
দেশে মিজেলস (হাম) ও রুবেলা পরীক্ষার একমাত্র কেন্দ্র জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাব। সারা দেশ থেকে আসা হামের নমুনা এখানেই পরীক্ষা করা হয়। তবে, বর্তমানে কিটের তীব্র স্বল্পতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি নমুনা গ্রহণ ও পরীক্ষার সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পরীক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাঁচ হাজারের বেশি নমুনা ল্যাবটিতে জমে আছে। কিট সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তাদের স্বাভাবিক পরীক্ষার হার প্রায় ৭৫ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত ১১৪ প্যাকেট কিট ব্যবহার করে ১০ হাজার ৫৯৭ জনের হামের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে মাত্র ১৩টি কিট অবশিষ্ট আছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, প্রতিটি কিট দিয়ে ৯০ থেকে ৯৩টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। সেই হিসেবে অবশিষ্ট কিট দিয়ে সর্বোচ্চ ১২০০ নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন গুরুত্ব বিবেচনা করে মাত্র ১২০ থেকে ১৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। অথচ গত মাসেও এক দিনে সর্বোচ্চ ৭০০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।
দেশে হাম পরীক্ষার একমাত্র কেন্দ্র জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজি ল্যাবে তীব্র কিট সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের স্বাভাবিক পরীক্ষার হার প্রায় ৭৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে সারা দেশ থেকে আসা ৫ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় ল্যাবে জমে আছে, যা ভবিষ্যৎ রোগ শনাক্তকরণ ও পরিকল্পনা গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে
বুধবার (৬ মে) সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর হাসপাতাল থেকে ১০টি নমুনা নিয়ে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসেন স্বাস্থ্য সহকারী মিজানুর রহমান। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, তাকে প্রতি সপ্তাহে তিন দিন নমুনা নিয়ে আসতে হয়। আজ ১০টি নমুনা এনেছেন, যার রিপোর্ট আগামী সপ্তাহে পাওয়া যাবে। সব শিশুর নমুনা নেওয়া হয় কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কিছু নমুনা নিয়ে আসা হয়, হাসপাতালে ভর্তি সবার নমুনা নেওয়া হয় না।’
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজি ল্যাব ইনচার্জ ডা. আমিরুল হুদা ভূইয়া জানান, এ মুহূর্তে কিটের স্বল্পতায় পরীক্ষা কম হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কিছু হাসপাতাল থেকে আসা নমুনাগুলোকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় (দিল্লি) থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৩০টি হাম শনাক্তকরণ কিট আগামী রোববারের মধ্যে বাংলাদেশে আসবে। এই ৩০টি কিট দিয়ে ২ হাজার ৭০০-এর মতো মিজেলস নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। এর কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও ১০০টি কিট প্রদান করবে। এই কিটগুলো পেলে আবারও সক্ষমতা অনুযায়ী পূর্ণদমে পরীক্ষা চালানো সম্ভব হবে
তিনি আরও বলেন, আমাদের ল্যাবের প্রধান কাজ হলো সার্ভিলেন্স (নজরদারি) থেকে আসা নমুনাগুলো পরীক্ষা করা। পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা নির্ধারণ করি কোন এলাকায় হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। যেহেতু সমগ্র দেশে মিজেলস ছড়িয়ে পড়েছে, তাই এখন আর অত পরীক্ষার দরকার হয় না। শিশুদের শরীরের উপসর্গ দেখেই হাম হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
জানুয়ারি থেকে ১০ হাজার ৫৯৭টি নমুনা পরীক্ষার পর বর্তমানে ল্যাবে মাত্র ১৩টি কিট অবশিষ্ট আছে, যা দিয়ে সর্বোচ্চ ১২০০ পরীক্ষা সম্ভব। সংকট মোকাবিলায় গুরুত্ব বিবেচনা করে দৈনিক মাত্র ১২০-১৩০টি পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে দ্রুত ১৩০টি কিট আসার কথা রয়েছে, যা পেলে পুনরায় পূর্ণদমে পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হবে
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান বলেন, ‘কিটের স্বল্পতা চলছে, তবে কিট একেবারে শূন্য হয়ে গেছে এমন নয়। আমরা সংকট মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। হামের প্রকোপ আঁচ করতে পেরেই আমরা গত ৮ ফেব্রুয়ারি ডব্লিউএইচও-কে কিটের জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। সেই প্রেক্ষিতে তারা গত মাসে আমাদের ৬০টির মতো কিট দিয়েছিল, যা দিয়ে এতদিন কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। দুই-এক দিনের মধ্যে ৩০টি কিট এবং পরে আরও ১০০টি কিট দেওয়ার কথা আছে। হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। কিট পাওয়া মাত্রই আবারও প্রয়োজনে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা হবে।’
এ নিয়ে একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ঢাকা পোস্টকে জানান, হামের প্রকোপ দেশব্যাপী বিস্তৃত হবে— এটি এ বছরের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। প্রস্তুতি হিসেবে দেশের একমাত্র মিজেলস পরীক্ষাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত কিটের ব্যবস্থা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেহেতু এই ল্যাবটিতে একমাত্র ডব্লিউএইচও কিট সরবরাহ করে, তাই সরকারের উচিত ছিল তাদের সঙ্গে আগেই কিটের বিষয়ে কথা বলা। দেশের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সরকারের পক্ষ থেকে যখন ‘হাম সন্দেহে আক্রান্তের’ কথা বলা হচ্ছে, সেখানেই সরকারের সক্ষমতার প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বছরের শুরুতেই হামের প্রকোপের আশঙ্কা করেছিলেন, তা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কিট মজুদে সরকারের ব্যর্থতাকে দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করলেও জানিয়েছে, কিট না পাওয়া পর্যন্ত শিশু বিশেষজ্ঞরা জ্বরের সাথে লাল র্যাশ, সর্দি-কাশি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখেই হাম নিশ্চিত করছেন
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘হামের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের আইপিএইচের ল্যাবে সারা দেশ থেকে নমুনা নিয়ে আসা হয়, এর ফলে পরীক্ষায় কিছুটা সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। তবে, হাম রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞরা রোগীর জ্বরের সঙ্গে কিছু লক্ষণ, যেমন— সারা শরীরে লাল র্যাশ দেখা দেওয়া, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এসব দেখেই নিশ্চিত হতে পারেন। তবে হ্যাঁ, আমরা যদি সবার পরীক্ষা করতে পারতাম তাহলে ভালো হতো। আমরা আমাদের সক্ষমতার আলোকে টেস্ট ফ্যাসিলিটি চালু রেখেছি।’
