ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে দুই শতাধিক আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এর মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দলটি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন, দলটি আগেই এ ঘোষণা দিয়েছে। তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচন করে উভয় আসনেই জয়ী হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে চতুর্থবারের মতো দেশ শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে দলটি। এর আগে বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার সরকার গঠন করেছিল।
গেজেট জারি ও সংসদ সদস্যদের শপথ
নিয়ম অনুযায়ী, এখন নির্বাচন কমিশন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট জারি করা হবে। এরপর সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন এবং এর মাধ্যমেই সংসদ গঠিত হবে। পরবর্তী ধাপে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোট সংসদ নেতা নির্বাচন করবে এবং তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তখন রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাবেন।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো দল বা জোট কমপক্ষে ১৫১টি আসন পেলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়। সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধানকেই রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের আহ্বান জানান। সেই হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই সরকার গঠন করবেন।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের প্রধানকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানানো হবে এবং রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠিত হবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
সংবিধান যা বলে
বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া ৫৫ ও ৫৬ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
৫৫ অনুচ্ছেদ : প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকবে। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়ে এই মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে বা তার কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হবে এবং মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকবে।
৫৬ অনুচ্ছেদ : রাষ্ট্রপতি সেই সদস্যকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন, যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে প্রতীয়মান হবেন। মন্ত্রিসভার সদস্যদের অন্তত নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে হতে হবে এবং অনধিক এক-দশমাংশ সদস্য (টেকনোক্র্যাট) সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মনোনীত করা যাবে।
ফলাফলের গেজেট নোটিফিকেশনের পর যত দ্রুত সম্ভব সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করবে
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল
নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ
নতুন মন্ত্রিসভার দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বঙ্গভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভাকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। রাষ্ট্রপতি প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে এবং পরে পর্যায়ক্রমে মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের শপথ পড়াবেন। শপথ গ্রহণের মাধ্যমেই নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের প্রধানকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানানো হবে এবং রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠিত হবে।
আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতিতে অটল। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা রাজপথে বিএনপির সঙ্গে ছিল, তাদের নিয়েই ইনশাআল্লাহ আমরা সরকার গঠন করবো
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
কবে গঠিত হবে নতুন সরকার?
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৫ অথবা ১৬ ফেব্রুয়ারি নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ হবে। পরবর্তী দু-দিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার শপথের মধ্যমে নতুন সরকার গঠন করা হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ফলাফলের গেজেট নোটিফিকেশনের পর যত দ্রুত সম্ভব সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করবে।
সেক্ষেত্রে ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই, অর্থাৎ রমজানের আগেই নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় সরকার গঠন করবে বিএনপি
নির্বাচনে জয়লাভ করলে বিএনপি একা সরকার গঠন করবে না বলে আগেই জানিয়েছিল। রাজপথে দীর্ঘ সময় যারা যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তাদের নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতিতে অটল। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা রাজপথে বিএনপির সঙ্গে ছিল, তাদের নিয়েই ইনশাআল্লাহ আমরা সরকার গঠন করবো।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ৩১ দফা অনুযায়ী যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শরিক ছিল, তাদের নিয়েই ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই জাতীয় সরকার গঠিত হবে। এটি সংসদে থাকা সবাইকে নিয়ে সর্বদলীয় সরকার নয় বরং ঐকমত্যের ভিত্তিতে আন্দোলনের সঙ্গীদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবো।

