স্বাধীন, নিরাপদ বাহনের খোঁজে নারীরা

Slider নারী ও শিশু

7eb3da3aefd8cf287d768a19494b623b-5ae8e606658e1

ঢাকা: শ্যামলীর রিংরোডে একটি চেম্বারে বসে রোগী দেখেন সামিয়া ইসলাম। থাকেন মিরপুরের আনসার ক্যাম্প এলাকায়। গণপরিবহনে চলাচল তাঁর কাছে নিরাপদ মনে হয় না। রোজ রাতে রোগী দেখা শেষে বাসায় যাওয়ার জন্য রিকশা কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তাই স্কুটি চালানো শিখছেন তিনি।

সামিয়া বলেন, ‘আগে মহাখালীর কর্মক্ষেত্র থেকে মিরপুরে বাসায় যাতায়াত করতাম। ভিড় ঠেলে বাসে ওঠা প্রায় অসম্ভব। আর গণপরিবহন নিরাপদও নয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমি স্বাধীন নারী, আমার চলার পথও আমিই নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। স্কুটি চালানো তুলনামূলক নিরাপদ।’

সামিয়ার মতো স্বাধীনভাবে চলাচল করতে চাওয়া নারীদের স্কুটি চালানো শেখাতে ‘যাব বহুদূর’ নামে একটি ড্রাইভিং স্কুল চালু করেছেন আতিকা রোমা। এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে এই কার্যক্রম। একজন নারী প্রশিক্ষকের অধীনে তিনজন পুরুষ সহকারী প্রশিক্ষক এই ড্রাইভিং স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আতিকা দলনেতা এবং প্রধান প্রশিক্ষক। তিনি বলেন, ‘গণপরিবহনে নারীদের হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা দরকার। সেই সঙ্গে নারীদের যাতায়াতের ধরনও বদলানো প্রয়োজন। সেই চিন্তা থেকে স্কুটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র খোলার চিন্তা করি।’

প্রথম ধাপে ৩২ জন নারী স্কুটি চালানো শিখতে নিবন্ধন করেছিলেন। পুরো এপ্রিলজুড়ে ১৬ নারীকে স্কুটি চালানো শিখিয়েছেন আতিকা। নাবিস্কো এলাকায় খোলা জায়গায় এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আতিকা বলেন, প্রথম মাসে এই উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য সফলতায় তিনি বেশ আশাবাদী।

প্রশিক্ষণার্থীদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চিকিৎসক। আছেন গৃহিণী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীও। সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করেছেন নারিন্দার বাসিন্দা ফাহিমা খান। স্কুটি চালানো শিখেছেন তিনিও। ফাহিমা বোরকা পরেন। তবে এই পোশাক তাঁর স্কুটি চালানোর পথে কোনো বাধা নয় বলে মনে করেন তিনি। আবার ধানমন্ডির বাসিন্দা শাশ্বতী বিপ্লবের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে। কেবল নতুন কিছু শেখার আগ্রহ থেকে তিনি স্কুটি চালানো শিখছেন।

আতিকা বলেন, তিনি ২০০৯ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। যাতায়াতের সুবিধার্থে তখন থেকেই স্কুটি চালানো শুরু করেন। আর এখন ‘যাব বহুদূরের’ কার্যক্রমে যুক্ত আছেন পুরোদমে। আতিকা বলেন, তিনি চান নারীরা স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে নগরীতে চলাফেরা করবে। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তিনি স্কুটি চালানো শেখানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁর মতে, স্কুটি নারীদের চলাফেরা তুলনামূলক স্বাধীন ও নিরাপদ করবে।

প্রশিক্ষকেরা সাত দিন ব্যবহারিক ক্লাস নেন। আর এক দিন স্কুটি চালানো নিয়ে খাতা-কলমে ধারণা দেওয়া হয়। এরই সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে লাইসেন্স পেতে করণীয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন তাঁরা। টিভিএস মোটরসাইকেল কোম্পানি প্রশিক্ষণের জন্য স্কুটি মোটরসাইকেল দিয়ে সহযোগিতা করেছে।

আতিকা বলেন, স্কুটি চালানো শেখানোর এই উদ্যোগ আগামী বছরের ৩১ মার্চ অব্যাহত রাখার ইচ্ছে আছে তাঁর। মে মাসে নতুন ব্যাচের কাজ শুরু হবে। আগামী বছরের মধ্যে ৩৬০ জন নারীকে স্কুটি চালানো শেখাতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী। তবে এ কাজের শুরুতে অনেক বাধা-বিপত্তির মুখে পড়েছেন বলে জানান আতিকা। নিরাপদ জায়গা খোঁজা, প্রশিক্ষণার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া, প্রশিক্ষণের জন্য জায়গা প্রস্তুত করার কাজ বেশ কঠিন ছিল।

ব্যাংক কর্মকর্তা শাহনাজ চৈতির সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ও নিজের অফিস করার জন্য স্কুটি চালানো শিখেছেন। এ জন্য পরিবারের মা ও ভাইয়ের স্কুটি চালানো শিখতে সরাসরি তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। ভাই জাহারুল হোসেন প্রথমে নিজের মোটরসাইকেলে শেখাতে চেয়েছিলেন। তবে এটি শাহনাজের জন্য কঠিন হওয়ায় তিনি কোনো নারী প্রশিক্ষকের খোঁজ নিতে বলেন। একসময় আতিকা রোমার এই কর্মসূচির কথা জেনে ভর্তি হয়ে যান।

যাব বহুদূরে স্কুটি চালানো শিখতে চাইলে একটি ফরম পূরণ করে পাঠিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া দুই হাজার টাকা প্রদান করতে হবে। যাঁরা স্কুটি চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে চান, তাঁরা ‘যাব বহুদূরে’র ফেসবুক পেজে যুক্ত হয়ে যোগাযোগ করতে পারবেন। ফরম পাওয়া যাবে এই পেজে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *