সরেজমিন শ্রীপুর: ওরা এখন বিএনপি, তাদের হাতে জিম্মি লাখো মানুষ

Slider গ্রাম বাংলা

গাজীপুর: গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়ন। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সীমানায় অবস্থিত এই ইউনিয়নে প্রায় এক লাখ লোকের বসবাস। বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান এই ইউনিয়নে অবস্থিত হওয়ায় রাজনৈতিক মূল্য বেড়েছে এই ইউনিয়নের। শিল্প অধ্যুষিত হওয়ায় ক্রমান্বয়ে ঘণবসতিপূর্ণ এই এলাকা অপরাধপ্রবন। চুরি ডাকাতি ছিনতাই, মাদক চাাঁদাবাজী ও জমিদখলে রমরমা এই এলাকা। এই সব অপরাধ আওয়ামীলীগের সময় যারা নিয়ন্ত্রন করতেন এখনো তারাই নিয়ন্ত্রন করছেন তবে কোথাও নেতার ভাই নেতা আবার কোথাও আওয়ামীলীগে মিশে থাকা কথিত বিএনপি নেতা হিসেবে তারা এখন সাম্রাজ্যের মালিক বনে গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে কাওরাইদ ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রন করতেন রফিকুল ইসলাম মন্ডল। ২০১১ ও ২০১৬ সালে লুটের ভোটে মন্ডল বিএনপিকে মাঠে নামান। স্থানীয় বিএনপির বড় বড় অধিকাংশ নেতাই মন্ডলের নির্বাচন মাঠে নেমে করেছেন। মন্ডলের হয়ে প্রতিদ্বন্ধি চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে দাাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছেন বিএনপির নেতারাই। মানে হল, তখন আওয়ামীলীগ থেকে বিএনপির নেতারাই মন্ডলের কাছে ছিল বেশী শক্তিশালী। মন্ডল বিএনপির পুরো টিম মাঠে নামিয়ে নির্বাচন করেন। মন্ডল স্থানীয় বিএনপির বড় নেতাদের ভাতিজা হওয়ায় বিএনপিকে সহজেই ব্যবহার করতে সক্ষম হন। ২০১৮ সালে মন্ডলের মৃত্যুর পর কাওরাইদ ইউনিয়ন দখলে নেয় যুবলীগ নেতা কামরুল ইসলাম মন্ডল। তবে ২০১৯ সালের উপ-নির্বাচন ও ২০২২ সালের সাধাারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ কামরুলকে মনোনায়ন না দিয়ে এডভোকেট আজিজুল হককে মনোনায়ন দেন। ফলে লুটের ভোটে আজিজ দুইবার চেয়ারম্যান হয়ে যান। এই দুই নির্বাচনে কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপির বড় বড় নেতাদের অনেকেই কামরুল মন্ডলের নির্বাচন করেছেন প্রকাশ্যে। কামরুলের পক্ষে নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্যও দিয়েছেন অনেক বিএনপির কথিত নেতা। এমনও দেখা গেছে, নিজের ভাই প্রার্থী হলেও কামরুল মন্ডলের পক্ষে পথসভায় বক্তব্য দিয়ে নেতিবাচক সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন একাধিক বিএনপির নেতা। আওয়ামীলীগের প্রতি বিএনপির কতিপয় নেতাদের এই নৈতিক ত্যাগের ফলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগষ্ট পর্যন্ত আওয়ামীলীগের পুরো আমলে কাওরাইদ ইউনিয়নের নেতৃেত্বে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি জোটবদ্ধভাবেই ছিল। তবে এখানে আওয়ামীলীগের কথায় বিএনপি চলতই শুধু নয়, বিএনপির কথায়ও আওয়ামীলীগ চলত। মানে মিলেমিশে ভোগে ছিল আওয়ামী-বিএনপি সিন্ডিকেট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর এই সিন্ডিকেটের নেতারা প্রকাশ্যে বাহাস করে আনন্দের ফানুস উড়িয়ে এমন জানান দেয় যে, তারাই আসল বিএনপি। তাদের রাজনৈতিক শব্দ এত বেশী হয়েছে যে, এখানে আসল বিএনপি ঘর থেকে বের হতেই পারেনি। রাজপথে আওয়ামী- বিএনপি সিন্ডিকেটের কতিপয় নেতারা সোচ্চার থাকায় জেনেশুনেও উপজেলা বিএনপি এই সিন্ডিকেট বিএনপির নেতাদেরই পদ পদবী দিয়েছেন। তবে অনেকে আশ্চর্য হয়েছেন যে, বিএনপির এমপি ডা: রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর সীমানা ঘেঁষা কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপির কতিপয় নেতারা আওয়ামীলীগের সময় ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় প্রকাশ্যে আওয়ামীলীগ করে কি ভাবে বিএনপির পদ পায় আর এমপি দেখেও না দেখার ভ্যান করেন কি না সেটা নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরছে। তবে সময় যাত যাচ্ছে, কথিত বিএনপি-আওয়ামী সিন্ডিকেট ততই দুর্বল হচ্ছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়ে মানুষ রাস্তায় নামলে নেতারা বুঝবে তাদের ভুল হয়েছিল।

অনুসন্ধান বলছে, বিএনপি ও আওয়ামী সিন্ডিকেটের হাতে এখন কাওরাইদ ইউনিয়নের লাখ মানুষ জিম্মি। ভাসমান মানুষ বেশী হওয়ায় দিন দিন ঘনবসতির ব্যাপকতা বাড়ছে। মানুষ বেশী হওয়ায় অপরাধও বাড়ছে। আর এই অপরাধ নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে সিন্ডিকেট। বর্তমানে কাওরাইদ ইউনিয়ন মাদকে ছেয়ে গেছে। সন্ধ্যা হলেই মাদকসেবীদের ভীড়। কাওরাইদ ইউনিয়নের প্রায় ২১টি স্পট এখন রমরমা মাদকের কেন্দ্র। সন্ধ্যা হলেই দলে দলে মাদেকসেবীরা স্পটে গিয়ে মাদক সেবন করে। এই মাদকের গডফাদার কারা এটা সহজেই বুঝতে পারে সাধারণ মানুষ। কারণ মাদক ব্যবসায়ীদের অনেককেই বিএনপি-আওয়ামী সিন্ডিকেট নেতাদের কথিত অফিসে রীতিমত দেখা যায়। গেলো ইফতার পার্টিতেই মাদক কারবারীরা বিএনপি নেতাদের সাথে সেলফি দিয়ে ফেসবুকে জানান দিয়েছেন যে, তারাও বিএনপি। মাদেকর পাশাপাশি চাাঁদাবাজী ও জমি দখল এখন ভালো ব্যবসা। ৫০ হাজার টাকা চাাঁদার জন্য এক কৃষককে তার ক্ষেতে ধানই রুপন করতে দেয়নি তিন কথিত বিএনপি নেতা। আর বনের জমি দখল করে ঘর বানানোর ব্যবসা করছেন অনেক নেতা। ৫ আগষ্টের পর কাওরাইদ ইউনিয়নে ৪৪ টি ঘর উঠেছে বনের জমিতে। এই সব বিষয়ে বনের লোকজন ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয় বিএনপির নেতারা হুমকি দেয়। জানা গেছে, কাওরাইদ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে লোকালয়ে একটি অবৈধ মবিল তৈরীর কারখানা চলছে আওয়ামীলীগের আমল থেকেই। এই কারখানায় মবিল তৈরীর বিকট শব্দে প্রতি বৃহসপতিবার শত শত মানুষ আতকে উঠে। আর পুঁড়া মবিলের গন্ধে অসংখ্য মানুষ অসুস্থ হচ্ছেন। জানা গেছে, এই কারখানার নিয়ন্ত্রক,ভাড়া মালিক ও ম্যানেজার আওয়ামী-বিএনপির সিন্ডিকেটের ৪ কথিত নেতা। এই এলাকায় আগেও যারা চোর ধরে মারপিট করে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিত, এখনো তারাই এই কাজটি করছেন কারণ তারা বিএনপি-আওয়ামী সিন্ডিকেট। আগেও যারা এলাকায় বিচার শালিস করতেন এখনো তারাই করছেন কারণ তারা বিএনপি-আওয়ামী সিন্ডিকেট। এমনও ঘটনা ঘটছে, নবম শ্রেনীতে পড়ুয়া এক শিশুকে অনৈতিক কাজের জন্য বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঘটনার পর ছেলে পালিয়ে যাওয়ায় ছেলের বাবাকে ধরে হাত পা বেঁধে মারপিট করে দুই লাখ টাকা মুক্তিপন নেয়ার অভিযোগ কয়েক বিএনপি নেতারা বিরুদ্ধে আর এই খবর ফেসবুকে ভাইরাল। এরকম অসংখ্য ঘটনায় কাওরাইদ ইউনিয়নের মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে জিন্মি।

এই অবস্থায়, কাওরাইদ ইউনিয়নের লাখ মানুষ বিএনপি-আওয়ামী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস কারো নেই। আগেও সাহস ছিল না, এখনো নেই। সাধারণ মানুষ বলছেন, এই লাখ মানুষ মুক্তি পাবে কবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *