনা বলেন, গোলটি হয়েছিল ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ ফলে সেটি পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে ইতিহাসে স্থান পায়। ২০০৫ সালে এক টিভি সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনা স্বীকার করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই হাত ব্যবহার করেছিলেন। একই ম্যাচে তার করা দ্বিতীয় গোলটি ফিফার ভোটে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোল নির্বাচিত হয়। যা নিয়ে ম্যারাডোনা ফিফার সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এরকম গোল আমি আর কখনোই করিনি। কিছু গোল করেছি যেগুলো স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা কঠিন, আর এই গোলটি ছিল বিশ্বকাপে।’
‘সব শিশুই এরকম একটি গোল করার স্বপ্ন দেখে। আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি যে ড্রিবলিং করে তাদের অনেককে পেছনে ফেলে যাচ্ছি, (ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার) শিলটনকেও। এখনও বুঝি না সে আসলে কী করেছিল। আমি জানি না আসলে কী হয়েছিল। মনে হয় তাকে কোনো ভূত বা ইউএফও নিচে নেমে এসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পুরো গোলবার সে আমার জন্য একেবারে খুলে রেখেছিল। আমি তাকে শুধু পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম এবং এরকমই ছিল ব্যাপারটি।’ সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আরও দুটি গোল করেন ম্যারাডোনা, ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জয়সূচক গোলে অ্যাসিস্ট করে তুলে ধরেন নিজের প্রথম বিশ্বশিরোপা।
এর আগে ১৯৮২ বিশ্বকাপের পর রেকর্ড ৫০ লাখ পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনায় যোগ দেন ম্যারাডোনা। পরের বছর এল ক্লাসিকোতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে গোল করে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের করতালিও পান তিনি, যা বার্সেলোনার খেলোয়াড় হিসেবে ছিল বিরল সম্মান। তবে তারা বার্সা অধ্যায় ছিল চোট, অসুস্থতা ও বিতর্কে ভরা। পরে সমাদৃত হন ইতালিয়ান ডেরা নাপোলিতে। তার নেতৃত্বে ক্লাবটি ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে দ্বিতীয় লিগ শিরোপা, দু’বার রানার্সআপ হয়, ১৯৮৭ কোপা ইতালিয়া, ১৯৮৯ উয়েফা কাপ ও ১৯৯০ ইতালিয়ান সুপার কাপ জেতে। ২০১৭ সালে মারেক হ্যামসিক তার রেকর্ড ভাঙার আগপর্যন্ত নাপোলির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন ম্যারাডোনা। পরে ক্লাবটি তার ১০ নম্বর জার্সি’র অবসর ঘোষণা করে।
১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ হয়েছিলেন মাদক গ্রহণের দায়ে। কোকেনসহ অতিরিক্ত মাদকাসক্তি তাকে বারবার শাস্তির মুখে ফেলেছিল। অন্যদিকে, ম্যারাডোনা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন এবং ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক হামলার নিন্দা জানান। চিকিৎসার সময় কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পরে নিজের বাঁ পায়ে ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতিকৃতি এবং ডান হাতে আঁকান চে গুয়েভারার উল্কি। ২০০৪ ইরাক যুদ্ধের সময় প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক ছিল তার।
লাতিন বৈশিষ্ট্যের শতভাগই ছিল ম্যারাডোনার মাঝে। অনিয়ন্ত্রিত জীবন–যাপনে শরীরে নানা রোগের বিস্তার ঘটিয়েছেন। খেলোয়াড়ি জীবনের শেষদিকে ওজন বেড়ে প্রায় ২৮০ পাউন্ডে পৌঁছায়। আর ২০১৯ সালে হার্নিয়াজনিত অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে অস্ত্রোপচার করাতে হয় তার। পরে সাবডিউরাল হেমাটোমার চিকিৎসায় জরুরি মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচার করা হয় এবং ১২ নভেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। ১৩ দিন পর দুনিয়ার মায়া ছাড়েন এই কিংবদন্তি ফুটবলার। যদিও তার মৃত্যুতে অবহেলাসহ নানা অভিযোগ আছে চিকিৎসক–সহ তার সেবায় নিয়োজিত থাকা মানুষদের বিরুদ্ধে। যা নিয়ে মামলা চলমান।

