ভুল মানুষের সন্ধ্যালোক : জাহিদ সোহাগ

সাহিত্য ও সাংস্কৃতি

2016_01_17_18_18_21_cEwa2xq4K8Bu6mo7j1q5o1HAkyxHK7_original

 

 

 

আমাকেও দিতে পারো হাত ভরে ফুল
বাতাসের দিকে যার উড়ে গেছে রেণু;
দেখেছি ক্ষেতের আলে- শিষে ভরে দুধ
আর আমাকে দেখাও পাথরের হিম!

কাছাকাছি কেউ নেই- নদীও ফিরেছে
লোহিতে- মজ্জায়- ঘ্রাণে- ভুলে কিছু স্মৃতি;
যদি দুই তীরে শুনি ভাঙনের শব্দ
বলো আমাকে কে ভাঙে- অকারণে একা।

সারাদিন কেটে যায় সারসের ধ্যানে।
পড়ে থাকে দীর্ঘ সন্ধ্যা আর যত্রতত্র
খুলে যায় একে একে ত্রিকোণ দুয়ার;
যেন দেশলাই জ্বলে ওঠে ঠিক রাতে।

বাইরে আলোর ভীড়, টর্চের যন্ত্রণা।
আপাত তাদের দেহ সাপিণী-চঞ্চল;
তবু ঠোঁট রাখি না জঙ্ঘায়-শুধু দৃশ্যের
ভেতরে প্রবেশ্য নয়- ফিরেছি একাকী।

শুনেছি এদের স্তনে ঈগলের ডানা
আর শিশ্ন ঘিরে খেলা করে স্বাদু মৎস্য।
যেহেতু তাদের হাতে পৃথিবী উদ্বেল
ঘুমের আগেই চোখ বুজে ফেলে ঘুমে।

এদের ঠিকানা নেই। নক্ষত্র থেকেই
যেনবা লাফিয়ে পড়ে। আবার উড়াল
দেয় মোরগের গলা অরব থাকতে
এই আলোকিত দেহ আমারও অজ্ঞাত।

 

দীর্ঘ পুরুষের থাকে জুয়ার আগ্রহ
ধূলিতে ত্রিপল ফেলে খেলে তিন তাস
কোমরবন্দে খঞ্জর মাথাগুলো যেন
ধোঁয়ার কুণ্ডুলি হয়ে উঠে যায় শূন্যে।

মোরগের ডাক শুনে বহু ভোরে আমি
এই জনতা জেনেছি। মড়কে উজার
হলে নগরীর দেহ- নেই, কিছু নেই;
শুধুই ছড়িয়ে আছে রঙের আলাপ।

আমায় বাসেনি তারা ছুঁয়ে কাছাকাছি;
যেনবা কুষ্ঠের রক্ত গড়ায় হৃদয়ে।
তাই দূর থেকে আসে অরূপের ভাষা
আমার প্রকাশে এলে আমি পূর্ণ হই।

শোনো হে ঘোড়ার হ্রেষা, বিশাল দুপুরে,
যেনবা রোদ্রের কাঁচ ফুটন্ত-ফেনিল
বইছে আমার ত্বকে তার ঢেউগুচ্ছ
আমাকে জাগায় বৃক্ষ পাখির সংবেদ।

বলি, আমাকেও দাও জলের পরাগ
একা এই কাশফুলে ডুবে থেকে থেকে
আর স্বমোহনে ছিন্ন আমার পিপাসা
আমাকেও দাও এই জলের পরাগ।

বৃথাই আমার যায়- সব ক্ষয়ে যায়।
অর্কিসের কথা ভেবে দেখি নিজ দেহ
আমার এ দেহখণ্ড হতে পারে ফুল?
তবে নাও সমর্পণ, করো শত কণা!

দ্যাখো, আমি ছিন্ন হয়ে ভাসছি উজানে-
মাস্তুল ওঠেনি শূন্য ফুঁড়ে, দিশাহীন,
আকাশের নীল ঝরে শুধু রোদ্র নিয়ে;
দূরে তারা নৃত্যরত ঢোল ও অগ্নিতে।

দগদগে ক্ষতে শুধু উড়ছে মাছিরা
মদিরার গ্লাস কাঁপে তাদের কারুণ্যে
আর আমি ছোঁয়ালেই বিষের ছুরিকা
বারুদের ক্ষুধা আর ডাহুকের স্বর।

নিজেই এখন নিজ কারাগার মাঝে
রচনা করছি দণ্ড ইচ্ছের পুতুল।
হয়তো বলবে কেউ নিয়তির দাস
আমার বিশ্বাস নেই অলীক স্বরাজে।

ওই আলোকিত যারা পৃথিবীর কাছে
তাদের সোনালি দূর্গে শুধু বাহুবল
সাঁকো তুলে দিয়ে যায় ভ্রষ্টের শতক
কোনো গান নেই আর শুধু কোলাহল।

আর আমি অর্ধমগ্ন চারদিকে থই থই
অবিরাম নষ্টপাক, যেনবা নিজস্ব
চৈত্রের ভেতর আমি একাকী মহিষ
ভুলে গেছি বাথানের শেষ ছায়াটাও।

 

কাস্তের ফলায় দেখি হেসে ওঠে রোদ্র
ধান ক্ষেত নুয়ে আছে অবিরাম ঝড়ে
নিশ্চুপ কাকতাড়ুয়া শূন্যকে হাসায়
তোমার জাহাজ ভেড়ে নীরব জেটিতে।

কোনো যে নিজস্ব বৃত্ত ছুঁয়ে চলে চাকা
পথের ধুলোয় নেই স্বাসকষ্ট তার
যেন শ্রমের জীবন ক্রমাগত বাঁচে
আর আমি অর্থহীন ভেবে তরপাই।

ঘুম ভেঙে গেলে ভাবি তোমার লুণ্ঠিত
শরীর, ফেনার ঢেউ- ঝড়ের মাস্তুল
গড়ে তোলে দক্ষ হাত; আর আমি ছুঁতে
গেলে ভেঙে যায় বাঁধ- উছলায় নদী।

ঝরে গেলো সব অশ্রু একদিন কেঁদে
এখন বসেই থাকি নিরুত্তাপ হয়ে
এপিটাফের ফলক শুধুই অক্ষর
উদ্বোধন শেষে কোনো স্মৃতি নেই বাকি।

বিসর্জনের প্রতিমা তোমাকে বলি না
তুমি খড়কুটো শুধু অর্ধদগ্ধ মুখ
ঘাট-অঘাটায় ভাসো- না, কেউ ছোঁবে না
শুধু কাক এসে বসে। আসে লঘু স্রোতে।

এখন আমার হাত ধূর্তস্তনে ডোবে
যে হাতে একদা তুমি দিয়েছো উল্লাস
উড়ে গেছি নীলিমায়- এখন এখানে
মেঘ ঘুরে মেঘে যাই- জল নেই কোনো।

সকল ঝড়ের শেষে পড়ে থাকে স্মৃতি
যাকে কুড়াতে পারি না- হবে না নির্মাণ
ভাগাড়ের দিকে যায় সমস্ত ঠিকানা
কিন্তু আমি কী-এসব তুলেছি হৃদয়ে।

এখন আমার দিকে উড়ে আসে তীর
নিশ্চপ দাঁড়িয়ে থেকে হয়ে গেছি কাঠ
এভাবেই বহুকাল পার হয়ে এসে
ভেবেছি এ ছাড়া আর লব্ধ কিছু নেই।

সূর্যাস্তের দিকে আমি হেঁটে গেছি কাল।
সবুজের অন্ধকার গলে নেমে পড়ে
সূর্য- নদীর সিথানে; সেখানে আমার
হয় যেনবা কবর। ক্লান্তির আশ্রয়।

দাঁড়াতেই হয় শেষে আয়ুর সম্মুখে
যেখানে শরীর নেই- আছে চিৎকার
গোপন রাখার এক যাদুমন্ত্রবল
সেই গহিনে গোপন রয়ে গেছি আজো।

এখন আমাকে দাও অগ্নির লালসা
কাঁটার মুকুট দিয়ে করে ক্রুশবিদ্ধ
আঁকতে চাইছি আমি আমারি সারল্যে
দীন সময়ের ফাঁদে জীবনের যতি।

 

ভুল বোঝাবুঝি আর হয় না কখনো
ছুরিকা ঝলসে ওঠে, যেনবা শোণিতে
মিলে যায় সমাধান। কত বলি এসো
বন্ধুতায় অভিমানে- তুমি যাও দূর।

আর দ্যাখো যে ঈগল উড়ে গেছে মেঘে
তাকেও চেয়েছি দিতে নিজ বাসস্থান
কিন্তু ওদের পাখায় দূরত্বের প্রেম
তবে তুমি এসো নীড়ে- অসুখের দিনে।

অলস দুপুরে দাও পাখার বাতাস
আমার পাজর যেন অনন্ত অঙ্গার
বরফের কাছে আর নেই শীতলতা
তার চেয়ে মুঠো মুঠে ছাই মেখে নেই।

ও পাড়ায় মাঝিদের স্বর শোনা যায়
তারা ঢেউয়ের নিচে বয়ে আনে ঘুম
আমি সেখানে পেয়েছি আফিমের স্বাদ
এখন কাদের ডেকে চেয়ে নেই স্বপ্ন?

কৃষাণির কাছে ছিলো আরো কিছু ঋণ
তাদের উদোম বুকে ধানশিষ দোলে
ছাগশিশু নাচে যার কাপড় পেচিয়ে
শীতরাতে দিয়েছিলো সে অগ্নির ভাগ।

সন্তানের মতো দুটি জলের কলস
তার উনুনের কাছে আছে কতকাল
সেখানেই জল থাকে আজো আছে ঠিক
আমার কণ্ঠায় দিলে তারে বলি সুধা।

আমার উদ্বেগ তুমি- নক্ষত্রের কাছে
আজ কিছু চাইবো না- তুমি শুধু এসো,
ফিরে এসো, চোখে এঁকে কাজলের পাখি-
বাড়াও দু’হাত শিশুদের খুশি মুখে।

এই কথা শুনে তুমি ক্লান্তির রেখায়
ছোঁয়ালে রুমালে মুখ। আর চেখে নিলে
আইসক্রিমের হিম। আমি বলি, থাক
চলো এসো যাই ঘরে, নিরন্ধ্র কপাটে।

নগর আমাকে ডাকে- যেভাবে বণিতা
গৃহে প্রতিদিন হই প্রথম পুরুষ;
ভুলে বহু ঠোঁট-স্বেদ, অভিজ্ঞতাহীন
হিজলের ঘ্রাণ গুঁজে চোখের পালকে।

আমার ক্লান্তির মানে আমিও জানি না।
ভেঙে যেতে যেতে কোনো মানুষের মুখ
মনে পড়ে না কখনো; শুধু বাতাসের
ভেতর শীতের হিম হাড়ে এসে লাগে।

ফ্রক পরা কোনো মেয়ে- যেনবা সকাল
হতে চেয়েছে শিশির- তার অজ্ঞতায়
ঢুকেছে কাঁচের চূর্ণ; খুব দ্রুততায়
তাকে দেখি একা একা বেচে যায় দেহ।

তাকেও জেনেছি আমি- ঘুমের আবেশে
নেতিয়ে পড়েছে কোলে- হলুদের ক্ষয়ে
যাওয়া দুপুরে একাকী- লিঙ্গলুব্ধ নয়
ফড়িঙের পাখায় সে দিয়েছে উড়াল।

কারো রতির উল্লাসে ভিজে যায় মাঠ
যখন দেখেছি তার অন্য অবসাদ
হেলে পড়া নম্ররোদে যেনবা অশ্রুত
সুরের কাঁপন এসে বিছায় আঁধার।

 

সেও অর্ধদগ্ধ মুখ। জলে ভেসে ভেসে
কলমি হেলেঞ্চা বনে জড়িয়ে পড়েছে,
পাঁকে পাঁকে, কাকনখে! জানি না খবর
হাওয়ারা দোলায় এসে জামরুল বন।

আমার ঘুমুতে ভয়- মরে গেলে যেন
হয়ে না যাই বেশ্যার ক্লান্তিহীন ঠোঁট।
তুমি এসে দেখে ফ্যালো এই মাংসরেখা
ভয়ে ভয়ে তাই আমি নির্ঘুম নিষাদ।

তুমি বাঘিনীর শিশু? কি ভাবো আমাকে?
নির্ভয়ে বসি না কাছে? আমিষের লোভ!
মাছের সন্তান আমি আতুড়ঘরেই
নিভে যেতে পারে জানি আয়ুর দোয়েল।

এটুকু ভরসা আছে- ব্যর্থ হয়ে যাই
প্রতিযোগিতা ছাড়াই- হারাবে কী করে

তার চেয়ে এখানে এসে ছুরির ফলায়
তুলে দেখো হৃৎপিণ্ড মানুষের কিনা।

আমার চামড়া তুলে ডুগডুগি বাঁধো
বাজিয়ে নাচাও দেখি- নাচে কি হৃদয়?
তাহলে কি দেবো আর বাজাতে তোমায়?
এই নাও নিদ্রাঢোল দুঃস্বপ্ন বাজাও।

আমি সেই স্বর- যাকে ভেবেছো নিশ্চুপ
বাতিকগ্রস্ত মাতাল- কোনো খাপে যার
আঁটেনি চৌকোণা হায়, বর্ধিষ্ণু উন্মাদ!
শূন্যতা সাধনা যার- নীলাভ রমন।

সহজেই খুলে যায় চোখের মার্বেল
যেনবা শিশুরা শূন্য থেকে নেমে এলে
শৈশব অঞ্জলি পাতে যেনবা ব্লেডের
চিকন রেখায় সেও কাটেনি সাঁতার।

কেনবা ভাবায় আজ- জানতে চেয়েছি
নিরর্থক গ্লাসে ঢেলে নিজেরই শোণিত
জীবনের সাথে নেই আমারও কী সখ্য?
কান্নার পাশেই দেখি উজ্জ্বল মোরগ!

 

যারা আমাকে দেখেছে ভীড়ে নতজানু
বহুকালের কালচে দুখে শব্দহীন
হ্যাঁ তারাই জানে তবে উপেক্ষার ভাষা
অশ্রু আমার দুধের মতই সাদাটে।

কাঁধে লাঙল না ফেলে যে সন্ধ্যায় আমি
আলপথ ভেঙে আসি দ্বিধার বাজারে
সেখানে আমিও হায় অমায়িক চাষা
এক পুরুষ আগের ক্ষত রুখে দেই।

কিন্তু আমিও জানি না, বৃষ্টির বিপুল
শীত যে-নারীর পিঠে বুনে দেয় কাঁটা
লাউয়ের ডগা দেয় বিভাজিত জিভ
আর আমি তারে ডাকি ডাহুকের রক্তে।

সে দু’পাশে ধানক্ষেত ফেলে একা একা
আলপথ হয়ে আছে; তার শাড়ী টেনে
নেয় বাতাসের লালা- যে কিনা মাটির
পাত্রের মতই হাসে দেহের লাজুকে।

এই অবোধ শরীর- বাকহীন কণ্ঠে
লুণ্ঠনে উঠেছে জেগে যার মাতৃভূমি;
যেখানে আমিও ঝুলে থাকি বাদুড়ের
দেহে- যেখানে উড্ডীন নিরাপদ লিঙ্গ!

এ কথা বলে না কেউ। ভাঁড়ের রঙিন
পোশাকে বিলায় হাসি যেনবা কোথাও
ডোবেনি রক্তাক্ত জলে সহজ হাঁসেরা
তাই আমাকেই ডাকে গুপ্ত খুনে, হায়!

সমবেত জনতার সামনে আমাকে
আমাকেই দগ্ধ করো- আমি আগুন্তক;
ভুল সময়ের তাপে উগড়ে উঠেছি
লিস্ফল পিতা-মাতার পাশব নিঃশ্বাসে।

এখন ফেরাও তবে- কোনো মৃত্যু আর
আমাকে নেবে না তার নম্র করতলে
এখন ফেরাও তবে কোনো অগ্নি আর
পোড়ে না আমাকে তার নীলাভ লেহনে।

আমি ভুল মানুষের সন্ধ্যালোক থেকে
আলোর বিরাট গর্তে দিশেহারা, একা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *