অরক্ষিত টঙ্গী সরকারী হাসপাতাল কোন বিএনপি নেতার কব্জায়!

Slider বাংলার মুখোমুখি

গাজীপুর: শিল্পনগরী টঙ্গীতে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল দূর্নীতি ও অনিয়মে ডুবে গেছে। সনদ বানিজ্য ও সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ চিরায়ত। একই সাথে জরাজীর্ণ ভবনগুলোর দরজা জানালা এমনকি ইটও খুলে নিয়ে যাচ্ছে চোরেরা। দূর্নীতিতে নিমজ্জিত এত বড় হাসপাতালে নেই কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। অরক্ষিত ও অব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেট ও দালালের ভীড়ে নুয়ে পড়া এই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বললেন, দালালমুক্ত করার সক্ষমতা নেই। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক বিএনপি নেতার নিয়ন্ত্রনে পরিচালিত হচ্ছে এই হাসপাতাল। ফলে কেউ কিছু বলতে পারছে না।

সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৮২ সালে এই হাসপাতাল যাত্রা শুরু করে। ১৯৯০ সালে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট টঙ্গী সরকারী হাসপাতাল, ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টঙ্গী জেনারেল হাসপাতালে রুপান্তর হয়। ২০১৭ সালের ২১ জুন এটির নাম হয় শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল। বর্তমানে নেমপ্লেটে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার নামটি মুছা আছে। এই হাসপাতালে বর্তমানে ৬৫ জন চিকিৎসক , ২৫জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফ ৭৫ জন কাজ করছেন। এই হাসপাতালে খালি আছে ডাক্তারদের ৩১টি পদ। সহায়ক হিসেবে ৫৬ জন আউটসোর্সিং এ কাজ করছেন। ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনটি সেবাখাতে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। আউটসোর্সিং এর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম এইচ এন্টারপ্রাইজ, খাবারে মেসার্স মিয়া এন্টারপ্রাইজ ও স্টেশনারি ঠিকাদার মেসার্স তুশি এন্টারপ্রাইজ। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে খাবারে মেসার্স মিয়া এন্টারপ্রাইজ গাজীপুর সদরের প্রতিষ্ঠান ও বাকী দুটি প্রতিষ্ঠান নরসিংদীর। তবে মেসার্স তুশি এন্টারপ্রাইজের মালিক নাহিদুল হক জানান, টঙ্গীর সানজিদ আহমেদ মিথুন তার প্রতিষ্ঠান ভাড়া নিয়েছেন। মিথুন তুশি এন্টারপ্রাইজের ভাড়াটিয়া মালিক বলে জানিয়েছেন তিনি। খাবারের দায়িত্ব প্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স মিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক আমজাদ হোসেন পলাশ একাধিক মামলার আসামী হিসেবে পলাতক থাকায় তার কাজ তদারকি করছেন স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘনিষ্ঠ লোক।
জানা গেছে, এই হাসপাতালের ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান দূর্নীতি ও অনিয়ম সিন্ডিকেটের এজেন্ট। অবৈধ অর্থ দিয়ে তিনি বহুতল ভবন সহ অনেক সম্পদ করেছেন। তবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিন তলা বাড়ি করেছি কিন্তু আমি নির্দোষ। স্টোর কিপার ফারুক হোসেন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের আংশিক ভেঙে বড় করে ভবন তৈরীর অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, কি করব, বসবাস করি তাই নিজেই সংস্কার করে নতুন রুম করেছি।

জানা যায়, এই হাসপাতালে জরুরী রোগীর ব্যান্ডেজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সূতা ও ঔষুধ বাহির থেকে কিনে আনতে হয়। প্রাথমিকভাবে একটি ব্যান্ডেজ করার পর বকশিস দিতে হয় পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকা। এই হাসপাতালে দুটি এম্বুলেন্স থাকলেও একটি নষ্ট। রোগী যাতায়াতের জন্য বাইরের একাধিক এম্বুলেন্স ব্যবহার করা হয়। কোন রোগী রেফার্ড করা হলে এম্বুলেন্সের ভেতরে রোগীর স্বজনদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ও রোগীর অবস্থা খারাপ বলে কাছাকাছি বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে নেয়া হয়। এর জন্য প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে দালাল চক্র ও জরুরী বিভাগের ইনচার্জ একটি টাকা পায়। ভালো চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিয়ে টাকা আদায় ও জখমী সনদের বানিজ্য রমরমা। এই হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রোগীকে তাদের চেম্বার করা প্রাইভেট হাসপাতালে পাঠায়।

হাসপাতালে গাইনি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা দত্তপাড়ার মরিয়ম আক্তার (২৭) বলেন, মহিলা ডাক্তাররা চিকিৎসা দিতে উদাসীন। তারা বেশিরভাগ সময় মোবাইল টিপে আর সহকারীরা ঔষধ লিখে দেয়।

পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি শাজাহান মিয়া (৭৫) বলেন, ঔষুধপত্র বেশিরভাগ বাইরে থেকে কিনতে হয়। বাথরুমের পরিবেশ নোংরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোগীর এক স্বজন জানান, রোগীর সেলাই লাগলে সুতা এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি বাহির থেকে কিনতে হয়। আবার সেলাই শেষে তাদেরকে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা বকশিস দিতে হয়। টাকা দিতে অপারগতা জানালে তারা কৌশলে রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার্ড করে।

নিম্ন মানের খাবার: সরকারী বিধি অনুযায়ী একজন ভর্তি রোগীকে তিন বেলা খাওয়ানোর জন্য ভ্যাট ব্যাতিত ১৩৭ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি থাকায় এই টাকার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নি¤œ মানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।

ঔষুধ: জরুরী বিভাগে ২০২৩ সালে তৈরী ও মেয়াদোত্তীর্ণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। এ বিষয়ে কর্তব্যরতরা কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
হাসপাতালের ক্যাম্পাস ঘুরে জানা যায়, প্রায় ২০ টি ছোটবড় জরাজীর্ণ ভবন পরিত্যক্ত। ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতিবেদন দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়নি। ফলে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে প্রায় ৩০ টির বেশী পরিবার। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বাসিন্দারা নিজেদের ইচ্ছেমত অবকাঠামো ভেঙে সংযুক্ত ভবন তৈরী করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহার করছেন। এসকল বিষয়ে বসবাসকারী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ও স্বীকার করেছেন। দেখা গেছে, পরিত্যক্ত একাধিক ভবনের দরজা জানালা এমনকি ইটও নিতে ভুলছেন না চোরেরা।

টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার আফজালুর রহমান বলেন, আমার হাসপাতালে কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। একজন আনসার পর্যন্তও নেই। হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম ও জখমী সনদের ব্যবসা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দালালমুক্ত করা সম্ভব নয়। নানা কারনে তারা শক্তিশালী। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে দালাল দূর করা সম্ভব। তবে বিভিন্ন অভিযোগে জরুরী বিভাগের ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *