ক্ষমতায় গেলে কৃষিঋণ মওকুফ করা হবে

Slider ফুলজান বিবির বাংলা


‘১২ তারিখে বাংলাদেশের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আগামী দিন আমরা দেশকে কোন দিকে পরিচালিত করব। দেশকে আমরা গণতন্ত্রের দিকে পরিচালিত করব নাকি দেশ অন্য কোনো দিকে চলে যাবে, এ বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

দেশের জনগণের রায়ে বিএনপি আগামীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কৃষকদের জন্য সুদসহ ১০ হাজার টাকা কৃষিঋণ মওকুফ এবং পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তিনি জানান, একইসাথে কৃষি কার্ড চালুর মাধ্যমে কীটনাশক ওষুধ, সার, বীজসহ বিভিন্ন উপকরণও কৃষকদের সহায়তা করা হবে। এছাড়াও উত্তরাঞ্চলে বন্ধ থাকা বরেন্দ্র প্রকল্প চালু, রাজশাহীর আইটি পার্ক সচল, রাজশাহী বিভাগে একটি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট স্থাপন, একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, আম সংরক্ষণে হিমাগার নির্মাণ এবং কৃষি সংক্রান্ত শিল্প স্থাপনে উৎসাহী উদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হবে।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে রাজশাহী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে তিনি এসব প্রতিশ্রুতি দেন।

তারেক রহমানে বলেন, ‘রাজশাহী বললেই বুঝায় পদ্মা নদী, এখন দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে— পদ্মাই বলেন, তিস্তাই বলেন, ব্রহ্মপুত্রই বলেন, যে নদীই বলেন— পানি আছে কোনো? কোনো পানি নাই, পদ্মা নদীর সাথে যে খালগুলো আছে, সেখানেও পানি নাই। আমাদের নদীতে পানি দরকার। এ এলাকার খালগুলো আমরা খনন করতে চাই। ধানের শীষ ইনশাআল্লাহ বিজয়ী হলে আমরা পদ্মা ব্যারেজ করতে চাই। ইনশাআল্লাহ আমরা পদ্মা ব্যারেজের কাজে হাত দেবো।’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সাথে জড়িত, যদিও সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ কৃষি পেশার সাথে জড়িত, দেশের বৃহৎ একটি অংশ কৃষি পেশার সাথে জড়িত। কৃষক ভালো থাকলে দেশের মানুষ ভালো থাকবে, কৃষি যদি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তাহলে দেশের মানুষ সহজেই কৃষি উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী তারা ক্রয় করতে পারবে। এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত যাদের কৃষিঋণ আছে ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষ বিজয় হয়ে সরকার গঠন করলে আমরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করব ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ পরিকল্পনার কথাগুলো আপনাদেরকে এজন্য বললাম— কারণ, বিগত ১৬-১৭ বছর এ দেশের সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার যেমন কেড়ে নেয়া হয়েছিল, এদেশের মানুষের কথা বলার অধিকার যেমন কেড়ে নেয়া হয়েছিল; ঠিক দেশের মানুষের জন্য তারা (বিগত সরকার) কোনো কাজ করেনি।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি, কিভাবে তারা মেগা প্রকল্প করেছে এবং এ মেগা প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ছিল মেগা দুর্নীতি। এলাকার মানুষের জন্য রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, মা-বোনদের পাশে দাঁড়ানো, এলাকায় হাসপাতাল, এলাকায় স্কুল-কলেজ ঠিক করা, হাসপাতাল ঠিক করা… এসব কোনো কাজ বিগত সরকারের সময়ে হয়নি। কাজেই ২৪ সালের ৫ আগস্ট যে পরিবর্তন হয়েছে, এর মাধ্যমে যেন জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। সেজন্য ১২ তারিখে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

সমাবেশে তারেক রহমান রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাই নবাবগঞ্জের ১৩টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের জন্য ভোট চান। প্রার্থীরা হলেন– শাহজাহান মিয়া, আমিনুল হক, হারুনুর রশীদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দিন, মিজানুর রহমান মিনু, শফিকুল ইসলাম মিলন, ডি এম জিয়াউর রহমান, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল, আবু সাঈদ চাঁন, ফারজানা শারমিন পুতুল, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আনোয়ার হোসেন আনু, আব্দুল আজিজ।

তারেক রহমান বলেন, ‘১২ তারিখে বাংলাদেশের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আগামী দিন আমরা দেশকে কোন দিকে পরিচালিত করব। দেশকে আমরা গণতন্ত্রের দিকে পরিচালিত করব নাকি দেশ অন্য কোনো দিকে চলে যাবে, এ বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের দিকে যদি আমরা দেশকে ধাবিত করি, গণতন্ত্রের পথে যদি দেশকে আমরা পরিচালিত করি, তাহলে আজকে আমরা যেসব পরিকল্পনার কথা বললাম, আপনাদের যে দাবিগুলোর কথা তুলে ধরলাম, মানুষের উপকার হয়— সেই কাজগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যদি গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে না পারি তাহলে মেগা প্রজেক্ট হবে, জনগণের কোনো প্রজেক্ট হবে না।’

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘জনগণের প্রজেক্ট যদি বাস্তবায়ন করতে হয় তাহলে অবশ্যই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে হবে, গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে। তাহলেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। আসুন আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘অবস্থার পরিবর্তনের অর্থ যেকোনো মূল্যে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, গণতন্ত্রের ঝান্ডাকে ওপরে তুলে ধরা। কোনোভাবে যেন জনগণের ঝান্ডা নেমে যেতে না পারে–এ ব্যাপারে সকলকে দৃষ্টি রাখতে হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। কারণ, শান্তি থাকলে আমি যে কথা বললাম, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারব। আমরা ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে যেতে চাই না। আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে কারো সমালোচনা করছি না। কারণ, আমি যদি সমালোচনা করি, আপনাদের কোনো লাভ হবে? আপনাদের পেট ভরবে? আপনাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, আপনাদের কৃষিঋণ মওকুফ হবে? না, কিছুই হবে না।’

তবে তিনি বলেন, ‘কিন্তু কোথাও যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, অন্তবর্তীকালীন যে সরকার আছে, তাদের উচিত সুষ্ঠু তদন্ত করা। সেই সুষ্ঠু তদন্তে যদি বিএনপির ভূমিকা থাকে, আমরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব।’

তিনি বলেন, ‘সঠিক তদন্ত হলে দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে। আমরা মুসলিম, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিষ্টান সকলে এ দেশে আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। একাত্তর সালে যখন আমরা দেখিনি কে কোন ধর্মের, ২৪ সালের ৫ আগস্টেও আমরা দেখিনি কে কোন ধর্মের। তাই আজ দেশ গড়ার সময় এসেছে, স্বাধীনতাকে রক্ষা করার সময় এসেছে। আজ আমরা ধর্ম দেখতে চাই না, আমরা দেখব মানুষ, আমরা দেখব বাংলাদেশী। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, আমরা তাদের সাথে আছি।’

ধানের শীষ জয়ী হলে ১৩ তারিখ থেকে জনগণের জয়যাত্রা শুরু হবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘১২ তারিখে ধানের শীষ জয়যুক্ত হলে পরে ইনশাআল্লাহ ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের জয়যাত্রা। সেজন্য আমি সবসময় বলি, আমরা করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’

জেলা সভাপতি মামুন-অর-রশিদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান লিটনের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপি নেতা শাহীন শওকত, দেবাশীষ রায় মধু, সাইফুল ইসলাম মার্শাল, বিশ্বনাথ সরকারসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

এর আগে, দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে তারেক রহমান রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে সমাবেশ মঞ্চে উপস্থিত হন। মঞ্চে তারেক রহমানের সাথে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানও ছিলেন।

এরপর জাতীয় পাতাকা ও বিএনপির দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এতে কোরআন তিলাওয়াত করেন ওয়ালিউল হক রানা।

তারেক রহমান মঞ্চে উঠার সাথে সাথে মাঠজুড়ে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় করতালি, স্লোগান ও দলীয় পতাকা নেড়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান তারা। পুরো সমাবেশ এলাকাটি মুহূর্তেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

এ সমাবেশে রাজশাহীসহ আরো তিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে দেয়া হয় সমাবেশস্থল ও এর আশেপাশের এলাকা।

রাজশাহীর জনসভা শেষে বিকেলে তারেক রহমান নওগাঁর উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে সন্ধ্যায় নওগাঁ এটিএম মাঠে আয়োজিত আরেকটি জনসভায় তার বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *