ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছেন হাজার হাজার গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার।
আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করলেও তারা পিছু হটেননি। বরং বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় সংগঠিত হয়ে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেন তারা। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে গ্রাহক ও পুলিশ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
সোমবার (১ জুন) সকালে ‘ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ’ ব্যানারে মতিঝিলের ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে অংশ নিতে সকাল থেকেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা জড়ো হতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মানববন্ধন শুরু হলে ঘটনাস্থলে অবস্থান নেওয়া পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ চালায়। এতে বহু গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার আহত হন বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের দাবি, পুলিশের অভিযানে শতাধিক গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার আহত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অতর্কিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
গ্রাহকদের দাবি, শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে পুলিশ অতর্কিতভাবে হামলা চালিয়ে টিয়ারশেল, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। এতে শতাধিক গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার আহত হন এবং প্রায় ৫০ জন গ্রাহক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে কয়েকশ মানুষ অবস্থান নিয়ে কার্যত অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। মতিঝিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় এতে আশপাশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল এবং এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, পুলিশ বারবার তাদের বুঝিয়ে সড়ক ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তারা সরে না গিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে।
উপকমিশনার নাসিরুদ্দিনের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্দোলনকারীদের কয়েক দফা সতর্ক করা হয়। এরপরও তারা সড়ক না ছাড়ায় আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সংঘর্ষে মতিঝিল বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) পেট্রোলসহ অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
মুখোমুখি অবস্থানে পুলিশ-গ্রাহক
পুলিশি অভিযানের মুখে কিছু সময়ের জন্য বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও বেলা ১২টার পর আবারও তারা সংগঠিত হয়ে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং ব্যাংকটিকে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিক অভিযোগ করেন, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান এবং এমডি ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়।
তিনি দাবি করেন, এই নিয়োগের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে আবারও এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। শুরু থেকেই গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা এ নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছেন।
নুর নবী মানিক বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত মালিক ও উদ্যোক্তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এই নিয়োগ মেনে নেব না।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকে পুনরায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এর প্রতিবাদে গত ২৪ মে দেশের বিভিন্ন শাখার সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি আমলে নেয়নি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে তারল্য সংকটে রয়েছে। অনেক গ্রাহক চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না। বিভিন্ন এটিএম বুথেও নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থার জন্য তারা ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন।
বিক্ষোভকারীরা ঘোষণা দিয়েছেন, মো. খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে। একইসঙ্গে সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তারা।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। পরে সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই একাংশের গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে হাজার হাজার গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার অবস্থান করে আছেন। অপরদিকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যও সেখানে মোতায়েন রয়েছে। ফলে এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং উভয় পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।

