এটা কি তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঘর ওয়াপসি’ বা ঘরে ফেরা হতে যাচ্ছে? এখন এই প্রশ্নই সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে। ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস ছাড়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) গঠন করেছিলেন মমতা। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও যে বিষয়টিকে অনুমান হিসেবেও বিবেচনা করা যেত না, তা নিয়ে এখন তীব্র গুঞ্জন চলছে। তবে কোনও কিছু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর পেছনে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নই রাখতে চাই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি সত্যিই তার টিএমসিকে কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত বা বিলীন করতে যাচ্ছেন?
রাজনীতিতে কোনও কিছুই অস্বাভাবিক নয়। এক অস্বাভাবিক ঘটনাক্রমের জের ধরেই নয়াদিল্লির গণমাধ্যম পাড়ায় এই আলোচনা ডালপালা মেলছে। বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা যাক। পশ্চিমবঙ্গে নিজ দরের বিধায়কদের প্রকাশ্য বিদ্রোহের মুখোমুখি হওয়ার পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। এমনকি তার দলের কাউন্সিলর ও স্থানীয় নেতারাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সংকট চলছে বাংলায়, অথচ তিনি আছেন দিল্লিতে। কিন্তু কেন?
মমতা ও তার ভাতিজা তথা টিএমসির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইনডিয়া’র বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। মমতা শেষ কবে ‘ইনডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন, তা হয়তো অনেকের স্মরণে নেই। লোকসভায় ২৯টি এবং রাজ্যসভায় ১২টি আসন নিয়ে তৃতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল টিএমসি কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর বিরুদ্ধে নিজস্ব রণকৌশল তৈরি করেছিল। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মমতার সম্পর্ক যেখানে তেমন ভালো ছিল না, সেখানে হঠাৎ এই সখ্য কেন?
গত মঙ্গলবার সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; যা গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম। বৈঠকে ‘টিএমসির ভবিষ্যৎ এবং জোটের রাজনীতি’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বুধবার কংগ্রেসের কার্যত প্রধান রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার আবারও সোনিয়ার সঙ্গে মমতার দেখা করার কথা ছিল। একের পর এক এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের রহস্য আসলে কী?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং এই পুরো সময় বাংলায় তার দল টিএমসি একচ্ছত্র শাসন বজায় রেখেছিল। টিএমসি নেতারা দুর্নীতি, বলপ্রয়োগ, নিগ্রহ ও দমনের মাধ্যমে শাসন চালিয়েছেন এবং দলটিকে তখন ইস্পাত-দৃঢ় বলেই মনে হতো। দেখে মনে হয়েছিল, কোনও ঝড়ই এর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।
মমতা বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। বাংলার ভেতর তার শক্তি এতটাই ছিল যে, নিজের সংসদ সদস্যদের ক্ষমতার জোরে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও প্রধান ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ৪ মে সবকিছু বদলে যায়।
যে নেতাকে একসময় অদম্য মনে হতো এবং যে দলটিকে বাংলায় অপরাজেয় ভাবা হতো, তারা বিজেপির ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে। এটি যেমন মমতার ও তার দলের বিরুদ্ধে ভোট ছিল, ঠিক তেমনি বিজেপির পক্ষেও ভোট ছিল। তার এক দশকেরও বেশি সময়ের দুঃশাসনই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল। ২৯৪ আসনের বাংলা বিধানসভায় টিএমসি মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে টিভির কলকাতা ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ইন্দ্রজিৎ কুণ্ডু মঙ্গলবার এক লাইভ সম্প্রচারে বলেন, হাতে থাকা অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতির মাঝে…কংগ্রেসের সঙ্গে টিএমসিকে একীভূত করার এই বিকল্প মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে প্রস্তাব করা হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
নেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে অভিষেকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যেমন তাৎক্ষণিক ছিল, ঠিক তেমনি তীব্র ছিল স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ। ১০০ জনেরও বেশি টিএমসি কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মমতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ককে নিয়ে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা (এলওপি) হয়েছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদার দলের ২৮ জন এমপির মধ্যে ২০ জনেরও বেশি সদস্যের সমর্থন দাবি করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই মমতা টিএমসির অবিসংবাদিত অভিভাবক থেকে নিজের তৈরি করা (১৯৯৮ সালে) দলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরু করেন। কিন্তু শিবসেনা ও এনসিপির অতীত দৃষ্টান্ত বিবেচনা করলে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন, এখানে তার জেতার সুযোগ খুব একটা নেই।
বিদ্রোহীদের পক্ষে বিধানসভা ও সংসদ—উভয় ক্ষেত্রেই যে সংখ্যার উপস্থিতি ছিল, তা দলত্যাগ বিরোধী আইনকে অকার্যকর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
• কংগ্রেসের সঙ্গে কে মিশে যাচ্ছে, প্রশ্ন টিএমসি বিদ্রোহী ঋতব্রতের
তবে দল থেকে বিদ্রোহ করা বাংলার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এই একীভূতকরণের গুঞ্জনের মধ্যে জল ঢেলে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ৬৪ জন বিদ্রোহী বিধায়ক এবং প্রায় ২০ জন এমপি টিএমসিকে কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত করার যেকোনও পদক্ষেপের বিরোধিতা করবেন।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিদ্রোহী শিবিরে টিএমসি বিধায়কদের মোট সংখ্যা বেড়ে ৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেসের সঙ্গে মমতার টিএমসিকে একীভূত করার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ঋতব্রত বলেন, ‘‘আমাদের বিধায়করা তা করবেন না। ২০ জন এমপি আছেন যারা কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাবেন না, তাহলে একীভূত হচ্ছেটা কে? কংগ্রেসের সঙ্গে এমন একীভূতকরণের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।’’
তাহলে তিন দশক আগে কংগ্রেস ছেড়ে যে দলটি তিনি নিজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা বিদ্রোহীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তার সামনে সবচেয়ে ভালো বিকল্প কী হতে পারে? অনেকের মতে, এটি হলো কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হওয়া। এর মাধ্যমে তিনি হয়তো জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং তার ভাতিজা অভিষেকের জন্য একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবেন; যিনি অন্যথায় দলছুট ও একাকী হয়ে পড়তেন।
চিরকালের রাজপথের লড়াকু সৈনিক মমতা কি শেষ পর্যন্ত সত্যিই তার টিএমসিকে কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত করবেন? তার লড়াকু মনোভাবের কথা চিন্তা করলে এটি খুবই অসম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু বর্তমানে তিনি যেভাবে চতুর্মুখী সংকটে জর্জরিত, তাতে তার সামনে এটাই একমাত্র উপায় হতে পারে। তিনি কি টিএমসিকে কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত করবেন? আসলে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে আমরা এটি কেবলই অনুমানের ভিত্তিতে লিখছি না। এই বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নীতি-নির্ধারণী মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
• ভেঙে যাওয়া দলগুলোকে কংগ্রেসে ফেরার আহ্বান সঞ্জয় রাউতের
শিবসেনার (ইউবিটি) এমপি সঞ্জয় রাউত গত ৫ জুন কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়া সমস্ত দলকে আবার মূল দলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিজেপির আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে বিরোধী শিবিরের জন্য এটাই এখন সময়ের দাবি।
ইন্ডিয়া টুডে টিভির সাহিল জোশির সঙ্গে আলাপকালে রাজ্যসভার এমপি রাউত বলেন, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য জোরদার করার জন্য এটিই একমাত্র সমাধান। তিনি বলেন, টিএমসি, এনসিপি এবং কংগ্রেসের অন্যান্য দলছুট অংশগুলোর উচিত তাদের মূল দলে ফিরে গিয়ে একীভূত হওয়া।
রাউত বলেন, একটি শক্তিশালী বিরোধী জোটকে আরও ভালোভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবে কংগ্রেস। বিজেপি ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে ছোট আঞ্চলিক দলগুলোকে মুছে ফেলতে চায়।
• কংগ্রেস কি ‘তৃণমূল কংগ্রেস বাঁচাও’ অভিযানে নেমেছে?
বুধবার টিএমসি-কংগ্রেস একীভূতকরণের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল তুঙ্গে।
‘‘কংগ্রেস কি ডুবন্ত তৃণমূল কংগ্রেসকে বাঁচাতে কোনও অভিযান শুরু করেছে? তা না হলে, রাজনীতিতে সাধারণত নিষ্ক্রিয় সোনিয়া গান্ধী মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়ের সঙ্গেই আলাদা আলাদা বৈঠক করার পেছনে নিশ্চয়ই কোনও গল্প তৈরি হচ্ছে। দুই দলের একীভূতকরণ অথবা দল বাঁচাতে অভিষেককে সরিয়ে দেওয়া।’’ বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই প্রশ্ন তোলেন প্রবীণ সাংবাদিক প্রভু চাওলা।
সাংবাদিক ও লেখক সাবা নকভিও এই বিষয়ে নিজের মতামত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘কংগ্রেস-টিএমসি একীভূতকরণের বিষয়ে বলতে গেলে, এটি টিএমসিকে রাজ্যের বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকায় নিয়ে যাবে; যা গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এটি কংগ্রেসের জন্যও ভালো হবে। কারণ তারা টিএমসির বিশাল ভোটব্যাংকের নাগাল পাবে…।’’
ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটালে ১০ জুনের এক নিবন্ধে প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই প্রশ্ন তোলেন, বিরোধীদের কি এখন ‘ইনডিয়া’ জোট পুনর্গঠনে মনোযোগ দেওয়া উচিত, নাকি কংগ্রেস এবং এর থেকে তৈরি হওয়া বহু উপদলগুলোর একটি রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণ বিবেচনা করা উচিত?
‘‘একটি কারণ রয়েছে যার জন্য এই দলগুলো এখনও তাদের নামে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে কংগ্রেসের ছাপ বহন করে চলেছে। তারা কংগ্রেসের গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছে… আরও একটি ভঙ্গুর বিজেপি-বিরোধী জোট গড়ার চেয়ে, কংগ্রেসের এই উপদলগুলোর রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণের পথ কেন খোঁজা হচ্ছে না?’’ প্রশ্ন করেন ইন্ডিয়া টুডে টিভির কনসাল্টিং এডিটর সরদেশাই।
টিএমসি এবং কংগ্রেসের একীভূতকরণের গুঞ্জন তীব্র হওয়ার মাঝেই তার এই নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘একটি একীভূতকরণ অথবা অন্তত পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বোঝাপড়া… কংগ্রেসের এই উপদলগুলোর রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণ কেন খতিয়ে দেখা হবে না?’’
• টিএমসি-কংগ্রেস একীভূতকরণে মমতার লাভ কী?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে টিএমসির একীভূত হওয়া এমন এক সময়ে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার পথ দেখাতে পারে, যখন তার দল এক অভূতপূর্ব বিদ্রোহের মোকাবিলা করছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক সঞ্জয় সিং বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে টিএমসির আধিপত্য কমতে থাকলেও এই সম্ভাব্য একীভূতকরণ মমতা ও অভিষেককে জাতীয় রাজনীতিতে মজবুত অবস্থান এনে দেবে।
সিং বলেন, চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং যেকোনও মুহূর্তে একীভূতকরণের ঘোষণা আসতে পারে। বৈঠকের সময় সোনিয়া গান্ধী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
প্রথম প্রস্তাবটি সম্পর্কে তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করা হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা।
‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি কিছুটা সময় চেয়েছেন। আলোচনা রাতভর চলেছে। পরদিন সকালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। বৈঠকটি প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী হয়… অভিষেক পরে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বলেন, বৈঠক ‘ভালো’ হয়েছে; যা ইঙ্গিত করে যে বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।’’
সিং বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজস্ব কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছেন; যার মধ্যে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যসভায় পাঠানো এবং উচ্চকক্ষে তাকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে উন্নীত করা, যে পদে বর্তমানে মল্লিকার্জুন খাড়গে রয়েছেন।
• দিল্লিতে মমতার অস্বাভাবিক কার্যকলাপ
কয়েকজন সাংবাদিক অবশ্য টিএমসি ও কংগ্রেসের একীভূতকরণের এই আলোচনাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। মঙ্গলবার মমতা ও সোনিয়ার বৈঠকের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের বরাত দিয়ে সেখানে বলা হয়, ‘‘তারা ভবিষ্যতের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে জোট বাঁধার সম্ভাবনাও টেবিলে রয়েছে।’’
তা সত্ত্বেও দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ব্যাকস্টেজে অস্বাভাবিক কিছু একটা রান্না হচ্ছে। মমতা এর আগে ‘ইনডিয়া’ জোটের বৈঠকগুলোতে খুব বেছে বেছে অংশ নিতেন। অতীতে তিনি প্রায়ই টিএমসির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অভিষেক এবং ডেরেক ও’ব্রায়েনের মতো নেতাদের পাঠাতেন।
তিনি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বেঙ্গালুরুর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে বিরোধী জোটের আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছিল ‘ইনডিয়া’। এরপর একই বছরের সেপ্টেম্বরের মুম্বাই সম্মেলনেও ছিলেন। এর অনেক বছর পর গত ৮ জুন মমতা দিল্লির সেই হাইপ্রোফাইল বৈঠকে যোগ দেন; যা ঘটে তার দলের বাংলায় নির্বাচনী বিপর্যয় এবং টিএমসি বিধায়ক ও এমপিদের একটি বড় অংশ আলাদা দল গঠনের চেষ্টা করছেন এমন খবরের প্রেক্ষাপটে।
তবে তিনি ‘ইনডিয়া’ জোটের আরও বেশ কিছু সমন্বয় ও সংসদীয় কৌশলবিষয়ক বৈঠক এড়িয়ে গেছেন বা প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। ২০২৩ সালের জুনে পাটনায় অনুষ্ঠিত ‘ইনডিয়া’ জোটের প্রথম বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দেননি। নয়াদিল্লিতে পরবর্তী বেশ কয়েকটি সমন্বয় ও সংসদীয় কৌশলের বৈঠকও তিনি এড়িয়ে গেছেন।
‘‘তীব্র আলোচনা চলছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এভাবে বৈঠকের জন্য সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে ছুটে যেতে দেখিনি। নির্বাচনী বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এখন যে এটি ঘটেছে, তাই বলে দিচ্ছে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর,’’ বলেন ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ কুণ্ডু।
৮ জুন মমতা দেখা করেন সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে, যিনি নিজেও সম্প্রতি সবচেয়ে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রয়েছেন। কিন্তু সোনিয়া অবশ্যই এমন একজন ব্যক্তি যার কাছে মমতা স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাভাবিকভাবেই যান। তিনি হয়তো তরুণী মমতাকে তার প্রয়াত স্বামী রাজীব গান্ধীর একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে মনে রেখেছেন।
কংগ্রেসের সঙ্গে মমতার দুই দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিল; যা তিনি ১৯৯৭ সালে দলের পশ্চিমবঙ্গ ইউনিটের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ছিন্ন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বাংলাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং রাজ্যে সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হবে না।
তিনি ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন এবং ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টকে পরাজিত করেন।
ইতিহাস কি তবে বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে চলেছে? যে মমতার টিএমসি একসময় পশ্চিমবঙ্গ থেকে কংগ্রেসকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, তিনি কি শেষ পর্যন্ত নিজের দলটিকে সেই মূল জাহাজেই নোঙর করতে যাচ্ছেন?
লড়াকু মমতার চরিত্রের কথা বিবেচনা করলে এটি অসম্ভব মনে হয়। তবে তিনি এখন এক উভয়সংকট বা ক্যাচ-২২ পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং এই মুহূর্তে তার হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই। টিএমসি-কংগ্রেস একীভূতকরণের আলোচনা নিয়ে তীব্র গুঞ্জন চলছে। শেষ পর্যন্ত কি ঘটবে, আগামী দিনগুলোতেই হয়তো আমরা এর নিশ্চিত উত্তর পেয়ে যাব।

