ঢাকা: রাজনীতিতে ত্যাগ একটি পুঁজি। রক্ত, ইজ্জত, লাশ, যৌবন, সুখ ও শান্তি এসবই ত্যাগের উপসর্গ। য়ুগে যুগে কর্মীদের এই ধরণের ত্যাগের বিনিময়ে নেতারা ক্ষমতা পেয়ে আসছেন। আবার কখনো নেতারাও ত্যাগের মধ্যে পড়ে গেছেন। তবে নেতাদের ত্যাগ গুটিকয়েক আর কর্মীদের ত্যাগ শত শত থেকে লাখো লাখো। ইতিহাস বলছে, কর্মীরা শুধু বিসর্জনই দিয়ে যায়, ভোগ করতে পারে না। কর্মীদের ত্যাগ হল নেতাদের সুখ। কর্মীদের ত্যাগের বিনিময়ে নেতারা যখন বিলাসী হয়ে যায় তখন কর্মীরা উচ্ছিষ্ট হয় এটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।
ইতিহাস বলছে, ৫৫ বছরের বাংলাদেশে এখনো রাজনীতি বা বাংলাদেশের ইতিহাস গড়ে উঠেনি। কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা এই ধুঁয়াশা রয়েই যায়। রাজনীতিতে উত্থান ও পতন থাকবেই। জোয়ার ভাটার বাংলাদেশে রাজনীতিবিদরা দেশ পরিচালনা করবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে সময়ের সাথে সাথে রাজনীতির ধরণ ও প্রকৃতি পাল্টে গেছে। একটা সময় ছিল যখন বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করত কিন্তু হাতকড়া বা কোমড়ে রশি বাঁধত না। এখন চিত্র পুরোটাই উল্টো। রাজনীতিবিদদের এমনভাবে পুলিশ ধরে নেয় যেন এরা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। এখন রাজনীতিবিদদের ধরে নেয়, জেলে মারা যায়, গুম হয়ে যায় আরো কত কি। আগে এমনটি ছিল না।
সময়ের পরিক্রমা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষনে দেখা যায়, রাজনীতির এই ধরণ তেমন আগে পাল্টেনি। যেদিন থেকে মাঠ পর্যায়ের একজন কর্মী রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে এমপি ও মন্ত্রী হওয়া শুরু করেছেন, সেদিন থেকে রাজনীতির চিত্র পাল্টে গেছে। ত্যাগের বিনিময়ে নয়, টাকা ও সন্ত্রাসের ভয়বহতার যোগ্যতায় নেতা বনে যাওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে রাজনীতি লাটে উঠেছে। ৮০ এর দশকে নেতাদের জায়গা জমি বিক্রি করে রাজনীতি করতে দেখেছি আর এখন সম্পদহীন কর্মী রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে রাজনীতিতে বাজিমত করছে, এমনটিই দেখছি। জাতীয় চার নেতাকে জেলে বন্দি করে বলা হয়েছিল, মুশতাকের মন্ত্রী সভায় যোগ দিতে। তারা নৈতিক কারণে যোগ না দেয়ায় তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অথচ ওই চার নেতাদের কারো কারো সন্তান রাজনীতির সাথে প্রতারণা করে এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন এমনও ঘটেছে। আবার এক দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে বিভিন্ন দলে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নেয়ার রাজনীতি ব্যাপকভাবে চলমান। বর্তমানে যারা কাঁচা টাকার মালিক তারাই নেতা হওয়ার যোগ্য। এই লোভনীয় নীতি, রীতিতে পরিণত হওয়ার কারণে আজ রাজনীতি অন্য গ্রহে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র ধারণ করেছে।
একাধারে প্রায় ১৬ বছর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় ছিল। এই বিরাট সময়ে অনেক ছাপোষা কর্মী বড় নেতা এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন। যারা রাজপথে ত্যাগ স্বীকার করে আওয়ামীলীগ করেছেন, সেসকল কর্মীরা বড় লোক হতে পারেননি। যারা বড় লোক হয়েছেন তারা দেশে ও বিদেশে বসে বসে এখনো দলীয় নির্দেশ দিচ্ছেন আর ক্ষুদার্ত কর্মীরা সে নির্দেশ মেনে অবশিষ্ঠ ত্যাগ বিসর্জন দিচ্ছেন।
একই অবস্থা বিএনপিতেও। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বিএনপির যেসকল কর্মীরা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অনেকে মারাও গেছেন তাদের পরিবারের কেউ খোঁজ নিচ্ছেন না। ত্যাগী কর্মীদের বেশীরভাগই এখনো বিরোধী দলের মত জীবন যাপন করছেন। বিএনপির সেসকল নেতারা আওয়ামীলীগের সাথে মিশে টাকা পয়সা ও ধন দৌলত উপার্জন করে নিরাপদে ছিলেন তাদের অনেকেই এখন বিএনপির বড় নেতা। আওয়ামীলীগের মঞ্চে বক্তব্য দেয়া অনেক নেতা এখন বিএনপির প্রথম সারিতে। এই যে অবমূল্যায়ন, তার নমুনা দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর প্রথম আসন্ন ঈদে বিএনপির ত্যাগী কর্মীদের হৃদয়বিদারক ফেসবুক পোস্ট তার প্রমান।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি এমপি ও মন্ত্রীদের সাথেও সুবিধাভোগীদের অসংখ্য ছবি দেখা যায়। যারা আগেও সুবিধাজনক স্থানে ছিলেন, এখনো তারা সুবিধাজনক স্থানেই আছেন। রাজনীতির এই মুনাফেকীদের দল অনেক বড়। এই দলের চাপে ত্যাগী কর্মীরা আজ অসহায়। গেলো ১২ ফেব্রুয়ারী সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির অনেক এমপি বা বড় বড় লোভনীয় পদে থাকা নেতাদের ডান ও বামে প্রথম সারিতে পাওয়া যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের গডফাদার, মাদকের গডফাদার সহ অশান্তি সৃষ্টি করা গডফাদারদের। মিডিয়ায় তাদের ছবিও ছাপা হচ্ছে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রকাশ হচ্ছে না কারণ কোন মিডিয়া এসব বলার সাহস কোন দিন অর্জন করতে পারেনি যা রাষ্ট্রও দেয়নি। বিএনপি নেতাদের সাথে সুবিধাভোগীদের ছবি, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বুকে আঘাত করলেও তারা প্রকাশ করতে পারছেন না। আর বিএনপির নেতারাও সুবিধাভোগীদের নিকট থেকে অধিক সুবিধা পাওয়ায় ত্যাগীদের দূরে সরিয়ে রাখছেন। ফলে ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা কোন দিনও ভালো দিন দেখেনি। দীর্ঘ ১৮ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির ত্যাগী কর্মীদের হতাশাই তার প্রমান। তাই আসছে ঈদে বিএনপির ত্যাগী কর্মীরা কতটুকু হাসিখুশিতে ঈদ করতে পারবেন তা ইতোমধ্যে অনুমেয় হয়ে গেছে। মানে হলো, ত্যাগী কর্মীদের হাসিমাখা ঈদ কখনো আসবে বলে মনে হয় না।
পরিশেষে বলা উচিত, আওয়ামীলীগ ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন না করে সবিধাবাদীদের মূল্যায়ন করে যে ভুল করেছে, এখন দু:সময়ে সেই নিছক অনুশোচনা করেও লাভ পাচ্ছে না। ঠিক বিএনপি দীর্ঘ ১৮ বছর পর ক্ষমতায় এসে আওয়ামীলীগের মত ভুলে ডুবে যাচ্ছে দিন দিন। রাজনীতিতে খারাপ দিন আসবেই আর সেদিন হয়ত বিএনপিও আজকের আওয়ামীলীগের মত নিস্ফল অনুশোচনা করবে যা অর্থহীন হবে।
লেখক
রিপন আনসারী
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
তাং ১৮ মার্চ ২০১৬

