একজন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে গাজীপুরের ৫টি আসন

Slider সম্পাদকীয়


ঢাকা: রাত পোহালেই ভোট। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার একটি নতুন সরকার। এটা নতুন সরকারের প্রথম ও শেষ ভোট। এই ভোটকে ঘিরে শংকায় ভরা আবেগ যেমন আছে তেমনি সামনের দিনগুলোতে ভালো থাকার আশাও অনেক। বাংলাদেশেরর ৩০০ আসনের মধ্যে গাজীপুরে ৫টি আসন। এই পাঁচটি আসনে ৩৫ জন প্রার্থী। ইতোমধ্যে প্রার্থীদের প্রচারণা শেষ হয়েছে। এখন ভোটের প্রস্তুতি চলছে।

পর্যবেক্ষন বলছে, শিল্পরাজধানী গাজীপুর। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ভোটের আসন গাজীপুরে। এখানে ভাসমান ভোটার বেশী। পুরুষ থেকে নারী ভোটারও বেশী। রাজনৈতিক ইতিহাসে গাজীপুর আওয়ামীলেীগের দখলে ছিল। এখন আওয়ামীলীগের অনুপুস্থিতিতে বিএনপিকেই ভালো করা উচিত। বেশীর ভাগ মানুষ মনে করে বিএনপি ভালো করবে। আওয়ামীলীগ না থাকলে বিএনপি আর বিএনপি না থাকলে আওয়ামীলীগই ভালো করার কথা। বিগত তিনটি নির্বাচনের মধ্যে দুটি নির্বাচনে বিএনপি ছিল না। একটি নির্বাচনে আওয়ামীলীগের অধীন বিএনপি ছিল। নিকটঅতীতের শেষ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ আওয়ামীলীগের সাথেই প্রতিদ্বন্ধিতা করেছে। ২০১৪, ও ২০২৪ সালের মতই এখন ভোটের আমেজ। নিকট অতীতের বিতর্কিত দুটি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ যেমন শতভাগ খুশি ছিল না, ঠিক এবারও একই রকম। তবে সরকার চাচ্ছে সকলকে খুশি করতে যা কষ্টকর।

গাজীপুর-১( কালিয়াকৈর ও গাজীপুর সিটির আংশিক) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মুজিবুর রহমানের নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি জামায়াতে ইসলামী বা ১১ দলের প্রাথী শাহ আলম বক্সী। এই আসনে ভালো ভোট হলে ফলও ভালো হবে। আওয়ামীলীগের সময় সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের স্নেহধন্য থাকায় মুজিবুর রহমান অনায়াসে আওয়ামীলীগের ভোট পেতে পারেন। বিএনপিতে তার দলের প্রতিপক্ষরা যে পরিমান ভোট এলোমেলো করতে পারবেন, তাতে আওয়ামীলীগের দেয়া ভোটকে ক্রস করতে পারবে না হয়েতো। সুতরাং মুজিবুর রহমান ভালো অবস্থানে আছেন যদি নীরব ভোট বিপ্লবে পরাজিত না হয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশী ভোটের আসন গাজীপুর-২(সদর, টঙ্গী: এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী এম মঞ্জুরুল করিম রনির অবস্থা গাজীপুরের সকল আসন থেকে ভালো। তার বাবা প্রয়াত মন্ত্রী ও মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নানের অন্ধভোট রনির জন্য থাকছেই। তবে অন্ধ ভোটগুলো রনির চারপাশে দেখা না গেলেও তারা নিজেদের মত করে কাজ করছেন মান্নানের ছেলের জন্য। বিএনপির নিজ দলের প্রতিপক্ষ রনির হয়ে নির্বাচনী মাঠে ভোলো প্রচারকের ভুমিকা রাখলেও তাদের গোপনে কি ভুমিকা তা ভোট বলে দিবে। এই আসনে আওয়ামীলীগের বড় ভোট ব্যাংক যে দিকে যাবে জয় সেদিকেই মুখিয়ে আছে বলে সাধারণ ভোটাররা বলছেন। ইতোমধ্যে রনি অনেক আওয়ামীলীগের নেতা বিএনপিতে যোগদান করিয়ে আওয়ামীলীগের দূর্গে হানা দিয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে রনির চারপাশে বিভিন্ন আবরণে নিজ দল ও আওয়ামীলীগের শক্তিশালী এজেন্ট সক্রিয়ভাবে কাজ করায় যে কোন সময় ভোটের কৃত্রিম স্রোত তৈরী করে তাদের আসল উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পারেন বলে আশংকাও আছে। এর প্রাথমিক চেষ্টা গতকাল একটি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে করা হয়েছে। যেখানে রনির নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি কে! তা ঠিক করতে সময় নিচ্ছেন ভোটাররা, সেখানে রনির নীতিনির্ধারকেরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীকে রনির প্রতিদ্বন্ধি হিসেবে নির্বাচন করে বিচক্ষনতার পরিচয় দিতে পারেননি। রাজনৈতিক সমীকরণে অপরিপক্কতার পরিচয় দেয়ায় ধানের শীষের প্রতিদ্বন্ধি এখন ১১ দলীয় জোট প্র্রার্থী এডভোকেট আবু নাসের খান। স্বাভাবিকভাবে ভোট হলে রনির অবস্থা অনেক ভালো। আর পরিচালনায় লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্র সফল হলে অস্বাভাবিক ভোটও হতে পারে এমন ধারণাও আছে। তাই রনি তার বাবার বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে যত বেশী সচেতন থাকবেন বিজয় তত বেশী নিশ্চিত হবে।

গাজীপুর-৩(শ্রীপুর ও সদর উপজেলার আংশিক) : এই আসনে শ্রীপুর উপজেলার মানুষ এই প্রথম ধানের শীষের প্রার্থী পেলেন। এই আসনে ধানের শীষের ডাক্তার রফিকুল ইসলাম বাচ্চু ভালো অবস্থানে আছেন। ইতোমধ্যে অনেক আওয়ামীলীগের নেতা বিএনপিতে যোগদান করেছেন। সরল সমীকরণে আওয়ামীলীগের ভোট বাচ্চু পেলে যথেষ্ট ভালো করবেন। আর বিএনপিতে কেন্দাল যদি মন থেকে শেষ হয়ে থাকে তবে বাচ্চু ভোটের রেকর্ড করবেন। আর যদি কোন্দল আলোতে পরিস্কার ও অন্ধকারে আগের চরিত্রে থেকে যায় তবে সমস্যা হতে পারে। এই আসনে বা্চচুর প্রতিদ্বন্ধি কে তা ধুম্রজালে থাকলেও বাচ্চু পন্থী কতিপয় অতিনেতা ইতোমধ্যে ঘোড়ার প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলনকে বাঁধা দিয়ে ধানের শীষের নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। মিলন আওয়ামীলীগের সময় উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামীলীগের আদরের লোক হওয়ায় একটি আশংকা থেকেই যায়। বিএনপির অভিমানী ভোট ও আওয়ামীলীগের তৃনমূলের ভোট নীরবে পেয়ে ফেললে ঘোড়া ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে মাঠ বলছে, ঘোড়ার সেই অবস্থা নেই। তবে ধানের শীষের বেশী বুদ্ধিমান নেতারা কৌশলে বাচ্চুকে হারিয়ে দিতে চাইলে সফলও হতে পারেন। তবে ধানের শীষের প্রার্থীর সচেতনতা ও সজাগ থাকার শক্তি যত বেশী হবে বিজয় তত নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া এই আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী গণজোয়ার তৈরী করার চেষ্টা করছেন। সারাদেশে তাদের কাংখিত স্রোত তৈরী হলে তিনিও বিজয়ী হতে পারেন এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

গাজীপুর-৪(কাপাসিয়া): এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী প্রয়াতমন্ত্রী আ স ম হান্নান শাহর ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নানের অবস্থা ভালো হবে এটাই স্বাভাবিক। দলীয় কোন্দল নিরসনে ও আওয়ামীলীগের ভোট টানতে যতটুকু সফল হবেন জয় তত নিশ্চিত হবে। এই আসনে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী সালাউদ্দিন আইয়ুবী একজন শক্তিশালী প্রার্থী। ইতোমধ্যে তিনি সাড়া ফেলেছেন। মানুষ নানা কথা বলছে। হাড্ডাহাড্ডি লাড়াইয়ের সুর বাজছে। এই লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দেয়ার পিছনে আইয়ুবীর অধিক পরিশ্রম আর আওয়ামীলীগের সাধারণ সমর্থকদের মতামত কাজ করছে। ৫ আগষ্টের পর রিয়াজুল হান্নান যদি ভোটারদের কষ্ট দিয়ে না থাকেন তবে তিনি নিশ্চিত বিজয়ী হবেন। আর কষ্টে দিয়ে থাকলে কষ্টের মাত্রা ও ক্ষমার উপর নির্ভর করবে রিয়জুল হান্নানের বিজয়।

গাজীপুর-৫( কালিগঞ্জ): এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক মিলনের অবস্থা ভালো। ৫ আগষ্টের পর সৃষ্ট ইতিহাস যত হালকা হবে মিলন তত ভালো করবেন। এখানে দলের ভেতরে কোন্দল তেমন না থাকলেও মিলনের বিকল্প নেতা হতে না পারার ক্ষোভ আছে। অবশ্য মিলন ইতোমধ্যে আওয়ামীলীগ সহ বিরোধী দল ও মতের প্রতি নিজের উদার মনোভাবের যে পরিচয় দিয়েছেন তা যদি গৃহীত হয়ে থাকে তবে নিশ্চিত ভালো করবেন। আর দলীয় ক্ষোভ নিরসন আর আওয়ামীলীগের ইশারা যদি পজিটিভ না হয় তবে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী খায়রুল হাসান লটারী দেখাতে পারেন।

রিপন আনসারী
গণমাধ্যম কর্মী, মানবাধিকার কর্মী ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *