
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই আজ শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনায় বসছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তাল পরিস্থিতি অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির এই বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা। তবে আলোচনার প্রাক্কালে আলোচনার শর্ত নিয়ে মতানৈক্য এবং লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে ইরানের প্রতিনিধিদলের পাকিস্তানে পৌঁছানোর ব্যাপারে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হওয়ায় এই বৈঠক কতটা ফলপ্রসূ হবে কিংবা আদৌ হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গতকাল শুক্রবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
রওনা হওয়ার আগে জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আশা করছেন এই আলোচনা ইতিবাচক হবে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি ‘চাতুরির’ আশ্রয় নেয় তবে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে না। জেডি ভ্যান্স আরো জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিনিধিদলটিকে আলোচনার ব্যাপারে ‘সুস্পষ্ট নির্দেশনা’ দিয়েছেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি যুদ্ধবিরতি না মেনে ‘কূটনীতিকে হত্যা’ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি তাতে সায় দিয়ে নিজেদের ‘অর্থনীতি ধ্বংস’ করতে চায়, তবে সেটা ওয়াশিংটনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন ‘বোকামি’ করতে চায় তবে সেটা তাদের সিদ্ধান্ত, কিন্তু ইরান সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়নি। তেহরান থেকে কোনো প্রতিনিধিদল আদৌ ইসলামাবাদ যাচ্ছে কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তবে বৈঠককে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
প্রতিনিধিদলগুলোর জন্য ‘অন-অ্যারাইভাল ভিসা’র সুবিধাও ঘোষণা করেছে পাকিস্তান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য আলোচনা ঘিরে পাকিস্তান প্রস্তুতি নিলেও, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে চায়। তবে লেবাননের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেই আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেবে লেবানন।
বৈঠকে কারা কারা থাকবেন : হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
তাঁর সঙ্গে থাকছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। কিন্তু ইরানের দিক থেকে জট কাটছে না। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইসলামাবাদে যাবেন। কিন্তু পরে বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিনিধিদলই পাকিস্তানে যায়নি।
নির্ধারিত শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ইরানি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে গতকাল চরম বিভ্রান্তি ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গতকাল প্রতিনিধিদলের পৌঁছানোর খবর দিলেও ইরান তা সরাসরি অস্বীকার করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিম ও ফার্স নিউজ গতকাল ওই খবরকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিনিধিদল পাঠানো হবে না এবং আলোচনা আপাতত স্থগিত থাকবে। এর আগে পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত প্রতিনিধিদলের পৌঁছানো নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট দিলেও পরে তা মুছে ফেলায় অনিশ্চয়তা আরো বাড়ে।
ইরান ‘সত্ভাবে’ এগোলে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার হাত বাড়াবে—জেডি ভান্স : পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আসন্ন আলোচনার আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স বলেছেন, ইরান ‘সত্ভাবে’ এগোলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি ‘সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে’। গতকাল এয়ার ফোর্স টু-তে ওঠার আগে ভান্স বলেন, ‘আমরা এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদী।’ তিনি আরো বলেন, ইরান যদি ‘সৎ উদ্দেশ্য’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক সাড়া দেবে। তবে তারা যদি ‘প্রতারণার চেষ্টা করে’, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে সাড়া দেবে না।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি ও জব্দকৃত সম্পদ না ছাড়া পর্যন্ত আলোচনা শুরু হবে না—ইরান : ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি ও তাদের জব্দকৃত সম্পদ না ছাড়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁরা কোনো আলোচনা শুরু করবেন না। গতকাল এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে ইসলামাবাদে পৌঁছানো নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
ইরানের স্পিকার বলেছেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হওয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে দুটি বিষয় এখনো বাস্তবায়ন করা বাকি। প্রথমটি হলো লেবাননে যুদ্ধবিরতি, আর দ্বিতীয়টি হলো আলোচনা শুরু করার আগেই ইরানের আটকে রাখা সম্পদগুলো ছেড়ে দেওয়া। আলোচনা শুরু হওয়ার আগে এই দুটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে।’
লেবাননে হামলা অব্যাহত : লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গতকাল ইসরায়েলি আগ্রাসন অব্যাহত ছিল। নাবাতিয়ে শহরের একটি বড় অংশজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। আলজাজিরা জানিয়েছে, এই হামলায় একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত আটজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া জবা শহরে একটি গাড়ি ধোয়ার কেন্দ্রে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপের বিষয়টি তারা শনাক্ত করেছে। আইডিএফের দাবি, ওই হামলার জবাবে তারা রকেট হামলা চালায়।
হরমুজ প্রণালিতে টোল নেওয়া হবে ইরানি রিয়ালে : গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া জাহাজ ও ট্যাংকার থেকে টোল নেওয়া হবে ইরানি মুদ্রা রিয়ালে। গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন। সংস্থাটি বলেছে, সংসদের প্রস্তাব অনুযায়ী টোল হিসেবে ইরানি রিয়াল নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও এর আগে গতকাল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে বলেছিল, ক্রিপ্টো কারেন্সি বা চীনের মুদ্রা ইউয়ান দিয়ে টোল আদায় করা হবে।
ইরানের হামলায় ‘অকেজো’ যুক্তরাষ্ট্রের বহু উপসাগরীয় ঘাঁটি : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত এক ডজন সামরিক স্থাপনা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে এখন সেগুলোর অস্তিত্ব সুবিধার চেয়ে ঝুঁকিই বেশি তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একদল বিশেষজ্ঞ এমনটাই মত দিয়েছেন।
ঘাঁটিগুলোর অবস্থার বিষয়ে প্রথম তথ্য প্রকাশ করে একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম, যেখানে সেগুলো ‘প্রায় বসবাসের অযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতি ১৪৫ বিলিয়ন ডলার : মাত্র ৪০ দিনের সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক একাধিক সূত্র। এই সময়ের মধ্যে ইরানের ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১৪০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার সমান। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও সেতুতে হামলার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
আরো বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম : যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। গতকাল এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর সময়ও এই মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। গতকাল এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর সময় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬.৭৫ ডলারে পৌঁছায়। এটি আগের তুলনায় প্রায় ০.৮৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুড অয়েলের দামও ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সূত্র : রয়টার্স, আলজাজিরা, বিবিসি, সিএনএন, মিডলইস্ট আই
