মো: জাকারিয়া, ঢাকা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মানবজীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক ব্যবহার মানুষের কাজকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করেছে। তবে প্রতিটি প্রযুক্তির মতো AI-এরও অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে, যা বর্তমান সময়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য প্রকাশ পেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রধান কৌশল ছিল অস্বীকার করা। পরে তারা তথ্যদাতার চরিত্র হনন করত। আর এখন প্রযুক্তির এই যুগে নতুন এক ঢাল পাওয়া গেছে—AI।
বর্তমানে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা অপকর্মের ভিডিও, অডিও কিংবা নথি প্রকাশ পেলেই অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়, “এটা AI দিয়ে বানানো”, “ভিডিওটি ভুয়া”, অথবা “আমাকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার ষড়যন্ত্র চলছে।” ফলে প্রকৃত অপরাধ বা অনিয়মের তদন্তের চেয়ে বেশি আলোচনা হয় সেটি AI কি না। সত্যের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর পরিবর্তে অভিযুক্তরা প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে।
নিঃসন্দেহে AI প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে। ভুয়া ভিডিও, নকল কণ্ঠস্বর, বিকৃত ছবি কিংবা বানোয়াট তথ্য তৈরি করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার ঘটনা বাড়ছে। কিন্তু এই বাস্তবতাকে পুঁজি করে যদি প্রতিটি অভিযোগ, প্রতিটি প্রমাণ এবং প্রতিটি অনুসন্ধানকে “AI-নির্মিত” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে সত্য ও ন্যায়বিচার।
আজকের পৃথিবীতে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—প্রমাণ সামনে আসার পর সেটি খণ্ডন করার পরিবর্তে প্রমাণের অস্তিত্বই অস্বীকার করা। অর্থাৎ ঘটনা ঘটেছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আলোচনাকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে “এটা AI কি না” সেই বিতর্কে। এতে প্রকৃত অপরাধী যেমন সুবিধা পায়, তেমনি সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত হয়।
আরও উদ্বেগজনক হলো, কিছু কুচক্রী মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য AI ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি ভুয়া ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। একটি বিকৃত ছবি জনমনে ঘৃণা, বিভ্রান্তি কিংবা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। নতুন প্রজন্ম যখন বারবার এমন তথ্যের মুখোমুখি হয়, তখন তাদের কাছে সত্য, মিথ্যা এবং প্রচারণার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর প্রভাব কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। একটি মিথ্যা তথ্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধ্বংস করতে পারে, একটি বানোয়াট প্রচারণা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে, এমনকি একটি সাজানো ভিডিও জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তথ্যযুদ্ধের এই যুগে মিথ্যা অনেক সময় সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
সাংবাদিকতা, গবেষণা এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্যও এটি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ এখন শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; সেই তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জনগণকেও বুঝতে হবে—সবকিছু AI বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি যাচাই ছাড়া সবকিছু বিশ্বাস করাও সমান ক্ষতিকর।
প্রযুক্তি কখনো অপরাধী নয়; অপরাধী হলো প্রযুক্তির অপব্যবহারকারী। তাই প্রয়োজন শক্তিশালী যাচাই ব্যবস্থা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি। অন্যথায় এমন এক সময় আসতে পারে, যখন সত্যিকারের দুর্নীতির প্রমাণও “AI-এর তৈরি” বলে বাতিল হয়ে যাবে, আর প্রকৃত অপরাধীরা প্রযুক্তির ধোঁয়াশার আড়ালে নিরাপদে থেকে যাবে।
AI-এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো ভুয়া তথ্য তৈরি করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে মানুষ সত্যকেও আর সহজে বিশ্বাস করবে না। আর যখন একটি সমাজ সত্যের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

