জেলা প্রশাসক সম্মেলনের (ডিসি সম্মেলন) দ্বিতীয় দিনের ধারাবাহিক অধিবেশনগুলোতে সংস্কৃতি, পর্যটন, অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ধর্ম ও কর্মসংস্থানসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী দিকনির্দেশনা ও মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম অধিবেশন : সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতে জোর
দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের পুরাতন কালেক্টরেট ভবনকে জাদুঘরে রূপান্তর, বিভিন্ন জেলার রাজবাড়ি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম জোরদার এবং নতুন শিল্পকলা একাডেমি ভবন নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
একই সঙ্গে কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, বরগুনা ও নেত্রকোণায় আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা, কক্সবাজার সৈকতে উদ্ধারকারী কার্যক্রম পুনরায় চালু, সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং নতুন পর্যটন অঞ্চল ঘোষণার বিষয়ও আলোচনায় আসে।
অধিবেশন শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে আগত দর্শনার্থীরা কোনো নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন। পাশাপাশি কক্সবাজারকে যাতে আরও ভালো রাখা যায়, সৈকত আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, সেদিকেও তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে মনপুরা এবং নেত্রকোণার মতো জায়গাগুলোতে পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এভাবে চার-পাঁচটা জেলার কথা এসেছে। পর্যটনটা যদি সুন্দর করে গড়ে তোলা হয় তবে অনেক দর্শনার্থী আসবে। দেশকেও মানুষ জানবে-চিনবে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানান, দেশে নতুন করে আরও প্রত্নতত্ত্ব অনুসন্ধান করার পাশাপাশি পুরোনো শিল্পকলা ভবন এবং লাইব্রেরিগুলো সংস্কার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদের।
দ্বিতীয় অধিবেশন : অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা
দ্বিতীয় অধিবেশনে অর্থ বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও পরিকল্পনা বিভাগ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলোচিত হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই জনবল নিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা বলয় সম্প্রসারণ, ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন, ক্যাশলেস ট্রানজেকশন চালু এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির ওপর আলোচনা হয়।
এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, এডিপি বাস্তবায়ন তদারকি এবং জনশুমারিতে জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় ভূমিকার বিষয়েও আলোচনা হয়।
অধিবেশন শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ সাকি বলেন, আগামীতে সরকার যে প্রকল্পগুলো হাতে নেবে, সেখানে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা বিনিয়োগ থেকে আয়ের পরিমাণ মূল্যায়ন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসকরা যেসব সমস্যার কথা জানিয়েছেন, সেগুলো লিখিত আকারেও দিচ্ছেন। আমরা এগুলো নিয়ে পরবর্তীতে আরও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করব।
তৃতীয় অধিবেশন : কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি
তৃতীয় অধিবেশনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা উঠে আসে। চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধি, হ্যাচারি শিল্প গড়ে তোলা, মা ইলিশ সংরক্ষণ, হাওরে মৎস্য অভয়াশ্রম, আলুর বহুমুখী ব্যবহার এবং মাটির উর্বরতা রক্ষায় উদ্যোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ডিসি সম্মেলনে আলুর কম দামের বিষয়টি উঠে এসেছিল। আমরা এ খাদ্যপণ্যটির বহুমুখী ব্যবহার আরও বাড়াতে এবং রপ্তানিযোগ্য আলু চাষে মনোযোগ দিচ্ছি। এই বছর থেকেই ফ্রেঞ্চফ্রাই এবং চিপস করা যায় এমন আলুর চাষ শুরু করা হয়েছে। আশা করছি এগুলো রপ্তানি করতে পারব।
চতুর্থ অধিবেশন : বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর পরিকল্পনা
চতুর্থ অধিবেশনে শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন, তাঁত শিল্প উন্নয়ন, জিআই পণ্য বাজারজাতকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকেও বিভিন্ন উন্নয়নসংক্রান্ত প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে বন্ধ চিনিকল চালু, নতুন শিল্প এলাকা গড়ে তোলা এবং ডিস্টিলারির পণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসকদের নিজ নিজ এলাকার রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। এসব শিল্পের সমস্যা চিহ্নিত করে নতুন বিনিয়োগ আনা, আধুনিকায়ন এবং পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পঞ্চম অধিবেশন : যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে নিরাপত্তা
পঞ্চম অধিবেশনে সড়ক, সেতু, রেল ও নৌপরিবহন খাতে নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো আলোচিত হয়।
মহাসড়কে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, লোড নিয়ন্ত্রণ, চালক প্রশিক্ষণ, নতুন সেতু নির্মাণ এবং রেলপথ সম্প্রসারণের বিষয় গুরুত্ব পায়।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, জেলা প্রশাসকরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। সরকারের যে পরিকল্পনা বা নীতি গ্রহণ করেন বা যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য গৃহীত হয়। সেটা মাঠ পর্যায়ে তারা কার্যকর করেন। সেক্ষেত্রে কার্যকর করতে গিয়ে তারা যে সমস্ত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সেগুলো তারা শেয়ার করেছেন। কিছু প্রশ্ন, প্রত্যাশা ও দাবি তাদের আছে। সেটা আমরা শুনেছি এবং সেগুলো কীভাবে সমাধান হবে বা কতগুলো ইতোমধ্যে হয়েছে। সেগুলো তাদের জ্ঞাত করা হয়েছে।
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোড সেফটির জন্য এটা খুবই ভয়ংকর এবং এই প্রাকটিসটা আছে। এটা বন্ধ করার জন্য আমরা ডিসিদের আরও তৎপর হতে বলেছি এবং আমাদের যারা আছেন বিশেষ করে, রেলওয়েতে যারা আছেন। রেলওয়ে পুলিশ, গার্ড রেলওয়েতে যারা আছেন নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আরও তৎপর করছি।
ষষ্ঠ অধিবেশন : পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
ষষ্ঠ অধিবেশনে পানি সম্পদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। খাল-নদী পুনঃখনন, নদীভাঙন রোধ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, হাওর অঞ্চলে বিশেষ পরিকল্পনা এবং বজ্রপাত প্রতিরোধে শেল্টার নির্মাণের বিষয় গুরুত্ব পায়।
পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এ বিষয়ে আমরা ডিসিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছি।
তিনি আরও বলেন, খাল হচ্ছে জনগণের সম্পত্তি। খাল যেদিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সেটা বড় করতে যাওয়ার সময় যদি কোনো দখলদার পড়ে, তাকে সরে যেতে হবে। কেউ ইচ্ছে করলে আবার এসে খাল দখল করতে পারবে না। তারপরেও এমন কিছু ঘটলে ডিসিরা আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বজ্রপাত সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে এটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ বছরও হচ্ছে। আমরা এখানে কৃষকরা যাতে ওই সময়ে, বিশেষ করে যারা ধান কাটার অবস্থায় থাকেন, তাদের আমরা শেল্টার বানাবো আগামী বছর। এটা আমরা আজকে জেলা প্রশাসকদের বলছি, ওনারা অ্যাসেসমেন্ট করবেন।
তিনি আরও বলেন, হাওর এবং উত্তর অঞ্চলে এটা ব্যাপকভাবে হয়। আমরা সেখানে শেল্টার বানাবো এবং সেখানে আমরা টাওয়ার করে দেব যাতে বজ্রপাতের নিরোধ হয় এবং তারা ওই সময় আশ্রয় নিতে পারে।
সপ্তম অধিবেশন : ধর্ম, শ্রম ও প্রবাসী কর্মসংস্থানে জোর
দ্বিতীয় দিনের শেষ (সপ্তম) অধিবেশনে ধর্ম বিষয়ক, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আলোচনায় স্থানীয় পর্যায়ে সরকারিভাবে কবরস্থান স্থাপন, মডেল মসজিদের পরিচালন ব্যয়, গীর্জাভিত্তিক শিশু শিক্ষা কার্যক্রম এবং ওয়াকফ সম্পত্তির ডাটাবেজ তৈরির বিষয় গুরুত্ব পায়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান খাতে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের কমপ্লায়েন্সের আওতায় আনা, পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম এবং শ্রমঘন এলাকায় নারী শ্রমিকদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিতের বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।
অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ খাতে প্রতিটি জেলায় অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস চালু, অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশ যাত্রা বন্ধ এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া টিটিসি কার্যক্রম জোরদার ও উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়।
অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, কোনো সরকারের নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনাররা। গত ২ মাসে সরকারের ঘোষিত ম্যানিফেস্টো প্রতিটি সেক্টরে কার্যকর করা শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ তরুণ। তাদের প্রাধান্য দিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে কীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসের মাধ্যমে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুনাগরিকের গুণাবলি অর্জন করে।
ধর্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, দেশে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ অর্থ-সম্পত্তি আছে। লাখ লাখ একর জমি। এগুলো সাংঘাতিক দুরবস্থার মধ্যে আছে। এটা জেলা প্রশাসকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। কিন্তু এই জেলা পর্যায়ে তারাই এগুলোর রক্ষক। আইন প্রয়োগ করে উদ্ধারের দায়িত্বও তাদের।
তিনি আরও বলেন, আজকের সম্মেলনে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার একটি ডাটাবেজ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। আমরা এই বিষয়গুলো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি।

