সাংসদ হত্যা; আ.লীগ নেতাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

Slider জাতীয়

1f8a27087cc96a0fd37570d25d9bbe06-1

ঢাকা;  দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গি হামলার লক্ষ্য হওয়ার আতঙ্কে ছিলেন। নিহত সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটন জঙ্গিদের নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

আওয়ামী লীগের দুজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক দিনেই দুটি বড় ঘটনা। প্রথমে খুলনায় স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি হয়েছে। তিনি বেঁচে গেলেও প্রাণ গেছে পথচারী নারীর। পরে রাতে গাইবান্ধায় সরকারদলীয় সাংসদ নিজ ঘরে খুন হলেন। উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে এ দুটি ঘটনাকে এক মনে করছেন না এই দুই নেতা। তাঁরা বলেন, খুলনায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা অন্য কারণে গুলি হতে পারে। ব্যক্তিগত বা স্থানীয় কোনো কারণে দলের কেউ লক্ষ্যবস্তু হলে জাতীয়ভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু থাকে না। কিন্তু গাইবান্ধার সাংসদকে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে বড় কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে।

দলের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গাইবান্ধা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে জঙ্গি ও জামায়াতের আধিপত্য থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসব এলাকা ঘিরে নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এতে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচিও অব্যাহত রাখতে চায় সরকার। এর ফলে দলের স্থানীয় নেতারা অসহায় বোধ করবেন না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে স্থানীয়ভাবে কী কী কর্মসূচি নেওয়া যায়, সেই পরিকল্পনা করছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। তবে সাংসদ হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে না।

এদিকে আগামী বুধবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ওই দিন সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। ওই বৈঠকে সাংসদ হত্যার বিষয়টি আলোচনায় আসবে।

গতকাল ধানমন্ডির কার্যালয়ে সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক শেষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগের এমপি খুন একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে এটি সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ঠান্ডা মাথায় কাপুরুষোচিত হত্যা।’ তিনি এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, সাংসদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত উগ্রবাদী অপশক্তিকে তাদের কৃতকর্মের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। আওয়ামী লীগের খুলনা মহানগর নেতা জেড এ মাহমুদের ওপর গুলিবর্ষণের সময় পথচারী শিপ্রা কুণ্ডুর নিহত হওয়ার ঘটনারও তীব্র নিন্দা জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘উৎসবমুখর পরিবেশে যখন ইংরেজি নববর্ষ বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল দেশ, সেই মুহূর্তে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বর্ষবরণের সেই আনন্দধারার ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ করেছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো মূল্যে আমরা তাদের প্রতিরোধ করব, পরাজিত করব ইনশা আল্লাহ।’

গাইবান্ধার ঘটনা নিয়ে গতকাল সরকারদলীয় ছয়জন সাংসদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দুজন সাংসদ বলেন, গাইবান্ধার সাংসদ মনজুরুল ইসলাম প্রায়ই বলতেন, তাঁর জীবনের ওপর হুমকি আছে। দুবার হত্যারও চেষ্টা হয়েছে। গাইবান্ধা এলাকাটি জামায়াত-অধ্যুষিত। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর পুলিশকে হত্যা করা হয় সেখানে। সে সময় ওই সাংসদ সাহস দেখান এবং প্রতিকূল পরিবেশে শক্ত অবস্থান নেন। আরেকজন সাংসদ বলেন, ঘরে ঢুকে সরকারদলীয় সাংসদকে হত্যা করার ঘটনা বিরল। তাঁকে হত্যা করার জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

উত্তরবঙ্গের একজন সাংসদ বলেন, সুন্দরগঞ্জে শিশুকে গুলি করার পর মনজুরুল ইসলামের ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনেও সাংসদের প্রভাব কমে যায়। ফলে হুমকিতে থাকা সাংসদকে যতটা নিরাপত্তা দেওয়া দরকার ছিল, প্রশাসন তা করেনি।

একাধিক সাংসদ বলেন, উত্তরবঙ্গে জঙ্গি তৎপরতা বেশি। গাইবান্ধার কাছে যমুনার চরে জঙ্গিদের আখড়ার কথা শোনা যায়। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে দলের ভেতরেও টুকটাক ঝামেলা আছে। তবে তা এমন ঘটনার জন্ম দিতে পারে—তা বিশ্বাস করা যায় না। ফলে আসলে কী ঘটেছে, সেটা জানার জন্য এখন পুলিশের ওপর ভরসা রাখা ছাড়া উপায় নেই।

সাংসদেরা আরও বলেন, দেশে জঙ্গি হামলা বেড়ে যাওয়ার পর সাংসদদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। সংসদের হাউস কমিটির বৈঠকে ন্যাম ভবন ও সংসদ ভবনে নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয় এবং তা বাস্তবায়নও করা হয়। কিন্তু সংসদের বাইরে নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকছেই। কারণ, সাংসদের বাড়ির দরজা তো আর সব সময় বন্ধ করে রাখা যায় না। চেনা-অচেনা বহু মানুষই আসে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও অন্যতম মুখপাত্র মাহবুব উল আলম হানিফ  বলেন, জামায়াতের তাণ্ডব প্রতিরোধে সাংসদ মনজুরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে জামায়াতের ক্ষোভ আছে। প্রাথমিকভাবে তাদেরই সন্দেহ করা হচ্ছে। এখন এই ঘটনা জামায়াতের কেন্দ্রীয় কোনো পরিকল্পনার অংশ নাকি স্থানীয়ভাবে হয়েছে অথবা তাদের সঙ্গে অন্য কোনো শক্তি জড়িত কি না, তা জানা যাবে তদন্তের পর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আওয়ামী লীগের আস্থা আছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *