রায় আজ: নির্যাতনে’ নাক ভাঙে-জ্ঞান হারায় রামিসা, শিরচ্ছেদে যায় প্রাণ!

Slider বাংলার আদালত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় রায়ের জন্য আজ (রোববার) ধার্য রয়েছে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ রায় ঘোষণা করবেন।

গত ১৯ মে সকালে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ার ঘরে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যার শিকার হয় ছোট্ট এই শিশু। পরদিন ২০ মে (১৯ মে দিবাগত রাত) ১২ টা ৫ মিনিটে ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ভিকটিমকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো ও লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। এরপর মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে দেশজুড়ে আলোচিত এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ রায় ঘোষণার অপেক্ষা।

সাক্ষীদের জবানবন্দি উঠে আসে লোমহর্ষক বর্ণনা

শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ হয় ২ জুন। ওইদিন আদালত এ মামলায় চার্জশিটভুক্ত ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরার মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেন। মামলার বাদী ও ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দির মাধ্যমে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এরপর ভিকটিমের- মা পারভীন আক্তার, বড় বোন, চাচা, ফুপু- ফুপা, প্রতিবেশীরা, পুলিশ সদস্য, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইকবাল হোসেন, ময়নাতদন্ত প্রস্তুত করা ডা: নাসাদ জাবিন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের এসআই অহিদুজ্জামান পর্যায়ক্রমে আদালতে জবানবন্দি দেন। এসময় রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামি পক্ষের আইনজীবী মুসা কলিমউল্লাহ তাদের জেরা করেন।

সেসময় আদালতজুড়ে নেমে আসে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কের আবহ। একের পর এক সাক্ষীর বর্ণনায় উঠে আসে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র। ভিকটিমে বাবা- মা, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পুলিশ কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের জবানবন্দি শুনে আদালতে উপস্থিত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

রামিসার বাবা জবানবন্দিতে জানান, ঘটনার দিন সকালে অফিসে যাওয়ার পর স্ত্রীর ফোনে মেয়ের নিখোঁজের সংবাদ পান। বাসায় ফিরে তিনি সোহেল ও স্বপ্নার তালাবদ্ধ ঘরের সামনে ভিড় দেখেন। ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে তিনি হাতুড়ি দিয়ে দরজা ভাঙেন এবং ভেতরে ঢুকে টয়লেটে রক্ত দেখতে পান। একপর্যায়ে খাটের নিচে রামিসার মস্তকহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এক কোণায় বালতির মধ্যে গলা থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান। পরবর্তীতে আসামীপক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করেন। জেরায় তিনি জানান, আসামিদের সাথে তার কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল না।

এরপর মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, ঘটনার দিন তিনি বাসায় রান্না করছিলেন। বড় মেয়ে রাইসা চাচার বাসায় যেতে চায়। তখন রামিসাও তার সাথে যেতে চাইলে রামিসাকে বারণ করেন। একপর্যায়ে রাইসা চলে গেলেও সে রামিসাকে সাথে নেয়নি। পরে রামিসাকে খুঁজে না পেয়ে তিনি চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার একটি জুতা দেখতে পান। প্রতিবেশীদের নিয়ে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেও সাড়া না পেয়ে লোকজন ডেকে আনেন। পরে দরজার তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে বাথরুমের সামনে রক্ত দেখতে পান এবং ঘরের ভেতরে রামিসার মরদেহ খণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া যায়। স্বপ্নাকে অনেকবার তিনি বলেন, বোন দরজাটা খুলে দে, তোর কিছু হবে না। সে দরজা খুলে নাই। এরপর পুলিশ এসে রামিসার জামাকাপড়সহ যাবতীয় আলামত জব্দ করে।​ ভুক্তভোগীর বড় বোন রাইসা আক্তারের জবানবন্দি ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।

তবে রামিসার সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা এসআই মো. ইকবাল হোসেনের বর্ণনা পুরো আদালতকেই স্তব্ধ করে দেয়। তিনি আদালতকে জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি জর্জেটের ওড়না উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে শিশুটির মুখ বেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছিল। আসামিদের শয়নকক্ষের দরজার সামনে খাটের নিচে চিৎ করে রাখা, দুই পা দুই দিকে ছড়ানো, মাথা বিচ্ছিন্ন রামিসার দেহ দেখতে পান। এক কোণায় রক্তমাখা একটি বালতির ভেতরে পানির মধ্যে পাওয়া যায় রামিসার কাটা মাথা। লাশ গুমের উদ্দেশ্যে শিশুটির দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়। মাথা শরীর থেকে আলাদা করার পাশাপাশি যৌনাঙ্গও ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছিল।

ভয়াবহ এসব বর্ণনা দিতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তার কান্নায় আদালতের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। উপস্থিত আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

এরপর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাসাদ জাবিন সাক্ষ্য দেন। তিনি আদালতকে জানান, ২০ মে দুপুর সোয়া ১টার দিকে তিনি রামিসার মরদেহ গ্রহণ করেন। মরদেহের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং হাত-পাও আলাদা করা হয়েছিল। শরীরজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। মুখে নখের আচঁড়, দুই ঠোঁট কাটা, নাক ভাঙ্গা এবং বুকের বাম পাশে আঘাতের দাগ পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল শিশুটির গোপন অঙ্গের অবস্থা, যেখানে ছুরি দিয়ে গুরুতর ক্ষত তৈরি করা হয়েছিল। ছুরি দিয়ে গলা থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করায় রামিসার মৃত্যু হয় বলে ময়নাতদন্তে মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক। ফরেনসিক রিপোর্ট ও ডিএনএ টেস্ট থেকে মৃত্যুর আগে জোরপূর্বক ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় বলে ময়নাতদন্তে ওঠে আসে।

সবশেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আসামিরা একই ফ্লোরে বসবাস করতেন। কমন বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। উপর্যুপরি আঘাতে রামিসা নিস্তেজ হয়ে জ্ঞান হারায়। মৃত ভেবে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয় এবং গোপন অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয়। তিনি আরও বলেন, রামিসার মা বারবার ডাকাডাকি করলেও আসামিরা দরজা খোলেনি। বরং তখনও তারা লাশ গুমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *