আসামের বাংলাভাষীদের ঠেলে দেয়ার শঙ্কা

Slider বাংলার মুখোমুখি

296479_180

 

 

 

 

চীন ও পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশীরা অনুপ্রবেশ করছে বলে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের মন্তব্যকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন তারা। রোহিঙ্গাদের মতো আসামের বাংলাভাষী মুসলমান নাগরিকদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলেদেয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভারতের থাকতে পারে বলে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।

গত মাসে আসাম রাজ্য সরকার ন্যাশনাল সিটিজেন রেজিস্টার নামে দেশটির নাগরিকদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। যেখানে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। যার বেশির ভাগ মুসলমান। জেনারেল রাওয়াত বুধবার দিল্লিতে এক সেমিনারে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই পাকিস্তান উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশীদের অনুপ্রবেশে মদদ দিচ্ছে- আর সে কাজে তাদের সাহায্য করছে চীন। ভারত ও বাংলাদেশের সরকার যখন দাবি করছে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে তখন ভারতের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার বলছে ভারতের সাথে গভীর সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। তখন ভারতের সেনাপ্রধানের এ ধরনের মন্তব্যের ব্যাপারে বাংলাদেশের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। তিনি বলেন, এ বক্তব্যের ভারতকে প্রমাণ দিতে হবে।’

বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) আ ল ম ফজলুর রহমান ভারতের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যকে বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা বলে মনে করেন। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, ‘চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেনার পর থেকে ভারতের সেনাকর্মকর্তারা বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নির্মূল অভিযানে দেশটি মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়েছে। এর মাধ্যমে মুসলিমদের বিতাড়নের একটি পরীক্ষা তারা করেছে। এখন আসাম থেকে মুসলমান বিতাড়নের পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে তিনি মনে করেন এ ধরনের চেষ্টা হবে মারাত্মক ভুল। এ পদক্ষেপ এ অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সশস্ত্র তৎপরতার ঝুঁকি বাড়বে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ভারতের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আসামে যখন নাগরিকত্ব নিয়ে নানা প্রক্রিয়া চলছে তখন এমন বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মমতা ব্যনার্জি বলেছেন, সেখানে কোনো অবৈধ বাংলাদেশী নেই। যদি কেউ পশ্চিম বাংলায় আসতে চায় তাদেরকে স্বাগত জানাবেন। সেখানে ভারতের সেনাপ্রধান ভিন্ন রকম বক্তব্য দিচ্ছেন। যদি আসামের বাংলাভাষী নাগরিকদের পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করবে।’

আসামের জনবিন্যাস পাল্টে দেয়ার জন্য ভারতের বিজেপি সরকার যে মুসলিমবিদ্বেষী উসকানিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন ভারতের সেনাপ্রধান তার বক্তব্যের মাধ্যমে তার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছেন। বিজেপি প্রকাশ্যেই গত কয়েক বছর ধরে বলে আসছে আসাম থেকে ‘অবৈধ’ বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। গত মাসে নাগরিক তালিকা প্রকাশের আগে থেকেই আসামের বাংলাভাষীরা নানাভাবে ধরপাকড়-নিপীড়নের মধ্যে আছে। বেশ কয়েকটি ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে।

আসামের অন্তত ছয়টি স্থানে অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিত করে (গোয়ালপাড়া, কোকড়াঝাড়, শিলচর, দিব্রুগড়, জোড়হাট, তেজপুর) কারাগারের মতো করে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে বলে ভারতের গণমাধ্যমে খবর এসেছে। বাংলাভাষীদের বন্দী করে রাখা হয়েছে সন্দেহজনক মানুষ তথা ‘ডি-ভোটার’ (ডাউটফুল ভোটার) এবং ‘বিদেশী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। আসামের গোয়ালপাড়াতে ২০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় ডিটেনশন সেন্টার। ভারতের প্রদেশগুলোর মধ্যে আসাম প্রধানতম দারিদ্র্যকবলিত অঞ্চল।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আসামের জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ফলে বাংলাদেশ থেকে মানুষ আসামে যাচ্ছে বলে ভারতের অভিযোগ যুক্তিগ্রাহ্য নয় বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আসাম প্রদেশের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে ২৬২ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২০০ কিলোমিটারের বেশি কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত।
গত মাসে আসামের নাগরিকদের নামের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে বেশির ভাগ মুসলমানের নাম বাদ দেয়া হয়।

এর মধ্যে আসামের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) নামে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ও ৯ বছর ধরে লোকসভার সদস্য বদরুদ্দিন আজমলের নামও ছিল না। ভারতের সেনাপ্রধান এই রাজনৈতিক দলটিকেও আক্রমণ করেছেন। কোনো বৈধ রাজনৈতিক দলের সমালোচনা সেনাপ্রধান করতে পারেন কি না তা নিয়ে ভারতের ভেতরে এখন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

জেনারেল রাওয়াত নয়াদিল্লিতে বলেছেন, ‘এআইইউডিএফ বলে সেখানে একটা দল আছে। বিজেপির চেয়েও দ্রুতগতিতে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তিনি আরো বলেন, আমার তো মনে হয় না এখন আর সেখানে জনসংখ্যার ডায়নামিক্সেকোনো পরিবর্তন করা সম্ভব। আসামে যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এই প্রবণতা (মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধি) সেখানে ঘটেই চলেছে।’ সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যের জবাবে এআইইউডিএফ নেতা বদরুদ্দিন আজমল টুইটারে মন্তব্য করেছেন, ‘শকিং! জেনারেল রাওয়াত তো রাজনৈতিক বিবৃতি দিচ্ছেন! গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল যদি বিজেপির চেয়ে বেশি ফুলে ফেঁপে ওঠে, তাতে সেনাপ্রধানের কিসের মাথাব্যথা?

বড় দলগুলোর কুশাসনের জন্যই এআইইউডিএফ বা আম আদমি পার্টর মতো বিকল্প দলগুলোর উত্থান হচ্ছে।’
আসামে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট। এই দলের প্রধান বদরুদ্দিন আজমল আসামের নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পারিবারিকভাবে আসামের বড় ব্যবসায়ী। আগর ব্যবসায়ী আজমল আসামে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সাথে জড়িত। ২০০৫ সালে তিনি এই রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন। জন্মের ছয় মাসের মাথায় এই দল নির্বাচনে (২০০৬) অংশ নিয়ে আসন পায় ১২৬-এর মধ্যে ১০টি; পরের নির্বাচনে পায় ১৮টি এবং সর্বশেষ নির্বাচনে পেয়েছে ১৩টি। এখন ভারতের পার্লামেন্টে তাদের তিনজন এমপি আছেন।

আসামের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাংলাভাষী মুসলমানরা এই দলের সমর্থকদের একটা বড় অংশ। বাংলাভাষী এই মুসলমানরা অতীতে বিভিন্ন দলের সামান্যই মনোযোগ পেতো। কিন্তু বদরুদ্দিন আজমল তাদের পৃথকভাবে সংগঠিত করা শুরু করলে রাজ্যটির ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টাতে শুরু করে।

এরপর আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়। আসাম ভারতের দ্বিতীয় মুসলমান প্রধান রাজ্য হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশীরা আসামে অবৈধভাবে বসবাস করছে এবং তাদের ফেরত পাঠাতে হবে বলে দাবি উঠতে থাকে। এ ধরনের উসকানিমূলক প্রচারণার প্রধান কারণ হচ্ছে আসামের ১২৬টি নির্বাচনী এলাকার ৩৫টিতে বাংলাভাষী মুসলমানরা সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *