পানিতে ভাসছে ৫৩ কোটি টাকা

Slider সারাদেশ

3284e03675b864d353165ff77ea0216b-ship

ঢাকা; ২৪৭ দশমিক ৭০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪১ ফুট প্রস্থের বিশাল জাহাজে যাত্রী ধারণক্ষমতা ৭৫০। কিন্তু যাত্রী উঠেছে মাত্র ৫০ জন। তা-ও প্রায় সব যাত্রী অর্ধেক পথে নেমে যাবে। বাকি পথটা প্রায় ফাঁকাই যাবে। এই ৫০ জন যাত্রীর জন্য জাহাজে চালকসহ ক্রু ৩৫ জন। আর নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন পুলিশের ৪ জন সদস্য।

ঢাকার সদরঘাট থেকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জগামী জাহাজ এমভি বাঙালি বরাবরই এ রকম যাত্রীখরায় ভোগে। একই রুটে চলাচলকারী একই আকারের আরেকটি জাহাজ এমভি মধুমতিরও একই দশা। ৫৩ কোটি টাকায় কেনা এ দুটি জাহাজ চালিয়ে গত আড়াই বছরে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। এবার ৭২ কোটি টাকা দিয়ে একই রুটে নতুন আরও দুটি জাহাজ তৈরি করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হাওয়ার জন্য নয়, নৌপথের যাত্রীদের সেবা দেওয়ার জন্যই নতুন জাহাজ নামানো হচ্ছে।
২০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা
২১ নভেম্বর ঢাকার সদরঘাট থেকে এমভি বাঙালিতে উঠে দেখা গেল, ৭৫০ জন যাত্রী ধারণক্ষমতার পুরো জাহাজ প্রায় ফাঁকা। ৫০ জন যাত্রীর পেছনে চালকসহ ৩৫ কর্মী আর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের ৪ জন সদস্য। সব মিলিয়ে ৯০ জন আরোহী নিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঢাকা থেকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে যাত্রা করে এমভি বাঙালি।
জাহাজের ভিআইপি ফ্যামিলি স্যুট, প্রথম শ্রেণির ডাবল ও সিঙ্গেল কেবিন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির (চেয়ার) আসনের অধিকাংশই খালি। দ্বিতীয় তলায় ১৮টি ডাবল কেবিনের পাঁচটিতে যাত্রী আছে। চারটি সিঙ্গেল কেবিনের দুটি ভাড়া হয়েছে। চারটি ভিআইপি স্যুটের তিনটি ভাড়া হয়নি।
তৃতীয় তলার ১৬টি ডাবল কেবিনের একটিও ভাড়া হয়নি। ১৮টি সেমি ডাবল কেবিনের একটিতে যাত্রী পাওয়া যায়।
চার ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১০টায় যাত্রাবিরতি চাঁদপুরে। আধা ঘণ্টার যাত্রাবিরতিতে সেখান থেকে আরও ৭০ জন সাধারণ যাত্রী ওঠে। অধিকাংশ যাত্রীর গন্তব্য বরিশাল। সকাল ছয়টায় বরিশাল থেকে জাহাজ যখন যাত্রা করে মোরেলগঞ্জের উদ্দেশে, তখন যাত্রী মোটে ১০ জন। এদের নিয়ে বেলা দুইটায় এটি যখন মোরেলগঞ্জের ঘাটে পৌঁছায়, ততক্ষণে ২০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
এমভি বাঙালির তৃতীয় শ্রেণির (ডেক) যাত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বাগেরহাটে তাঁর বাড়ি। চাকরি করেন চট্টগ্রামে। ঢাকা হয়ে গ্রামে যেতে সময় বেশি চলে যায় তাঁর। তাই চাঁদপুর থেকে জাহাজে উঠেছেন। তাতে সময় কিছুটা কম লাগে।
যাত্রী কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে যেতে বাঙালি ও মধুমতি সময় নেয় ২০-২১ ঘণ্টা। একই সময়ে বাসে করে তিনবার আসা-যাওয়া যায়।
বেশ কয়েকজন যাত্রীর মতে, পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রীসংখ্যা আরও কমে যাবে।
গত ৩০ নভেম্বর বুধবার থেকে এমভি মধুমতি ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন শুরু করেছে। এমভি বাঙালিও শিগগিরই খুলনা পর্যন্ত চলাচল করবে।
লোকসানের পাহাড়
এমভি বাঙালি ও এমভি মধুমতির ক্রয়মূল্য ও নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব জানতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হয় এ বছরের জুন মাসে। তিন মাস পর সেপ্টেম্বর মাসে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ দুটি জাহাজের ক্রয়মূল্য ও মেরামতের হিসাব লিখিতভাবে প্রদান করে। মৌখিকভাবে সংস্থাটির হিসাবরক্ষণ শাখা থেকে বাঙালি ও মধুমতির জ্বালানি তেলের খরচের হিসাব জানানো হয়। আরেকটি সূত্র থেকে পাওয়া যায় স্টাফদের বেতন-ভাতার খরচ।
হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ যাত্রী পরিবহন শুরুর সময় থেকে ২০১৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ২৮ মাসে এমভি বাঙালির জ্বালানি তেল কিনতে হয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৪০৯ টাকার। এ সময় টিকিট বিক্রি করে জাহাজটির আয় হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার ৮২৩ টাকা। লোকসান হয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই মাসে এমভি মধুমতি যাত্রী বহন শুরু করে। সে সময় থেকে ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৫ মাসে জাহাজটির জন্য তেল কেনা হয়েছে ৪ কোটি ৫১ লাখ ২৯ হাজার ২০০ টাকা। আর টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৫ হাজার ৭০০ টাকা। সব মিলিয়ে মধুমতির পেছনে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।
এর সঙ্গে দুটি জাহাজের ৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনের পেছনে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হিসাবে নিলে গত আড়াই বছরে এ দুটি জাহাজ চালিয়ে মোট লোকসান হয়েছে কমপক্ষে ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
তবে যাত্রী না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান  বলেন, ‘প্রাইভেট লঞ্চগুলোয় চাকচিক্য বেশি। তা ছাড়া আমাদের জাহাজগুলো ঘাটের এক কোনায় থাকে। তাই যাত্রীরা ঘাটে এসে সরাসরি প্রাইভেট লঞ্চে উঠে যায়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *