তেলের লাইনেই সকালের নাস্তা-দুপুরের খাবার, দিনশেষে ফিরতে হলো খালি হাতে

Slider বাংলার মুখোমুখি


বৈশাখের তপ্ত রোদ আর ভ্যাপসা গরমে যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত, তখন জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জাহিদুর রহমান। ঘড়ির কাঁটা যখন বিকেল ৫টার কাছাকাছি, তখন তিনি জানতে পারলেন পাম্পে তেল শেষ। মোটরসাইকেলের জন্য কাঙ্ক্ষিত সেই জ্বালানি পেতে হলে এখন তাকে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী দিন পর্যন্ত।

ঘেমে ভিজে ৯ ঘণ্টা অপেক্ষার পুরো সময়টা মোটরসাইকেলের ওপর বসেই পার করেছেন জাহিদুর। সেখানেই সেরেছেন সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার। কিন্তু দিনশেষে তার সঙ্গী হলো কেবলই হতাশা। তখনও তার সামনে-পেছনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার ‘মক্কা’ ফিলিং স্টেশনের এই চিত্র এখনকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিষণ্ন মনে জাহিদুর রহমান তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আমি চাকরিজীবী, যাতায়াতের জন্য বাইকই প্রধান ভরসা। গত কয়েকদিন ধরে তেলের জন্য মহাবিপদে আছি। আজ ছুটির দিন হওয়ায় সকাল ৮টায় লাইনে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন মূল পাম্প থেকে সিরিয়াল এঁকেবেঁকে গলি পেরিয়ে প্রায় ২ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ৯ ঘণ্টা পর যখন পাম্পের নজেলের একদম কাছে পৌঁছালাম, তখনই নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হলো—পেট্রোল বা অকটেন নেই। এখন হয় এই লাইন ছেড়ে চলে যেতে হবে, নয়তো আগামীকাল তেলের গাড়ি আসা পর্যন্ত এখানেই বসে থাকতে হবে। সারাদিন শুধু মনে হচ্ছিল, তেলের পাম্পের নজেল আর কতদূর… যেন এক অন্তহীন অপেক্ষা!

একই পরিস্থিতি রাজধানীর প্রায় সব তেলের পাম্পে। মৎস্য ভবন এলাকার রমনা ফিলিং স্টেশনে কথা হয় রাইড শেয়ারিং চালক আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি গত রাত ৯টা থেকে তেলের দীর্ঘ লাইনে হারিয়ে গেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাইড শেয়ারিং করেই আমার সংসার চলে। তেল না পেলে মোটরসাইকেল চলবে না, চুলাও জ্বলবে না। তাই ঘুম আর বিশ্রাম হারাম করে সারারাত বাইকের ওপর বসেই কাটিয়ে দিচ্ছি।

তেল পাম্পের মালিকরাও পড়েছেন বিপাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাড্ডার এক পাম্প মালিক বলেন, আমরা উভয় সংকটে আছি। চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে তেল পাচ্ছি না, আবার দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ক্রেতারা আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। আগে যেখানে কয়েক হাজার লিটার তেল পেতাম, এখন পাচ্ছি তার অর্ধেক।

উত্তর বাড্ডার একটি পাম্পে প্রাইভেট কারের লাইন গিয়ে ঠেকেছে নতুন বাজার পর্যন্ত। সেখানে অপেক্ষমাণ চালক হামিদুর রহমান বলেন, সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে সকালে তেল পাই, এরপর শুরু হয় অফিস আর স্কুলের ডিউটি। আমাদের জীবনের ওপর দিয়ে এক চরম নির্যাতন চলছে।

আরেক চালক মাসুদ রানা জানান, ১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে আয়-রোজগারে ভাটা পড়েছে, ফলে সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে এই সংকটের মধ্যে আশার কথা শুনিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। আগামী রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে বাজারে অকটেন সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। বিপিসির মতে, সরবরাহ বাড়লে পাম্পের এই দীর্ঘ সারি কমে আসবে। সংস্থাটি দাবি করছে, দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৩ টন অকটেন সরবরাহ করা হলেও এ বছর মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২১৯ টনে। তবে এপ্রিলে এসে প্রতিদিন সরবরাহ কমেছে ১০৪ টন। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দৈনিক গড় সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১১৫ টন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *