আন্দাংয়ে পুরুষদের গুলী করে হত্যা ও নারীদের গণধর্ষণ

Slider গ্রাম বাংলা

arakan

 

 

 

 

 

মিয়ানমার সেনাদের বর্বরতা কোনভাবেই থামছে না। একের পর এক মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলো মর্টারশেল আর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। সোহাগপ্রাং এর পর এবার আন্দাংয়েও নারকীয় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়েছে মগ সেনারা। ওইদিকে নির্যাতনের মাত্রা যতই বাড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গা লোকজনদের ভিড়ও ততবেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সীমান্তে তুলনামূলকভাবে নারী ও শিশুদের সংখ্যাই বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর আশেপাশে এখন কমপক্ষে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এদিকে আরাকানের সাবেক সংসদ সদস্য ও রোহিঙ্গা নেতা (বর্তমানে নির্বাসনে রয়েছেন) এঁশ্যু মং জানিয়েছেন, ডমায়ানমার সেনাবাহীনির গত ৫দিনের নৃশংসতা অতীতের সমস্ত নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে গত সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার ভোররাত পর্যন্ত আন্দাংয়ে কিলিং অপারেশন চালিয়েছে বর্মীসেনারা। গণি মিয়ার ডেইল ও উলামিয়া পাড়ায় শতশত নারীকে গণধর্ষণ চালিয়েছে বলে জানা গেছে। পুরুষশূন্য রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে প্রবেশ করে অন্যান্য পুরুষদেরও ঘর থেকে ধরে এনে গুলী করে হত্যা করেছে। ঘরে ঢুকে নারীদের গণধর্ষণ চালিয়েছে, এমন অভিযোগ ও স্থির চিত্র মিলেছে সীমান্তে পালিয়ে আসা কিছু যুবক রোহিঙ্গাদের নিকট থেকে। তারা জানিয়েছে, আন্দাংয়ের ৯ নং ঘাঁটি থেকে মিলিটারীরা বেপরোয়া গুলী চালায়। গণি মিয়ার ডেইল ও উলামিয়া পাড়ায় গোলা-গুলীর সময় অনেকে পালিয়ে চলে এসেছে। কিন্তু যারা পালিয়ে আসতে পারেনি তাদের সেখানে ধরে ধরে ধর্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে। এ সংক্রান্ত পর্যাপ্ত আলামতও মিলেছে। নারীদের পরিহিত গায়ের বস্ত্রগুলো ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। এমন স্থির চিত্রও মিলেছে।

এদিকে বিজিবি আরও ৪৭৫ রোহিঙ্গাকে বিধ্বস্ত এলাকা আরাকানের দিকেই ফেরত পাঠিয়েছে। সীমান্ত শহর টেকনাফের নাফ নদীর নদীসীমানা দিয়ে আরও ৪৭৫ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদেরকে বার্মায় ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আজ মঙ্গলবার (২৯ আগস্ট) সকালে নাফ নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এসব রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হয়। ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গারা নাফ নদীর জলসীমানা দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছিল। বার্মার সেনাবাহিনীর হত্যালীলা থেকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তারা মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কাছে সাময়িক আশ্রয় নিতে চেয়েছিল বলে জানিয়েছে সীমান্তে জড়ো হওয়া লোকজন।

টেকনাফ ২নং বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম সত্যতা নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের বলেন, আজ ভোর রাত ও সকালে নাফ নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বার্মা থেকে জলসীমানা অতিক্রম করছিল ৪৭৫ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। এসময় সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবি’র সদস্যরা তাদেরকে বার্মায় ফেরত পাঠায়।

অন্যদিকে এখনো জিরো লাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় পেতে আর্তনাদ করে চলছে। খেতে না পেয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে তারা। এক রোহিঙ্গা বলেন, গুলী খেয়ে মরার চেয়ে না খেয়ে মরা অনেক ভাল।

রাখাইনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম একের পর এক আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য আখ্যাদিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার তরুণদের। তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তে এসে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গারা বলছেন, তারা উভয় সঙ্কটে পড়েছেন। নিজ দেশে বর্মী বাহিনীর নিপীড়ন ও সীমান্ত পার হলে বিজিবির বাধা। জিরো পয়েন্টে খোলা আকাশের নিচেই তাদের আশ্রয়স্থল।

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহারে তরুণদের আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। যাদের ধরতে পারছে না তাদের গুলী করা হচ্ছে। বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে সব পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।

রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়ার উত্তরপাড়ার আহমদ হোসেন মুঠোফোনে জানান, গত রোববার খুব ভোরে সেনাবাহিনীর একটি দল গ্রামে ঢুকে স্থানীয় জহির, করিম ও আব্দুর শুক্কুরকে আটক করে নিয়ে যায়। এ সময় তারা পালিয়ে পাশের পাহাড়ে আশ্রয় নেন। পরে ওই তিন তরুণের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়।

ঢেঁকিবনিয়া পূর্বপাড়ার আবছার কামাল জানান, সেনাবাহিনী সন্ধ্যার পর বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি শুরু করেছে। যেসব বাড়িতে মানুষ পাচ্ছে না সেসব বাড়ি বোমা মেরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। যাকে পাচ্ছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

সোমবার সকালে উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়া আহমদ শফি জানান, ফকিরপাড়ায় গত দুই দিন ধরে সেনাবাহিনী বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে। প্রকাশ্যে অনেককে হত্যা করছে।

রোববার বিকেলে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট পরিদর্শন করে বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সীমান্ত সিল করে দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলগ্ন টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মিয়ানমার সীমান্তে রাতের বেলায় আরকান রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে অগ্নিকান্ডে আগুনের লেলিহান শিখা সীমান্ত এলাকা থেকে দেখা যাচ্ছে। রাতে মুহুর্মুহু গুলীর শব্দ ভেসে আসছে। বিরোধপূর্ণ এলাকার সীমান্তে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখা গেছে ও সেন্টমার্টিনের অদূরে জাহাজ যাতায়ত করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সাংবাদিকদের জানান, সামরিক হেলিকপ্টারটি মিয়ানমার উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় একটি ক্যাম্পে নামে। ঘণ্টা দেড়েক পর আবার চলে যায়। হেলিকপ্টারটি চলে যাওয়ার পর মিয়ানমার সেনারা নির্যাতন আরও বৃদ্ধি করেছে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ জানান, সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে মিয়ানমারের হাইসসুরাতা এলাকায় ব্যাপক আগুনের লেলিহান শিখা দেখা গেছে। বঙ্গোপসাগরে দেখা গেছে মিয়ানমার নৌ-বাহিনীর ৩টি জাহাজ। ফলে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় রয়েছে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি বাসিন্দারা। বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সদস্যরা সীমান্তের স্থল ও নাফ নদের জলপথে অতিরিক্ত টহল জোরদার রেখেছে এবং সতর্ক পাহারায় রয়েছে।

প্রাণ বাঁচাতে আরকান রাজ্যের রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। উখিয়ার ঘুমধুমের জলপাইতলী এলাকায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু জিরো পয়েন্টে অবস্থান করছে। তাদেরকে বিজিবি অনুপ্রবেশে বাধা দিয়ে মিয়ানমারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া টেকনাফ সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশকালে রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত ১৪১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে বিজিবি ও পুলিশ। হোয়াইক্যং ও উনছিপ্রাং সীমান্ত এলাকা থেকে এসব রোহিঙ্গাদের আটক করা হয়। পরে স্ব স্ব সীমান্ত দিয়ে আটক রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ২ বিজিবি’র টেকনাফস্থ ব্যাটলিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম।

এদিকে উখিয়া উপজেলার ঘুমধুম জলপাইতলীর জিরো পয়েন্টে অনুপ্রবেশের জন্য অবস্থানকারী রোহিঙ্গা ঢেকিবনিয়ার মোহাম্মদ হোছাইন, মিনারা বেগম, খুরশিদা বেগমসহ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত শুক্রবার থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীরা পুরুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে গুলী করে হত্যা করছে। মহিলাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। ঘরবাড়িসহ পুরো এলাকায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। মোহাম্মদ হোছাইন আরো জানান, সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলী বর্ষণকালে প্রাণের ভয়ে পালানোর সময় পাঁচ বছরের ছেলেকে ফেলে চলে আসি। এখন ছেলেটি কোথায় এবং কি অবস্থায় আছে আল্লাহই জানে।

খুরশিদা বেগম জানান, তার স্বামীকে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। চারমাসের একমাত্র শিশুপুত্রকে নিয়ে এলাকার অন্যান্যদের সাথে বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসি। কিন্তু এখানেও বিজিবি বাধার মুখে রয়েছি। বর্তমানে অর্ধহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছি। তিনি আরো বলেন, একদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অমানবিক নির্যাতন, অন্যদিকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। আমরা রোহিঙ্গাদের শেষ আশ্রয়স্থল কোথায়?

তাদের সাথে কথার বলার সময় অন্যান্য রোহিঙ্গা নারী-পুরুষরাও হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। সবার চুখে মুখে আতংকভাব। রোদ বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে সকলে জড়ো হয়ে কোন রকম ঠাঁই নিয়েছে। এসময় স্থানীয় কয়েকজন নারী পুরুষ তাদেরকে শুকনো খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে।

মিয়ানমারের ‘আয়লান কুর্দি’ : নাফ নদীতে ভাসছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের লাশ। এমন একটি কন্যা সন্তানের ভাসমান লাশের ছবি দিয়ে তুরস্কের অনলাইন প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘মিয়ানমার’স আয়লান কুর্দি ড্রাউনস ট্রাইং টু রিচ বাংলাদেশ।’ শিশু কন্যাটিকে নিয়ে তার পরিবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নাফ নদীতে নৌকা ডুবে যায়। নাফ নদীতে রোহিঙ্গা শিশুটির ভাসমান লাশ গতবছর সিরিয় শিশু আয়লান কুর্দির কথা মনে করিয়ে দেয়। আয়লান তার পরিবারের সঙ্গে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছানোর আগেই ডুবে মারা যায়। তার লাশ ভেসে ওঠে তুরস্কের সৈকতে। রোহিঙ্গা শিশুটির ভাসমান লাশ ফের রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার বেদনা মনে করিয়ে দেয়। এছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, আবেদন উঠেছে রোহিঙ্গাদের পাশে এসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অব্যাহত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে দাঁড়ানোর।

সেনা অভিযানে রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এইচআরডব্লিউ : মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের অন্তত ১০টি গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এই তথ্য জানিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করেছেন, গ্রামগুলোতে প্রবেশ করে সেনাবাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে গুলী করেছে। ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। সেনাদের গুলীর শিকার হয়েছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা।

মিয়ানমারের সরকার জানিয়েছে, গত শুক্রবার আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা)-র হামলার পর এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ মানুষ নিহত হয়েছে। চরমপন্থী সন্ত্রাসীরা সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সময় গ্রামগুলোতে আগুন লাগিয়েছে। রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, সরকারি বাহিনীই আগুন লাগিয়েছে এবং বিচারবহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে।

গতকাল মঙ্গলবার দেয়া এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউজ জানিয়েছে, সরকারের উচিত অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ তদন্তে স্বতন্ত্র ব্যক্তিদের ওই অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া।

স্যাটেলাইট তথ্যের বরাত দিয়ে মানবাধিকার সংগঠনটি জানিয়েছে, এবারের অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০১৬ সালের অক্টোবরে সেনা অভিযানের চেয়ে এবারের আগুনের বিস্তৃতি অনেক বেশি ছিল। ওই সময় প্রায় দেড় হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছিল।

বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও অ্যাক্টিভিস্টদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবেই আগুন লাগানো হয়। সংস্থাটি জানায়, নতুন স্যাটেলাইট তথ্যে যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তা উদ্বেগজনক। দাতা দেশ ও জাতিসংঘের উচিত রাখাইন রাজ্যের চলমান পরিস্থিতির সঠিক অবস্থা যাতে মিয়ানমার সরকার তুলে সেই পদক্ষেপ নেওয়া।

এইচআরডব্লিউ বিবৃতিতে বলেছে, বিদ্রোহীদের ওপর দায় চালিয়ে দিলেই মিয়ানমার সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও মানবাধিকার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তদন্ত করতে হবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্থনিও গুয়েতেরেস-র মুখপাত্র স্টেফানে দুজারিক এক বিবৃতিতে বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মহাসচিব সহিংসতা এড়াতে পালিয়ে আসা নারী ও শিশুদের সহযোগিতা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সামাজিক মাধ্যমে নিন্দার ঝড় সুচি খলনায়িকা

সংগ্রাম ডেস্ক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যেভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে তার দায় কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারেন না অং সান সুচি। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মানবতার দিক বিবেচনায় এমনটাই মনে করে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ।

অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রীয় মদদেই রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। তাই বাংলাদেশে সুচিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নিন্দার ঝড় ও খলনায়িকা হিসেবে আখ্যা করা হয়েছে। শীর্ষনিউজ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রসঙ্গটি এখন সর্ব আলোচিত। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হলে সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটি।

রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের বিভিন্ন ছবিতে ছেয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে বিভিন্ন মানবিক ও রাগান্বিত পোস্ট শেয়ার করছে। এসব পোস্টে অনেকেই মিয়ানমারের গণতন্ত্রী নেত্রী অং সান সুচিকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করছেন।

কেউ কেউ বলছেন, যেন তার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারটি কেড়ে নেওয়া হয়। বেশ কিছু ছবি ও কার্টুনে তাকে ব্যাঙ্গ করতেও দেখা গেছে। সত্তরের দশক থেকে রোহিঙ্গাদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন থামাতে ক্ষমতায় এসে সুচি উদ্যোগী হবেন এমনটাই আশা করেছিলো এ দেশের মানুষ। কিন্তু সুচি এই প্রসঙ্গটি অত্যন্ত চাতুর্য্যতার সঙ্গে এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অনেকেরই মত। সর্বশেষ তিনি রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কর্মীদের দোষারোপ করেছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুচির ভূমিকা সারা বিশ্বেই সামালোচিত।

সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যটিতে অভিযানরত নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এক দিনেই নিহত হয়েছে ৭১ জন, যাদের মধ্যে ৫৯ জনই রোহিঙ্গা মুসলিম, অবশিষ্ট ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। গত বছর অক্টোবরে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযানের পর বছর না ঘুরতেই আবারো রোহিঙ্গা নিধন শুরু করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হামলার ঘটনায় ভয়ার্ত রোহিঙ্গারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাংলাদেশী সীমান্তে এসে হামলে পড়েছে। যদিও বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষী বাহিনী রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

গত বছরের অক্টোবরে এমন সহিংস ঘটনার পর সেনা অভিযান শুরু হয় রাখাইনে। সেনাদের হাতে শত শত রোহিঙ্গা নিহত ও নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা একে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ওই অভিযানের সময় থেকে গত এক বছরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

জানা গেছে, বর্তমানে মিয়ানমারে ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গার বাস। কিন্তু এর বাইরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে আরো প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা, যারা নির্যাতনের মুখে বিভিন্ন সময় দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব মিয়ানমার সরকারকে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানালেও সরকার তা করেনি। বলা চলে, এর মাধ্যমে অং সান সুচির এনএলডি সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের জন্য সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *