নকশাটা আসলে কার?

Slider বাধ ভাঙ্গা মত

23250_f1

 

অনেকদিন থেকেই সুযোগ খুঁজছিলেন এরদোগান। ব্যর্থ অভ্যুত্থান তাকে এ সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি নিজেই বলেছেন, এটা আল্লাহ প্রদত্ত এক উপহার। এই সুযোগে তিনি পরিষ্কার করবেন সেনাবাহিনী, বিচার ব্যবস্থা, পুলিশ। মিডিয়ার ওপর তো খড়গ আছেই। কিন্তু সর্বত্র যে বিষয়টা আলোচিত হচ্ছে- এ ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নকশা করলো কে? সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজারো প্রশ্ন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা একটা অপরিকল্পিত অভ্যুত্থান। ক্যু হবে, প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী এর বাইরে। দুটি সেতু বন্ধ করা হলো। দখলে নেয়া হলো এয়ারপোর্ট। পার্লামেন্ট ভবনে বোমা ফেলা হলো। প্রেসিডেন্ট মোবাইল ফোন দিয়ে অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিলেন। ফোনের নেটওয়ার্কইবা কেন বন্ধ করেননি জান্তারা। অনেকদিন থেকেই ফেতুল্লাহ গুলেনকে নিয়ে একটা অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন এরদোগান। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বসে তিনি তার সরকারের বিরুদ্ধে কলকাঠি নাড়ছেন। যদিও একসময় তাদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। সেদিন এখন গত হয়েছে। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এরদোগান আরো কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছেন। যারা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছেন তাদের ভাইরাস আখ্যা দিয়ে মুছে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। সেনা, পুলিশ আর বিচার বিভাগে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়ে গেছে। সেনা সদস্য আর বিচারকসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ছয় হাজার ব্যক্তিকে। পুলিশের আট হাজার সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অভ্যুত্থানের নায়ক কে এটা আজ অব্দি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যদিও নানা ধরনের তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। অভ্যুত্থানকারীরা বলছিল, তারা গণতন্ত্র অব্যাহত রাখবে। মানবাধিকার বজায় থাকবে। ফৌজি শাসনের মধ্যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার? তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নিজের কাছে আরো ক্ষমতা নিতে চাইছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর একটি অংশ বরাবরই বৈরী ছিল। বিচার বিভাগও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এরদোগান বিরোধী দল, মিডিয়া, ওয়েবসাইট ও বিচার বিভাগের ওপর আরো নিয়ন্ত্রণ যে প্রতিষ্ঠা করবেন, ইতিমধ্যে তার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। কুর্দিদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন, এ তো পরিষ্কার। এরদোগানকে নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় বরাবরই এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এরদোগান নিজেকে এ যুগের সুলতান সুলাইমান হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। তুরস্কের ভৌগোলিক গুরুত্বকে তিনি ব্যবহার করছেন। মুসলিম উম্মাহ কথাটিও প্রায়ই ব্যবহার করেন তিনি। বিরোধীরা তার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিপক্ষে বরাবরই সোচ্চার। নানামুখী তৎপরতা তারা চালিয়েছেন। সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সুযোগটা এলেও বাস্তবে তারা গণতন্ত্রের পক্ষেই অবস্থান নেন। প্রধান বিরোধী দল ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কিদের সমর্থনপুষ্ট। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এখন এটাকেও পুঁজি করবেন। নরমেন স্টোন বিলক্যান্ট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বলছেন, ওরা বেকুব নাকি। জুলাই মাসে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে কেউ ক্যু করে নাকি। যখন মানুষ গরমে কাহিল। করবিই যখন সেপ্টেম্বর মাসে কর না।
শুরুতেই বলছিলাম যে, এ অভ্যুত্থানের নকশাকার কে? বেনিফিশিয়ারি কে? এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান আইওয়াশ কিনা? এ প্রশ্ন এখন চায়ের টেবিল থেকে জনমুখে। যে যাই বলুন না কেন, প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গুলেন অবশ্য বলে দিয়েছিলেন, এরদোগানই হয়তোবা এ নকশা তৈরি করেছেন। অতীত ইতিহাসে একবারও ক্যু ব্যর্থ হয়নি। চারবার ক্যু হয়েছে। সময় যত যাচ্ছে তুরস্কে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়ে গেছে। সন্দেহ আর অবিশ্বাস এক অস্বস্তি তৈরি করেছে। গুলেনকে ফেরত আনা খুব সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, এখানে কূটনীতির খেলা আছে। মানবাধিকারের প্রশ্নও আছে। আর ইউরোপের ভূ-রাজনীতিও এখানে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তুরস্ক এমনিতেই দ্বিধাবিভক্ত। অভ্যুত্থান তাদের একত্রিত করলেও এখন নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। সুলতান সুলাইমান হওয়ার স্বপ্ন দেখা এরদোগান এ যাত্রায় টিকে গেছেন। অনেকেই তাকে বলছেন মোবাইল সুলতান। মোবাইলকেই তো মারণাস্ত্রে পরিণত করেছেন তিনি। জনপ্রিয় কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ণ একনায়ক। ইতিহাস কী এভাবেই বিচার করবে তাকে। কী অপেক্ষা করছে তার জন্য। রবার্ট ফিস্ক কিন্তু বলেছেন, আরো অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। একথা হলফ করেই বলা যায়, গণতন্ত্রের পথে না থেকে উগ্র ডানপন্থি রাজনীতির চর্চা করতে থাকলে যেকোনো সময় তার বিপদ আসতে পারে। তাই তুরস্কে কী ঘটবে, কী হচ্ছে বা কী হবে তা চটজলদি বলা সত্যি কঠিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *