টঙ্গীতে ৫ হাজারের বেশী চিহিৃত অপরাধী এখন নির্বাচনের মাঠে

Slider বিচিত্র


ছবি: সম্প্রতি ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত এক ব্যাক্তি খুনের প্রতিবাদে মানববন্ধন

গাজীপুর: ভৌগোলিক অবস্থানে গাজীপুর ও রাজধানী ঢাকার মাঝে শিল্পনগরী টঙ্গী অবস্থিত। নতুন হওয়া গাজীপুর-৬(টঙ্গী-গাছা-পূবাইল) নির্ববাচনী আসন আদালত থেকে বাতিলের পর সাবেক আসন গাজীপুর-এ(সদর-টঙ্গী) ফিরে গেছে টঙ্গী। ফলে সদরের সঙ্গে টঙ্গী মিলে প্রায় ৮ লক্ষাধিক ভোটের আসন হয়েছে এটি। এতে অপরাধ জোন টঙ্গীর দুই লাখ ভোটারের ১৯ বস্তির ৫ হাজারের বেশী চিহিৃত অপরাধী নির্বাচনে প্রভাব ফেলা শুরু করেছে। চলমান রাজনৈতিক সভা সমাবেশে ও মিছিলে তাদের দাপট বেড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টঙ্গী শিল্প এলাকায় ১৯টি বস্তি রয়েছে। মাদক ছিনতাই চুরি ও ডাকাতদের আতুরঘর হিসেবে এসব বস্তি চিরচেনা। বস্তিগুলোতে অস্ত্র ও মাদক নিয়মিত ব্যবসা হিসেবে সুপরিচিত। বস্তিগুলোর প্রধান আয়ের মাধ্যম হলো মাদক ছিনতাই ও অস্ত্র ব্যবসা। রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের পাইকারী মাদকের হাট টঙ্গী। কক্সবাজার থেকে সরাসরি মাদকের চালান আসে টঙ্গীতে। আর টঙ্গীর মাদক ব্যবসায়ীরা বিমানে করে কক্সবাজার যাতায়াত করেন নিয়মিত। টঙ্গীর মাদক বস্তি হিসেবে খ্যাত ১৯ বস্তির দেখভাল করার দায়িত্বে যারা, তারা সব সময়ই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকেন। এসব বস্তির প্রায় শতাধিক পাইকারী মাদক কারবারী বীরের বেশে রাজনৈতিক আবরণে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে যারা পাইকারী মাদক কারবারী ছিলেন, এখনো তারাই আছেন তবে পাল্টেছে পৃষ্টপোষকের ঠিকানা। আগে যারা মাদকের পৃষ্টপোষক ছিলেন এখন ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে অন্যরা দায়িত্বে আছেন। মাদকের পাইকারী বিক্রেতার পরিবর্তন হয়নি তবে পরিবর্তন হয়েছে শুধু আশ্রয়দাতাদের।
বিবিএসের এক জরিপে বাংলাদেশে ১৪ হাজার বস্তিতে ২২ লাখ ভাসমান মানুষ বাস করে। সেখানে টঙ্গীর ১৯ বস্তিতে বাস করা প্রায় তিন লাখ লোকের কথা বলা নেই। এই তিন লাখ ভাসমান লোকের মধ্যে চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠায় লক্ষাধিক লোক নানাভাবে জড়িয়ে গেছে। আর বস্তিবাসীদের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তৈরি হয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি ক্যাডার। ছুরি, চাপাতি, চেইন, কোবা, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে তাদের হাতে। তারাই এখন টঙ্গীর অপরাধজগত চষে বেড়াচ্ছেন।

সরেজমিন জানা যায়, ১৯ বস্তির মধ্যে টঙ্গী বাজারের মাজার বস্তি, টঙ্গী ব্যাংকের মাঠ, কেরানীরটেক বস্তি, এরশাদনগর (বাস্তহারা) বস্তি, বনমালা রেলগেট, মিলগেট নামা বাজার বস্তি, মরকুন, পাগাড় ঝিনু মার্কেট, মধুমিতা রেললাইন, আরিচপুর শেরেবাংলা রোড, মধুমিতা তিনতলা মসজিদ মোড়, বউ বাজার রেললাইন ও টঙ্গী নদীবন্দর বর্তমানে মাদক কেনাবেচায় শীর্ষে। আরো আছে আউচপাড়া, দত্তপাডা, গাজীপুরা সাতাইশ রোড, হিমারদীঘি মেঘনা রোড ও চেরাগআলী। এই পয়েন্টগুলোতে দিনে-রাতে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, প্যাথিড্রিন, গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে। গাজীপুরের শিল্প এলাকা টঙ্গীতে ১৯টি বস্তির ভোটার সংখ্যা দুই লাখের বেশি।
অনুসন্ধান বলছে, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ এসব বস্তিতে বসবাস করায় টাকার লোভ দেখিয়ে অতি সহজেই এদের দিয়ে যেকোনো কাজ করানো যায়। আবার টাকার জন্য নিজেরাও খারাপ কাজ করেন তারা। অপরাধ করতে গিয়ে তারা নিজেরা করেন বা অন্যেরা করায়, মূলত তারা অপরাধী হয়ে উঠছে এতে সন্দেহ নেই। এরা যেসব অপরাধ করে তার মধ্যে চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, মাদক, চাঁদা তোলা, ধর্ষণ, নিরীহ শ্রণির মানুষকে ভয় দেখিয়ে নির্যাতন-নিপীড়ন করে টাকা আদায় অন্যতম। আবার এদের দিয়ে প্রভাবশালীরা যেসব অপরাধ করায় সেসব অপরাধের মধ্যে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, প্রভাব প্রতিষ্ঠা, দখল, জবরদখল, বড় অঙ্কের চাঁদার জন্য ভয় দেখানো, জমি দখল, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ অন্যতম। এদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে, কাঁচা টাকার উৎস, ঝুট ব্যবসা দখল, বেদখল আছে। বস্তির বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে সহজলভ্যভাবে অপরাধে ব্যবহার করায় এরা হয়ে উঠছে ভয়ংকর পরগাছা অপরাধী। বস্তিভিত্তিক চেইন তৈরি করে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তৈরি হয়ে গেছে পাঁচ হাজারেরও বেশি দুর্ধর্ষ ক্যাডার। দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রের পাশাপাশি এদের অনেকের কাছে আছে আগ্নেয়াস্ত্রও। যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তখন তারা তাদের হয়ে যায়। বিশেষ করে জনপ্রতিনিধি দ্বারাই এরা বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়। আর জনপ্রতিনিধিরা যে দলেরই হোক, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থাকার জন্য ওই বস্তিবাসীদের অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে ক্ষমতাসীনরা।

টঙ্গী পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বস্তিগুলো অপরাধ প্রবণ। তবে নিরাপত্তার অভাবে যে কোন সময় অভিযান করা যায় না। এসব বস্তিতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ আহতের ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশকে আহত করে উল্টো পুলিশের বিরুদ্ধে মামলাও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া দিনে বা রাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ইচ্ছে করলেই অভিযান করতে পারে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে অভিযানে যাওয়ার ফলে অপরাধীরা সহজেই খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। তবুও প্রায় দেড় বছরে এক হাজারের মত অপরাধী গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবুও কমছে না অপরাধ।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপ-মহাপরির্দক(অতিরিক্ত ডিআইজি) মো: জাহিদ হোসাইন ভুইয়া (পিপিএম বার) বলেন, ‘অপরাধ দমনে পুলিশ সব সময় কাজ করে আসছে। আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে আমরা সব সময় সজাগ ও সচেতন আছি। ফ্লাইওভারে ছিনতাই বন্ধে সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সড়ক ও জনপদ নিরাপদ রাখতে সমন্বিতভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রন ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চি করতে কাজ করছে পুলিশ। আমরা অতিদ্রুত ক্র্যাকডাউন অভিযান শুরু করছি।

এবিষয়ে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও গাজীপুর-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেছেন, বিএনপি সব সময় অপরাধের বিরুদ্ধে। নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রন ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন কাজ করবে বলে আশা করি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে টঙ্গীকে অপরাধমুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *