গাজীপুর সিটিতে পল্লী বিদ্যুতের পরিবর্তে নগর উপযোগী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দাবি!

Slider গ্রাম বাংলা

মো জাকারিয়া,গাজীপুর: গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার লাখো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ের কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থী, রোগী, শিশু, বয়স্ক, ব্যবসায়ী, শিল্পকারখানার শ্রমিক, চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় মানুষের দুর্ভোগ অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় প্রতিদিন একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। আগাম কোনো ঘোষণা বা নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মোট ৫৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রায় ৪২টি ওয়ার্ড সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ, সিটি করপোরেশনের প্রায় ৭৩ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। বাকি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও এর অধীনস্থ সমিতিগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, কৃষি ও গ্রামীণ শিল্পের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নত করা। অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ সিটি করপোরেশন এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করে নগরভিত্তিক বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো।

এই বাস্তবতায় গাজীপুরবাসীর প্রশ্ন—দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মতো গাজীপুর সিটি করপোরেশনেও কি একটি একক ও নগর উপযোগী বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে? গাজীপুরবাসী পল্লী বিদ্যুতের পরিবর্তে নগরভিত্তিক বিদ্যুৎ সেবা কবে পাবে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের কর্মচারীর দায়িত্ব জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। এছাড়া বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (BERC) নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার দায়িত্ব নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
নাগরিকদের দাবি, যদি বর্তমান ব্যবস্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর নগরভিত্তিক ব্যবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

এদিকে সাম্প্রতিক অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নাগরিকরা মনে করছেন, কারিগরি ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি অথবা অন্য কোনো কারণ থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। কোথাও গাফিলতি, অনিয়ম বা ইচ্ছাকৃতভাবে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়ে থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

সচেতন নাগরিকরা আরও বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখার প্রয়োজন হলে আগাম নোটিশ দেওয়া উচিত। এতে সাধারণ মানুষ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবে এবং দুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে।

গাজীপুরবাসীর দাবি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; তাদের একমাত্র প্রত্যাশা হলো নিয়মিত, নিরবচ্ছিন্ন, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক বিদ্যুৎ সেবা।

সর্বশেষ কথা
সরকার দেশের বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে—এমন প্রত্যাশা নাগরিকদের। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি গাজীপুরবাসীর আহ্বান—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করুন, যাতে নগরবাসী নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সেবা পায় এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *