বসন্তের আকাশ ভেঙে নামছে ‘আষাঢ়ে’ বৃষ্টি, প্রকৃতি কেন হঠাৎ এত বিরূপ?

Slider কৃষি, পরিবেশ ও প্রকৃতি


ষড়ঋতুর বাংলাদেশে ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন বসন্ত কাল। কিন্তু প্রকৃতির আচরণ দেখে মনে হবে এখন অনেকটা বর্ষা কাল। কয়েক দিন ধরে প্রায় প্রতিদিনই ঘন মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ আর ঝমঝমিয়ে নামছে বৃষ্টি। চৈত্র মাসে স্বাভাবিক যে বৃষ্টিপাত অল্পস্বল্প হয়ে থাকে, এবারের এ বৃষ্টিপাতের ধরন তার চেয়ে ভিন্ন। প্রায় প্রতিদিন টানা কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণ আর অতিরিক্ত শিলাবৃষ্টি সাধারণ মানুষকে বেশ অবাক করছে। কথা উঠেছে, তাহলে কি প্রকৃতি তার রূপ বদলাচ্ছে?

আবহাওয়াবিদ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃতির এই ধীর কিংবা হঠাৎ পরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সতর্কবার্তা। সাধারণত চৈত্রের শেষে বা বৈশাখে কালবৈশাখীর দেখা মিললেও, এবার ফাল্গুনের শুরু থেকেই বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টি ও অতিরিক্ত শিলাবৃষ্টি দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা অ্যাকু ওয়েদার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের (সি৩এস) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০২৬ সালে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে এক অস্বাভাবিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। নাসার স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প তৈরি করছে, যা স্থলভাগের শীতল বাতাসের সংস্পর্শে এসে শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি করছে। এই মেঘের উচ্চতা এবার অনেক ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে, যা তীব্র শিলাবৃষ্টির প্রধান কারণ।
বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্প এবং ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা শুষ্ক বাতাসের সংমিশ্রণে বায়ুমণ্ডলে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতার কারণে মেঘগুলো অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছে এবং প্রবল বেগে শিলাবৃষ্টি ঘটাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান

অন্যদিকে শিলাবৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, যখন ভূপৃষ্ঠের তপ্ত বাতাস দ্রুত ওপরের দিকে উঠে যায়, তখন তা মেঘের অত্যন্ত শীতল স্তরে পৌঁছায়। সেখানে জলকণাগুলো জমে বরফে পরিণত হয়। বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার কারণে এই বরফখণ্ডগুলো মেঘের ভেতরে বারবার ওপর-নিচ করতে থাকে এবং স্তরে স্তরে বরফ জমে আকারে বড় হতে থাকে। যখন এই বরফখণ্ডের ওজন বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী চাপের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখনই তা শিলা হিসেবে মাটিতে আছড়ে পড়ে। গাণিতিক ভাষায় এই অস্থিরতাকে বায়ুমণ্ডলে কনভেক্টিভ অ্যাভেইলেবল পটেনশিয়াল এনার্জি (কেপ) দ্বারা পরিমাপ করা হয়। এবার এই কেপের মান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামনে আরও বড় ধরনের বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালটি একটি ‘সুপার লা-নিনা’ বছর হতে যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই শীতল অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুকে সময়ের আগেই সক্রিয় করে তুলছে। এর ফলে চৈত্র মাসেই ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে।

গত ১৮ মার্চ আসরের নামাজের পর থেকে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় প্রচণ্ড বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। এই আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তনে মাঠের ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় পাতার সবজিগুলো শিলাবৃষ্টির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ

ডব্লিউএমওর মতে, এবার এপ্রিল ও মে মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর অর্থ হলো, এবার বর্ষা আসার আগেই দেশজুড়ে আগাম বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও হাওর এলাকায় পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কাও রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাধারণত চৈত্র মাসে আমরা শুষ্ক আবহাওয়ার প্রত্যাশা করি, কিন্তু এবারের চিত্রটা ভিন্ন। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্প এবং ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা শুষ্ক বাতাসের সংমিশ্রণে বায়ুমণ্ডলে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতার কারণে মেঘগুলো অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছে এবং প্রবল বেগে শিলাবৃষ্টি ঘটাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঋতুচক্রের এই যে আগাম বদল, এটি প্রকৃতির এক সতর্কবার্তা। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই মেঘ-বৃষ্টির খেলা এবং আকস্মিক বজ্রঝড় অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

এই আবহাওয়াবিদ আরও জানান, চলমান এই বৃষ্টির ধারা আগামী ২৪ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ২১ মার্চের পর থেকে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হলেও একে এখনই পুরোপুরি স্বস্তির খবর বলা যাচ্ছে না। কারণ, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের আধিক্য থাকায় পরবর্তী সময়ে আবার থেমে থেমে কালবৈশাখী স্টাইলে ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দুপুরের পর বা বিকেলের দিকে আকস্মিক বজ্রঝড় ও শিলাবৃষ্টির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে কৃষিবিদদের মতে, এই অকাল বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টি দেশের কৃষি অর্থনীতির ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে। চৈত্র মাস হলো বোরো ধানের থোড় আসার সময়। এই মুহূর্তে শিলাবৃষ্টি মানেই ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। এছাড়া আম ও লিচুর মুকুল এই ভারী বৃষ্টিতে ঝরে পড়ছে, যা ফলন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর উপপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ জানান, গত ১৮ মার্চ আসরের নামাজের পর থেকে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় প্রচণ্ড বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। এই আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তনে মাঠের ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় পাতার সবজিগুলো শিলাবৃষ্টির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; পাতা ছিঁড়ে যাওয়ায় এসব সবজির উৎপাদন ব্যাহত হবে।

এদিকে, মৌসুমি ফল আমের উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে অসময়ের বৃষ্টি ও শিলা। ড. আব্দুল মজিদ জানান, বাগানে এখন আমের আকার অনেকটা মটর দানার মতো হয়েছে। এই সংবেদনশীল সময়ে শিলাবৃষ্টির কারণে কিছু আম ঝরে যাওয়ায় ফলনে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বোরো ধানের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। ধান গাছ এখনো ছোট থাকায় বৃষ্টির পানি খুব একটা ক্ষতি করবে না, বরং উপকার হওয়ারই কথা। তবে নিচু জমিতে কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হলে সেক্ষেত্রে সামান্য ক্ষতি হতেও পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে আশ্বস্ত করে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত শিলাবৃষ্টিতে বড় ধরনের বা ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। ফসলের যেটুকু ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সেই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান অব্যাহত রেখেছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *