শরীর কাঁপলেও থামেনি কলম, এইচএসসিতে বসেছে অনামিকা

Slider শিক্ষা

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা দারিদ্র্ কোনোটিই থামাতে পারেনি কুড়িগ্রামের অনামিকা রায়কে। প্রতিকূলতাকে জয় করে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই পরীক্ষার হলে বসেছেন এই অদম্য শিক্ষার্থী।

জন্মের পাঁচ বছর পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে কুমারী অনামিকা। কিছু বোঝার আগেই পা দুটোর হাঁটুর নীচ থেকে বেঁকে যায়। এরজন্য এঁকেবেঁকে চলাফেরা করে সে। মনে হয় এক্ষুনি পড়ে যাবে। কথা বললে মনে হয় জিভ বেরিয়ে আসে, ঠোঁট আর তালুতে জড়িয়ে যায়।
এবারে সে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার কাশীপুর কলেজ থেকে ডিজিটাল টেকনোলজি অ্যান্ড বিজনেস শাখা থেকে উপজেলার বোয়াইলভীর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সে ২০২৪ সালে গাগলা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-২.৭২ পেয়েছে। তার একটি ছোট ভাইও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) পরীক্ষা কেন্দ্রে দেখা যায়, পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছে। পরীক্ষা শুরু হলে খাতায় লেখার সময় দেখা যায়, একদিকে তার কলম চলছে, অন্যদিকে কাঁপছে শরীর। পুরো শরীর ঝুঁকে লিখছে সে।

অনামিকার বাড়ি নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা ইউনিয়নের ব্যাঙের দোলা গ্ৰামের অনিল চন্দ্র ও কাঞ্চনমালা কাহিনী দম্পতির মেয়ে। তার বাবা একজন কৃষক। মা গৃহিণী।

কুমারী অনামিকা শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার নয়, পারিবারিকভাবে অভাব আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। চার মেয়ে তিন ছেলে। মেয়েদের মধ্যে অনামিকা সবার ছোট। মেয়েদের বিয়ে দিতে তার বাবা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এখন তাদের সংসার চলছে অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে।

অনামিকার বাবা শ্রী অনিল চন্দ্র বলেন, আমার বাড়ি ভিটা শুধু ২৪ শতক। আর কোনো আবাদি জমি নেই। দিন মজুরি করে সংসার চালাই। যে দিন কাজ কামাই হয় না সেই দিন ধার দেনা করি চলা লাগে। তিন মেয়েকে অনেক কষ্টে বিয়ে দিছি। অনামিকার লেখাপড়ার খুব আগ্রহ কিন্তু আমার তো টাকা পয়সা নাই। কীভাবে লেখাপড়া করামো। কেউ যদি আমার মেয়ের লেখা পড়ার ভার নিতো, তাহলে মেয়েটা ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারতো।

অনামিকা জানায়, আমি লেখাপড়া করে শিক্ষক হতে চাই। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

কাশীপুর কলেজের প্রভাষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, অনামিকা রায় আমাদের কলেজের একজন মেধাবী ছাত্রী। সে যদি সুষ্ঠু পরিবেশ পায় তাহলে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

কেন্দ্র সচিব অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম জানান, অনামিকা একজন মেধাবী ছাত্রী। সে শারীরিক প্রতিবন্ধী থাকা সত্ত্বেও এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করেছে এবং এবারে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সে যদি ভালো পরিবেশ পায়, তাহলে সে অনেক বড় হবে।

এবার এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায় উপজেলায় ফুলবাড়ি ডিগ্রি কলেজ, ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাইফুর রহমান সরকারি কলেজ, বোয়াইলভীড় টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ এবং শাহবাজার আবুল হোসেন সিনিয়র (কামিল) মাদরাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ১০৫ জন। এদের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে এক হাজার ৭৪ জন। অনুপস্থিত ৩১ জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *