
নির্বাচন হয়ে গেছে, ফলাফল চলে এসেছে। কারা সরকার গঠন করবে কারা বিরোধী দলে বসবে তাও এখন স্পষ্ট। এখন অপেক্ষা কেবল নব যাত্রার। দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের পর একটি গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনার প্রতীক্ষা করছে দেশের সব মানুষ।
সব যাত্রার মতোই এই অভিযাত্রার ক্ষেত্রেও সেই কথাটা গুরুত্বপূর্ণ—প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপই আসলে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কেননা প্রথম পদক্ষেপেই ইঙ্গিতটা মিলে যায় আপনি কোনোদিকে রওনা হলেন, কী গতিতে যেতে চাইছেন, কোন বাহনে চড়বেন? অন্যভাবে বললে, আমার গন্তব্য, গন্তব্যে পৌঁছতে পারার সম্ভাবনা এইসব কিছুরই ইঙ্গিত যাত্রার শুরুতেই পুরোটা দৃশ্যমান না হলেও তা যে অনুমেয় সেকথা আমরা সবাই জানি।
প্রথম দিকের পদক্ষেপগুলোয় যদি কোনো বিভ্রান্তি থাকে তাহলে কি নিতাইগঞ্জে পৌঁছানো সম্ভব? না। একদম অসম্ভব হয়তো সবসময় হয় না, কিন্তু একটু কঠিন তো নিশ্চয়ই হয়। কতটা কঠিন হয় অথবা একদম অসম্ভব হয়ে যায় কিনা তা নির্ভর করে বিভ্রান্তির মাত্রার ওপর। এইজন্য সূচনাতেই লক্ষ, উদ্দেশ্য, গন্তব্য ইত্যাদি স্থির করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আর এইবারের নির্বাচনে লক্ষ স্থির করাটা আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেননা এইবারের নির্বাচনটা ঠিক এর আগের অন্য সময়ের নির্বাচনের সাথে সর্বাংশে মেলে না। এইবার আমরা নতুন কিছু সূচনা করতে যাচ্ছি।
অনেকেই বলেন যে, নতুন বাংলাদেশ বা নতুন স্বাধীনতা এইসব নিশ্চয়ই পুরোপুরি ঠিক নয়, একদম নতুন রাষ্ট্র বা নতুন কৌশল সে রকম কিছু হয়তো নয় তথাপি একটা ইন্টারেগনাম বা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের পর গণতন্ত্রের পথে নবযাত্রার সূচনা যে আমরা করতে যাচ্ছি সেকথা কেউই অস্বীকার করবেন না। হুবহু একরকম না হলেও এরকম ঘটনা অতীতে আমাদের দেশে আগেও ঘটেছে।
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে একানব্বই সালে নবযাত্রা শুরু হয়েছিল। এক এগারোর পর ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আরেকটা নবযাত্রার সূচনা হয়েছিল। সেই দুইটা যাত্রার কোনোটাতেই যে আমরা প্রত্যাশিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারিনি সেকথা বলাতো এখন বাহুল্য ছাড়া আর কিছু নয়।
গন্তব্যেই যদি পৌঁছতে পারতাম তাহলে তো আর চব্বিশে এসে কেঁচে গণ্ডূষ করার প্রয়োজন পড়তো না। দোষারোপ আমরা একে অপরকে করতে পারি—কার ভুলে আমরা বারবার একই চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকি। কিন্তু সত্য কথাটা হচ্ছে যে, ভুল আমরা সবাই মিলেই করেছি কোনো না কোনোভাবে।
এজন্য অতীত দেখতে হয়, নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখতে হয়। অতীত যদি ঠিকমতো না দেখি আর সেখান থেকে যদি শিক্ষাটা না নেই, তাহলে তো ওইটাই হবে—পুনর্মূষিক ভব। পুনর্মূষিক ভব গল্পটা সবাই জানেন, তথাপি আরেকবার বলি।
অনেক যুগ আগে বিহার ও নেপালের মাঝখানে ঘন বনভূমি ছিল, তখন সেখানে অনেক মুনি ঋষি বিরাজ করতেন। সেইখানে মহাসিদ্ধিপ্রাপ্ত এক মুনি একবার অসহায় বিপন্ন ইঁদুরকে উদ্ধার করে এনে ঘরে রাখলেন। মুনির দেওয়া দুধ-খাবার খেয়ে ইঁদুর কিছুদিনের মধ্যেই বেশ তরতাজা হয়ে উঠল, ঘরের এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়।
মাঝে মাঝে আশেপাশে বিড়াল দেখলে ইঁদুরটা দৌড়ে এসে মুনির ধ্যানস্থ গায়ে উঠে পড়ে। মুনি ভাবলেন, আহা, বেচারা এত ভিত সন্ত্রস্ত থাকে, আমার গায়ে উঠে পড়ে ধ্যান ভঙ্গ করে দেয়, ওকে বরং বিড়ালই বানিয়ে দেই। যেই কথা সেই কাজ, বর দিয়ে মুনি ইঁদুরকে বিড়াল বানিয়ে দিলেন।
কিছুদিন ঠিকঠাক চলছিল, বিড়ালটাও দুধ-খাবার খেয়ে বেশ নাদুস-নুদুস হয়ে উঠল। একদিন সেই বিড়াল দৌড়ে এসে মুনির গায়ের ওপর উঠে পড়ে। মুনি ধ্যান ভেঙে যায়। মুনি বলে, ‘কী হয়েছে হে মার্জার বৎস্য?’ বিড়াল বলে কিনা দরজার বাইরে একটা সারমেয়, আমি ভয় পেয়েছি।
মুনিবর বিড়ালকে এবার বর দিয়ে কুকুর বানিয়ে দিলেন, যাহ্, এবার তো আর ভয়ের কোনো কারণ নেই, এখন আর আমাকে বিরক্ত করবি না। একদিন যায় দুইদিন যায়, কুকুর মুনিকে আর বিরক্ত করে না, মুনিবর খুশি।
একদিন মুনিরের কুটির থেকে কাছে কোথাও বাঘের গর্জন শোনা যায়। জঙ্গলে তো বাঘ থাকবেই, মাঝে মাঝে একটু গর্জন সেটাও ঠিক আছে। মুশকিল হয়েছে কুকুরকে নিয়ে, সে বেচারা তো বাঘের ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মুনিবরের কুটিরের পরিচ্ছন্ন মেঝে নষ্ট করে দিয়েছে।
এইবার মুনি কুকুরটাকে বর দিয়ে বাঘ বানিয়ে দিলেন। ভাবলেন যাক, বাঘ তো বাঘই, সে তো আর কাউকে ভয় পাবে না। তিনদিন পর বাঘ এসে বলে কিনা, মুনিবর, আমি আপনাকে খাবো। মুনি যত না ভয় পেয়েছেন তার চেয়ে বেশি বিরক্ত হয়েছেন, এটা কেমন কথা বাপু, আমি তোমাকে বাঘ বানিয়েছি আর তুমি চাইছো আমাকে খেয়ে ফেলতে! মুনি আবার মন্ত্র পড়ে বললেন, পুনর্মূষিক ভব। ব্যস। মুহূর্তের মধ্যে বাঘ আবার হয়ে গেছে সেই ইঁদুর ছানা।
গল্পটা ইনিয়ে বিনিয়ে কেন বললাম। আপনারা ইলেকশনে জিতেছেন, এমপি হয়েছেন, একজন প্রধানমন্ত্রী হবেন, অনেকে মন্ত্রী হবেন, স্পিকার হবেন কত কী। অনেক ক্ষমতা হবে আপনাদের। আকৃতিতে ছোট বটে, কিন্তু যে রাষ্ট্রটির পরিচালনা আপনারা করবেন এর জনসংখ্যা কিন্তু নেহায়েত কম নয়।
এই জনসংখ্যা অর্থাৎ সাধারণ জনগণই আপনাদের এমপি বানিয়েছে, যে কথাটি আপনারা ভুলে জান, এরাই চাইলে আবার আপনাকে ইঁদুর ছানা বানিয়ে দিতে পারে। পুনর্মূষিক ভব গল্পটা না বলে ইতিহাস থেকেও উদাহরণ দিতে পারতাম, একদম সাম্প্রতিক উদাহরণ তো আছেই—আওয়ামী লীগ, তার আগেরও বেশ কিছু উদাহরণ আছে যেগুলো আপনারা সবাই জানেন।
সেইসাথে এটা নিশ্চয়ই জানেন যে উন্নয়ন দিয়ে মানুষের মন পুরোটা জয় করা যায় না, মানুষ কথা বলতে চায় আর তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন দেখতে চায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আওয়ামী লীগের আমলে আমরা আইয়ুব খানের উদাহরণ দিয়ে বলতাম কথাটা, অনেক উন্নয়ন করেছিলেন তিনি।
আমাদের ইতিহাসে যতবারই কেউ ক্ষমতায় গিয়ে নানা কায়দাকানুন করেছে মানুষের মত প্রকাশের পথকে বিঘ্নিত করতে, ততবারই গণতান্ত্রিক ধারা বিঘ্নিত হয়েছে, ইন্টেরিম ধরনের ব্যবস্থা হয়েছে আর আমরা প্রতিবারই কেঁচে গণ্ডূষ করতে চেয়েছি।
এখন তো আওয়ামী লীগের উদাহরণ একদম চোখের সামনে—ওরা নদী ফুঁড়ে সড়ক বানিয়েছে, সেতু বানিয়েছে প্রমত্তা পদ্মার ওপর, শূন্যের ওপর মসৃণ সড়ক করেছে, আসমানে রকেট ছুড়েছে কত কী! মানুষ খুশী হয়েছে, কিন্তু মানুষের মন আওয়ামী লীগ বিষিয়েছে স্বাধীনতা হরণ করেছে বলে।
এটা মনে রাখবেন। যে মানুষ আপনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে সেই মানুষকে বিরক্ত করবেন না। মানুষকে ওদের কথা বলতে দিতে হয়। নানা কথা বলবে মানুষ, সবকথা আপনার সহ্য হবে না, কিছু কথা গায়ে এসে বিঁধবে কাটার মতো। কেবল একটা কথা মনে রাখবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না অপরের ক্ষতির কারণ হয়, মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে হয় না। মানুষ যত মুক্তকণ্ঠে কথা বলবে তত বেশি জাতীয় ঐক্য তৈরি হবে।
বিশ্বের ইতিহাস ও বর্তমান ঘেঁটে দেখেন, যে রাষ্ট্রে মানুষ যত স্বাধীনতা উপভোগ করে সেই রাষ্ট্রে মৌলিক কিছু প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য তত দৃঢ় হয়। কণ্ঠ রুদ্ধ করে কখনো জাতীয় ঐক্য তৈরি করা যায় না। আর জাতীয় ঐক্য না থাকলে যে স্থিতিশীল গণতন্ত্র হয় না সে কথা রাজনীতিবিদদের চেয়ে কে বেশি জানে?
আপনারা স্মরণ করে দেখুন, আমাদের ইতিহাসে যতবারই কেউ ক্ষমতায় গিয়ে নানা কায়দাকানুন করেছে মানুষের মত প্রকাশের পথকে বিঘ্নিত করতে, ততবারই গণতান্ত্রিক ধারা বিঘ্নিত হয়েছে, ইন্টেরিম ধরনের ব্যবস্থা হয়েছে আর আমরা প্রতিবারই কেঁচে গণ্ডূষ করতে চেয়েছি।
খুব বেশি কিছু আপনাদের করতে হবে না, বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বা সুইজারল্যান্ড না বানালেই চলবে, কেবল সবাইকে যার যার কথাটা বলতে দেবেন, যার যার রাজনীতিটা করতে দেবেন, বৈষয়িক ব্যবস্থাপনাটা একটু দক্ষ হাতে চালাবেন আর—ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে সেইটার জন্যে প্রস্তুত থাকবেন, তাহলেই হবে।
যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন আপনাদের সাফল্য কামনা করি। যারা সংখ্যাগুরু হয়েছে আপনাদের সাথে যারা সংখ্যালঘু হয়ে এসেছেন, আপনাদের সাফল্য একটু অধিক কামনা করি। কেননা আমাদের অধিকার রক্ষার জন্যে সংখ্যাগুরুর চেয়ে সংখ্যালঘু দলগুলোর ভূমিকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
