
২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখলেও মূল বাজেটে তা কমানো হচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য করপোরেট করহারে আড়াই শতাংশ হারে ছাড় দেওয়া হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র বলছে, মূলত বিনিয়োগ উৎসাহিত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর জিডিপি বাড়াতে ব্যবসার ক্ষেত্রে এই ছাড় দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আড়ালে করহার ছাড় দেওয়া হতে পারে ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট বসানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে সরকার। ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএন-এর বাধ্যবাধকতা বাতিল হতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই ধরনের ছোট-খাটো আরও কিছু পরিবর্তন এনে ৩০ জুন বাজেট পাস করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
করপোরেট কর কমছে আড়াই শতাংশ
এনবিআর সূত্র বলছে, প্রকৃত বাজেটে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে শর্ত সাপেক্ষে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হতে পারে। বিনিয়োগ উৎসাহিত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর জিডিপি বাড়াতে করপোরেট করে এই ছাড় দেওয়া হতে পারে। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়নি।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান, যাদের পরিশোধিত মূলধনের অন্যূন ১০ শতাংশের নিচে, তাদের করহার সাড়ে ২২ শতাংশ রয়েছে। তবে ক্যাশলেস বা ব্যাংকে লেনদেনের শর্ত পরিপালনে ২০ শতাংশ বহাল রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে যাদের ১০ শতাংশের নিচে, তাদের করহার শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ করা হচ্ছে। বাকিদের করপোরেট করহার অপরিবর্তিত থাকবে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ছাড়লে কর হার ২০ শতাংশ। সাধারণ কোম্পানির কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর ৪০ শতাংশ, তামাক প্রস্তুতকারক কোম্পানি কর ৪৫ শতাংশ, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মোবাইল অপারেটরের কর ৪০ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত মোবাইল অপারেটর ৪৫ শতাংশ, ট্রাস্ট, ব্যক্তিসংঘ ও ফার্মের করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, সমবায় সমিতি ২০ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে আগের মতোই করপোরেট করহার বহাল রাখা হয়েছিল।
ব্যাংক হিসাব খুলতে লাগবে না ই-টিআইএন
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়। যদিও শিক্ষার্থী ও বিশেষ কিছু শ্রেণির হিসাবধারীদের জন্য এই নিয়মে ছাড় দেওয়া হয়। তবে ৩০ জুন পাশ হতে যাওয়া এমন বাধ্যবাধকতা থেকে সরে আসতে পারে সরকার। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএন-এর বাধ্যবাধকতা বাতিল হতে পারে।
স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স হ্রাস করে ৫ শতাংশ হচ্ছে
প্রস্তাবিত বাজেটে করদাতাদের স্বর্ণ বিক্রিতে ‘গেইন ট্যাক্স’ চালুরা ঘোষণা এসেছে। যার পরিমাণ ১৫ শতাংশ। তবে চূড়ান্ত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার আয়কর ফাইলে থাকা স্বর্ণ বিক্রির গেইন ট্যাক্স কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। অর্থাৎ স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রি থেকে আয় দেখালে তার ক্যাপিটাল গেইন বা মুনাফার উপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
এ বিষয় এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, অঘোষিত সম্পদ বৈধ করতে কর ফাইলে বাড়তি স্বর্ণের মজুত দেখানোর যে প্রবণতা রয়েছে, তা ঠেকাতেই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি করদাতার করফাইলে স্বর্ণ হলো একটি ভৌতিক সম্পদ। অনেকেই ২০–৪০ ভরি স্বর্ণ দেখালেও মূল্য অজানা দেখায়। অথচ বাস্তবে ওই করদাতার স্বর্ণ ১–২ ভরিও নেই। ভবিষ্যতে অজানা উৎস থেকে আসা অর্থ বা সম্পদ কর না দিয়ে কর ফাইলে দেখানোর সুযোগ রাখতেই অনেকে এভাবে স্বর্ণের মজুত দেখান। পরে সেই অর্থকে স্বর্ণালংকার বিক্রির আয় হিসেবে দেখানো হয়।
কর্মকর্তা বলেন, একজন করদাতা যেদিন থেকে আয়কর ফাইল খুলেছেন, সে সময় স্বর্ণের দাম যা ছিলো, বর্তমানে বিক্রির সময় যে দাম পাবেন, করফাইল খোলার দামের থেকে বিক্রির দাম বাদ দিলে যে লাভ বা গেইন হবেন, তার ওপর ৫ শতাংশ কর দিতে হবে। অর্থবিল, ২০২৬-করদাতার রিটার্নে ঘোষিত স্বর্ণ, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, হীরা, মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, শিল্পকর্ম, পুরাকীর্তি ও ক্লাবের সদস্যপদ বিক্রি বা হস্তান্তর থেকে অর্জিত মুনাফাকে মূলধনি মুনাফা হিসেবে গণ্য করে ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
কমছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর
আগামী অর্থবছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহারও কমানো হতে পারে। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে করহার ১০ শতাংশ রয়েছে, তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ আরো উন্নত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার এই করহার কমিয়ে আনছে। তবে আগামী অর্থবছর করহার কমাতে কোনো শর্ত দেওয়া হচ্ছে না। ভবিষ্যতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই করহার বহাল রাখার ক্ষেত্রে সরকার শর্তারোপ করতে পারে।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ইউজিসি অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬টি। তবে চালু রয়েছে ১০৩টি। এছাড়া ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ২৬টি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, ২০টি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে।
করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ হচ্ছে
বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রয়েছে, চূড়ান্ত বাজেটে তা বেড়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য করদাতাদের ২৫ হাজার টাকা করে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হতে পারে। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬–২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা বহাল রাখা অর্থাৎ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছর ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছর ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
এনবিআর সূত্র বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছর ৪ লাখ এবং ২০২৭-২৮, ২০২৮-২৯ অর্থবছর সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছর পাঁচ লাখ টাকা করা হতে পারে। তবে রেয়াতের সীমা কমানো এবং সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজ, এফডিআর-এর সুদ থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে চূড়ান্ত কর দায়ের বদলে অগ্রিম কর হিসাবে গণ্য করায় করদাতাদের ওপর করের বোঝা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
এছাড়া শেয়ারবাজারের স্বার্থে লভ্যাংশ কর আগের মতোই ২০ শতাংশ রাখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিল সংশোধনের মাধ্যমে লভ্যাংশের এই করহার বিলুপ্ত করা হয়। ফলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর নিয়মিত করপোরেট করহার প্রযোজ্য হয়।
