র‍্যাব-পুলিশ দিয়ে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাবে না, বেতন বাড়লে কমবে দুর্নীতি

Slider জাতীয়

দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে র‍্যাব-পুলিশ কিংবা কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের ওপর নির্ভর না করে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি, বাজার ব্যবস্থার দক্ষ পরিচালনা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাজারে পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সামগ্রিক বাজার সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যবসায়িক অদক্ষতা দূর করা, অতিরিক্ত ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যয় কমানো এবং সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত কাঠামোগত সংস্কারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার কোনো বিকল্প নেই।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-উত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানাদিক নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দেশের সামষ্টিক মূল্যস্ফীতির ওপর বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, যার সঙ্গে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি যুক্ত হয়েছে। এর বাইরে দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি এবং বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক হারে অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিলের ব্যয় বা কস্ট অব ফান্ড অনেক বেশি রয়েছে, যার সরাসরি ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রতিফলন পড়ছে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ও খুচরা বাজারের ওপর। বিশ্ববাজারে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ার কারণেও দেশের বাজারে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস কমাতে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা কিংবা আমদানি-রপ্তানির প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পেতে বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যেখানে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অদৃশ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের হার, দেশের বন্দরগুলোতে পণ্য খালাস থেকে শুরু করে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত নানা ধাপের অতিরিক্ত খরচ এবং বিভিন্ন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার কারণে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কারণে যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়, সেখানে সরকারের সরাসরি করার খুব বেশি কিছু থাকে না মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যেসব কারণে ব্যবসার কৃত্রিম ব্যয় বাড়ে, সেগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সহজীকরণের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নিচের দিকে থাকায় এখানে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও অনেক বেশি, যা আমূল পরিবর্তনের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় কমানোর ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর রাখার ওপর বিশেষ তাগিদ দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পণ্যের মূল উৎস বা উৎপাদনস্থল থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনকে নিয়মিত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি, খাদ্য ও সারসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা থাকতে হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে অন্তত তিন মাসের অগ্রিম মজুত এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় গুদামজাতকরণ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে তাৎক্ষণিক ক্রয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যেখানে বিশ্ববাজারের মূল্যের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত গুদাম ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত রাষ্ট্রীয় মজুত গড়ে তোলা গেলে আমদানি ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা আনা, আমলাতান্ত্রিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বন্দরকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কমানো গেলে সামগ্রিক ব্যবসার খরচ এবং পণ্যের পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধি সরকারি খাতের দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে কি না- এমন একটি সরাসরি প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বলেন, মানুষের যখন মৌলিক অভাব থাকে, তখন জীবনধারণের তাগিদে দুর্নীতির দিকে ঝোঁকার একটি মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রবণতা তৈরি হয়, এটি সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি নির্মম সত্য এবং তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো বা জাতীয় পে-স্কেল প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন করে সমন্বয় করা হয়নি এবং এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে সেই কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্রুত পুনর্নির্ধারণ ও সমন্বয় করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রতিনিয়ত বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দুই খাতের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মধ্যে একটি বড় ধরনের সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। নতুন বাজেটের ধারাবাহিকতায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর অর্থনৈতিক সমস্যা দূর করে যখন তাদের বৈধ আয় বাড়বে এবং জীবনযাত্রা উন্নত হবে, তখন মাঠপর্যায়ে ও দাপ্তরিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি স্বাভাবিকভাবেই অনেকাংশে কমে আসবে বলে জানান তিনি।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুরোপুরি সচল ও স্থিতিশীল হতে দীর্ঘ সময় লাগবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি অত্যন্ত কঠিন এবং জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং একে টেকসই ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে নিতে সময় প্রয়োজন। আগামী অন্তত দুই বছর কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়কে এগিয়ে নিতে হবে এবং এরপর ধীরে ধীরে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, যার সুফল হিসেবে চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে। বর্তমান সরকার অতীতে নেওয়া তথাকথিত বড় বড় ও অনুৎপাদনশীল মেগা প্রকল্পের মোহের বাইরে গিয়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এখন থেকে প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানি বা অর্থের সঠিক ব্যবহার কঠোরভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দেশের সংস্কৃতি, বিনোদন ও অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতকে অর্থনীতির একটি নতুন ও শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে ঢাকার অদূরে পূর্বাচলে ১৬০ একর বিশাল জায়গাজুড়ে একটি বিশ্বমানের সমন্বিত ক্রিয়েটিভ সেন্টার গড়ে তোলার দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, থিয়েটার, শিল্পকলা, আধুনিক ডিজাইন স্টুডিও, বিনোদন কেন্দ্র ও নানামুখী সৃজনশীল কার্যক্রমের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই বিশাল কেন্দ্রটি শুধু মানুষের বিনোদনের ক্ষেত্রই তৈরি করবে না, বরং সংস্কৃতিকে একটি অত্যন্ত লাভজনক ও আয়মুখী শিল্পে রূপান্তর করে লাখো তরুণের কর্মসংস্থান ও পর্যটনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এই ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অংশ হিসেবে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু করছে।

অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং আবাসন খাতে কালো টাকা প্রতিরোধ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মৌজার সরকারি রেট বা জমির নির্ধারিত মূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম থাকে, যা বছরের পর বছর ধরে কালো টাকা তৈরি ও তা সাদা করার একটি আইনি ফাঁকফোকর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ জন্য সরকার পুরো বাংলাদেশে একটি নিবিড় মৌজাভিত্তিক ডিজিটাল সার্ভে শুরু করতে যাচ্ছে যেন মৌজার রেটকে জমির প্রকৃত মার্কেট প্রাইসের সমকক্ষ করা যায়, যা সম্পন্ন হলে দেশে কালো টাকা ও কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

একই প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ফ্ল্যাট বা জমি ক্রেতারা যখন ডেভেলপারদের কাছ থেকে প্রকৃত মূল্যে ফ্ল্যাট কেনেন, তখন রেজিস্ট্রেশন খরচ বাঁচাতে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করেন, যা মূলত মারাত্মক ট্যাক্স ফাঁকি। এনবিআরের কাছে এখন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এর পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে এবং পরবর্তীতে ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করে জরিমানাসহ অতিরিক্ত ট্যাক্স আদায় করা হবে। তবে আবাসন খাতে সাময়িক স্বস্তি দিতে কেউ যদি নিজের থেকে অপ্রদর্শিত অর্থ ডিক্লেয়ার বা ঘোষণা করেন, তাহলে নিয়মিত করের পাশাপাশি মাত্র ২০ শতাংশ অতিরিক্ত জরিমানা কর দিয়ে তা আইনিভাবে বৈধ দেখানোর একটি বিশেষ সুযোগ এই বাজেটে রাখা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিজস্ব ব্যাখ্যা। সম্মিলিত পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ব্যাংকগুলো নিয়ে ছড়ানো সব ধরনের নেতিবাচক তথ্য ও গুজব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্মিলিত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে বলে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা সঠিক নয়, বরং এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি ও পুনর্গঠন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তবে ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটাতে তিনি একটি বড় ধরনের নীতিগত ও নৈতিক দ্বিধার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে একটি নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি ও পাচার করে নিয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাধারণ রিকশাচালক বা নিম্ন আয়ের করদাতা যিনি প্রতিদিন পণ্য কিনে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রকে ভ্যাট দেন, তার কষ্টের করের টাকা রাজস্ব খাত থেকে এনে এই ব্যাংকের ক্ষতি বা চুরি হওয়া আমানত পূরণ করা কতটুকু ন্যায়সঙ্গত, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নীতিপ্রণেতারা গভীর নীতিগত দ্বিধায় রয়েছেন। কারণ একবারে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব খাত থেকে এনে দেওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য বাস্তবসম্মত নয়, তাই আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াসহ অন্যান্য বিকল্প উপায়ের মাধ্যমে এর টেকসই সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

টাকা চুরির বিষয়টি বর্তমান প্রশাসন প্রথম দিন থেকেই কঠোরভাবে অনুসরণ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক প্রায় ১০টি সংস্থার সঙ্গে আইনি চুক্তির মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিশ্বের একাধিক দেশে পাচারকারীদের অবৈধ সম্পদ ফ্রিজ বা জব্দ করার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দেশের আর্থিক লেনদেনকে শতভাগ ক্যাশলেস ও আধুনিক করতে আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে দেশজুড়ে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে, যা নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমাবে।

ইসলামি ব্যাংকে অনিয়মতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে গভর্নর বলেন, সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগে আইন অনুযায়ী শুধু একজন বোর্ড সদস্যকে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং ঈদের আগে তৎকালীন চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনি নিয়ম মেনেই নতুন যোগ্য চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে জরুরি তারল্য সহায়তা বা ইমারজেন্সি লিকুইডিটিও অনুমোদন করেছে এবং আমানতকারীদের টাকা তুলতে কোনো সমস্যা হবে না।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নিজের নিয়োগকালীন সময়ে ওঠা ‘ঋণ খেলাপি’ হওয়ার বিতর্ক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা নিয়ে প্রথমবার মুখ খোলেন এবং দেশের গণমাধ্যমের সামনে তার ব্যক্তিগত আইনি অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জোরালোভাবে তথ্য-প্রমাণসহ ব্যাখ্যা করে বলেন, তার মালিকানাধীন নারায়ণগঞ্জভিত্তিক তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্স একটি বিশ্বমানের পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন ফ্যাক্টরি, যা প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি, কোনোদিন কারখানাটির এক্সপোর্ট আটকায়নি বা শ্রমিকদের বেতন বকেয়া থাকেনি। কারখানাটির শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক এফএসএসপি প্রজেক্টের অধীনে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে অর্থায়ন করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাংক হঠাৎ ফান্ড শেষ হওয়ার অজুহাতে সুদের হার বাড়িয়ে ৯ থেকে ১১ শতাংশ করে দেয়। এর পরপরই বিশ্বব্যাপী কোভিডের মহামারি শুরু হওয়ায় কারখানার প্রাথমিক প্রজেকশন অনুসারে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের কিস্তিতে কিছুটা বিলম্ব বা ওভারডিউ হয়েছিল। তবে এই প্রতিষ্ঠানটি কোনোদিন ব্যাংকের কাছে এক টাকাও ঋণ মওকুফ বা ওয়েভার চায়নি এবং ইতোমধ্যে ব্যাংকের মূল পাওনা থেকে ১০০ কোটি টাকারও বেশি নিয়মিত পরিশোধ করে দিয়েছে।

ব্যাংকিং আইন ও বিধিমালা মনে করিয়ে দিয়ে গভর্নর বলেন, গত বছরের এপ্রিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার আওতায় আইনসম্মতভাবে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন অর্থ জমা দিয়ে তিনি ওই ঋণটি আগামী ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল বা রিসিডিউল করেছেন। দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং আইন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন, তবে তাকে আর খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করার কোনো আইনি সুযোগ থাকে না। সেই হিসেবে আইনগতভাবে তিনি বর্তমানে কোনোভাবেই ঋণখেলাপি নন এবং একটি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বারবার প্রচার করে বাজারে কৃত্রিম বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টার এই বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনটি সফলভাবে সঞ্চালনা করেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার।

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের এই গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে মঞ্চে ও দর্শকসারিতে উপস্থিত ছিলেন— বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি, মৎস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ (হাজী ইয়াছিন), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ রাজনৈতিক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনিসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও ঊর্ধ্বতন আমলারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *