এলো খুশির ঈদ

Slider জাতীয়


ঢাকা: লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষসহ মনের পশুকে পরাভূত করার বাণী নিয়ে আবারও এসেছে কোরবানির ঈদ। সোমবার পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদের আনন্দে মাতবে সারাদেশ। তবে উৎসবের বাতাবরণে ভয় জাগাচ্ছে সারাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু। রয়েছে বন্যার ক্ষত ও নতুন করে বন্যার পূর্বাভাস নিয়ে উদ্বেগ।

ঈদুল ফিতরের মতো কোরবানির ঈদের তারিখ নিয়ে আনন্দময় অনিশ্চয়তা থাকে না। আট দিন আগেই পশ্চিম আকাশে জিলহজের চাঁদ জানান দিয়েছে কোরবানির বারতা। বাংলাদেশের সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর পথে পশু কোরবানি করবেন। তবে পশু কোরবানি প্রতীকী। কবি নজরুল বলেছেন, ‘মনের পশুরে করো জবাই/পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।’

সবাই সাধ্যমতো সেরা পশু কোরবানি দেবেন ঈদে। তবে এবার উৎসবের আমেজ ম্লান করে দিয়েছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। বেসরকারি হিসাবে শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে এ রোগে। সরকারি হিসাবেই আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা লক্ষাধিক। ডেঙ্গুতে স্বজনহারা মানুষের ঘরে আসবে না ঈদের আনন্দ। উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় অনেক মানুষের ঈদ মাটি হয়ে গেছে। আবার রাজধানী ঢাকা থেকে যারা নিজ নিজ এলাকায় গেছেন, তাদের ঈদের খুশি ম্লান করেছে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটসহ যাত্রাপথে নানা ভোগান্তি।

তবু ঈদ বলে কথা। বিখ্যাত শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেছেন, ঈদ মানে খুশি। পাশাপাশি কোরবানির ঈদ ত্যাগেরও। বন্যা ও ডেঙ্গুতে যাদের হারিয়েছি, তাদের জন্য দোয়া করতে হবে। ঈদের খুশিতে তাদের যেন ভুলে না যাই।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনানুযায়ী, চার হাজার বছর আগে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার সবচেয়ে প্রিয় নিজ সন্তান হজরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার উদ্যোগ নেন। তবে আল্লাহর কুদরতে হজরত ইসমাইলের (আ.) পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। হজরত ইব্রাহিমের (আ.) এই ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্মরণ করে প্রতিবছর মুসলমানরা কোরবানি করেন। তবে আল্লাহর পথে ত্যাগই ঈদুল আজহার প্রধান শিক্ষা। পশু জবাই করে তা বিলিয়ে দেওয়া দান নয়, ত্যাগ। কবি নজরুল বলেছেন, ‘চাহি নাকো দুম্বা উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানি, চাই না দান।’

সামর্থ্যবানরা নিজেদের নামে, প্রিয়জনের নামে পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ে সচেষ্ট হবেন। যাদের সামর্থ্য নেই তারাও বাদ যাবেন না ঈদের আনন্দ থেকে। কোরবানির মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার বিধান রয়েছে ইসলামে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হলেও পরের দু’দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ তারিখেও পশু কোরবানি দেওয়া যায়। সেই হিসাবে আগামী মঙ্গল ও বুধবারও কোরবানি করা যাবে।

পছন্দের পশু কোরবানি করতে সবার এখন ‘গরুখোঁজা’ দশা। সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে সেরা গরু, ছাগল কেনার জন্য ছুটছেন হাট থেকে হাটে। কয়েক বছর ধরে অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। তাই পশুর খোঁজে কেউ কেউ চোখ রাখছেন কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে। সংখ্যায় বেশি না হলেও বাজারে রয়েছে দুম্বা ও উট। কেউ কেউ মরুভূমির প্রাণী উটও কোরবানি করবেন।

ঈদ করতে পথের ভোগান্তি মাথায় নিয়ে কোটি মানুষ শহর, কর্মস্থল ছেড়ে গিয়েছেন কিংবা যাচ্ছেন প্রিয়জনের কাছে। রোববার থেকে শুরু হয়েছে ঈদের ছুটি। তবে গত বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস থেকেই পুরোদমে শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। মহাসড়কে যানজট, ফেরিতে দীর্ঘ লাইন, ট্রেনে বিলম্ব- সব উপেক্ষা করে ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’ স্বজনের কাছে ফিরছেন মানুষ।

সোমবার সকালে পরিষ্কারর অথবা নতুন পোশাক পরে সব বয়সী মানুষ শরিক হবেন ঈদের জামাতে। এক কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আদায় করবেন ঈদের নামাজ। ভুলে যাবেন সব ভেদাভেদ। নামাজের জন্য প্রস্তুত জাতীয় ঈদগাহ ময়দানসহ অন্যান্য ময়দান ও মসজিদগুলো।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কোরবানি আমাদের মাঝে আত্মদান ও আত্মত্যাগের মানসিকতা সঞ্চারিত করে। কোরবানির মর্ম অনুধাবন করে সমাজে শান্তি ও কল্যাণের পথ রচনা করতে আমাদের সংযম ও ত্যাগের মানসিকতায় উজ্জীবিত হতে হবে। ত্যাগের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হলেই প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও সৌহার্দ্য।’

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘শান্তি, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় ঈদুল আজহা। তাই আসুন, আমরা সকলে পবিত্র ঈদুল আজহার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কাজে অংশ নিয়ে বৈষম্যহীন, সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’

দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ বিভিন্ন দলের রাজনীতিকরা।

কোরবানির তাৎপর্য ও গুরুত্ব তুলে ধরে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে সংবাদপত্রগুলো। সোমবার থেকে তিন দিন বন্ধ থাকবে সংবাদপত্র। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ঈদ উপলক্ষে সাত দিনের বিশেষ বিনোদন অনুষ্ঠান প্রচার করবে। ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোকে সরকারি উদ্যোগে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। শিশুদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বিনোদনকেন্দ্রগুলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *