তেল আছে, তবু মিলছে না! ২২ জেলায় অবৈধ মজুতের তথ্য

Slider সারাদেশ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো তেল দিতে না পারায় দেশের জ্বালানির মজুতে টান পড়তে শুরু করেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপ, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় কনডেনসেট সংকট এবং বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজি—সব মিলিয়ে চরম জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ করে চলছে এবং এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস ও চলতি এপ্রিলের ২ তারিখ পর্যন্ত ২২ জেলার ৩০ টি স্থানে অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের মজুত করার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত ১৭ মার্চ থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত অবৈধ জ্বালানির মজুতের সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিলো ১৭ টি জেলায়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে পৌঁছেছে ২২ জেলায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ববাজারের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, পাচার এবং সরবরাহকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে।

আরও জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর পাশাপাশি সারাদেশে জ্বালানির অবৈধ মজুদ প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির কথা জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়; অবৈধ মজুতদারদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।

পুলিশ সদরদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (২ মার্চ) পর্যন্ত যে ২২ টি জেলায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো—কক্সবাজার, গাইবান্ধা, শরীয়তপুর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম মহানগর, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, পাবনা, মেহেরপুর, মাদারীপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, নড়াইল, গাজীপুর, ভোলা ও রাজশাহী। এসব জেলার মোট ৩০ টি স্থানে অবৈধ জ্বালানির মজুদের তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৭ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী জ্বালানি খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে পরিচালিত অন্তত ২৯টি অভিযানে প্রায় ৪০ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল ও পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধ বিক্রি, পরিমাপে কারচুপি, লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা ও অবৈধ মজুতের প্রমাণ পাওয়া যায়। মোবাইল আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সঙ্গে জব্দ করা জ্বালানি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও পার্শ্ববর্তী দেশে জ্বালানি পাচার বন্ধ করতে পুলিশের পাশাপাশি অভিযান পরিচালনা করছে র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টাগার্ডের মতো বাহিনীও। এসব অভিযানে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে।

সর্বশেষ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন আগারগাঁও এলাকায় দুইটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত রাখা ২৯৬ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-২)-এর ভ্রাম্যমাণ আদালত। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সংস্থাটির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামসুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে মজুতে কিছুটা টান পড়েছে এটা সত্য। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা কমিয়ে আনা জরুরি।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সার্বিক জ্বালানির পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিষয়ে সরকার এরইমধ্যে কঠোর বার্তা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে উদ্ধার অভিযান চলছে। কেউ অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোল ও অকটেন সংকটের পেছনে শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, দেশের ভেতরে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতাও বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, জ্বালানির প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি যাচাই এবং বেসরকারি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা জরুরি।

একইসঙ্গে মজুতদারি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে তেল থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে, যা জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে কঠোর, নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা জোরদারের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে পেট্রোল-অকটেনের এই মুহূর্তের সংকটের নেপথ্যে সিন্ডিকেটের কারসাজিকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, “অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদনের উৎস মূলত দুটি, রিফাইনারি ও কনডেনসেট। এখন খতিয়ে দেখা দরকার কোন উৎস থেকে ঠিক কতটুকু তেল পাওয়া যাচ্ছে। অতীতে এই খাতে কখনো এমন ঘাটতি দেখা যায়নি। তাহলে এখন কেন হচ্ছে? কনডেনসেটের একটি অংশ বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে থাকে। তারা কোনো সিন্ডিকেট বা বাজার ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করছে কি না, সরকারের তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত।”

অন্যদিকে নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক ঢাকা পোস্টেকে বলেন, “আমাদের দেশে তো মজুতদারী একটি অবৈধ পন্থা, যা ব্যবসায়ীরা সব সময় বেছে নেয়। আপনি দ্রব্যমূল্যের ক্ষেত্রে দেখেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। এখন সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি ঘাটতি, বিশেষ করে তেলের সংকট শুরু হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও কিছুটা হলেও পড়তে শুরু করেছে। আমরা ভর্তুকির মাধ্যমে হয়তো সেটাকে ঠেকিয়ে রেখেছি, কিন্তু কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন গ্যাস থাকার পরেও বলে গ্যাস নেই, তেল থাকার পরেও বলে তেল নেই। পেট্রোল পাম্পগুলোতে লোকজন তেল পাচ্ছে না—এটা জনজীবনকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগ হতে পারে। সরকার বলছে যে তারা তদারকির জন্য আনসার, বিডিপি কিংবা অন্যান্য বাহিনী মোতায়েন করছে, কিন্তু বাস্তবে আমরা দৃশ্যমান কিছু দেখছি না।”

“এটা একটি বড় সমস্যা। প্রত্যেকটি পেট্রোল পাম্পে গেলে বলা হচ্ছে তেল নেই। অথচ তেল আছে, (কিন্তু) দেওয়া হচ্ছে না। দুই-একটি অভিযান পরিচালনা করে সার্বিকভাবে দেশকে সঠিকভাবে চালানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে এলাকা ভিত্তিকভাবে প্রত্যেক থানা এবং সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট যদি দায়িত্ব নিয়ে পেট্রোল পাম্পগুলোকে সার্বক্ষণিক তদারকির মধ্যে রাখে, তাহলে প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে। আসলে তেল আছে কিনা, নাকি জনগণ এসে তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে—এটা যাচাই করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে পেট্রোল পাম্প বন্ধ দেখানো হচ্ছে—এটা কতটা সত্য এবং কতটা যথার্থ, তা সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করতে হবে। শুধু গুটিকয়েক মনিটরিং করে সারাদেশে মানুষকে স্বস্তিতে রাখা যাবে—এটা আমরা মনে করি না।”

ড. ওমর ফারুক আরও বলেন, “এজন্য জোরালো, দৃঢ় পদক্ষেপ এবং আইনগত সব দিক ব্যবহার করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা উচিত। জনগণের মধ্যে স্বস্তি আনতে হবে এবং তারা যেন সঠিক সেবা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। তেল থাকার পরেও তেল নেই বলা এটা অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্র, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

“তবে এক্ষেত্রে র‍্যাবের ভূমিকা বৃদ্ধি করার জন্য আরও জোর দেওয়া উচিত। সরকারের উচ্চ মহল থেকে তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া উচিত তারা যেন মাঠ পর্যায়ে ক্ষেত্রে জোড়ালোভাবে আরো কাজ করে। তাহলে পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *