দুই সন্তান নিয়ে মায়ের ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার কারণ জানা গেলো

Slider টপ নিউজ


ক্যাপশন: সোমবার দুই সন্তান নিয়ে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে মায়ের আত্মহত্যার পর পড়ে আছে তিনটি লাশ—ছবি গ্রামবাংলানিউজ

গাজীপুর: গাজীপুরের কালিগঞ্জের দক্ষিন সোম গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে হায়েজা আক্তার মালার(৩৪) দুই সন্তান সহ আত্মহত্যার ঘটনায় পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মালার মেয়ের স্কুলের শিক্ষকদের নিকট দেবর কর্তৃক নির্যাতনের অভিযোগ ছিল তার। আজ সোমবার সকালে মেয়ের ব্যাগ স্কুলে রেখেই দুই সন্তান নিয়ে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে মা ও দুই সন্তান।

নিহত হাফেজা আক্তার মালা(৩৪) গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিন সোম গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে। যে দুই সন্তান নিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন তারা হলো, তাবাসসুম আক্তার নুসরাত(৯) ও মারুফ(৫)। দক্ষিন সোম গ্রামের পাশে আতুরী গ্রামে সালাউদ্দিনের ছেলে উজ্জ্বল হোসেনের সাথে মালার বিয়ে হয়। নুসরাত আতুরী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেনীতে পড়তো। মারুফ স্কুলে যেতো না।

সরেজমিন অনুসন্ধান জানা যায়, মেয়ে নুসরাতের স্কুলে মা মালার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে মালা প্রায়ই স্কুলের মেডামদের কাছে অভিযোগ করতেন যে, তার দেবর সজিব হোসেন তাকে তার স্বামী ও শশুরের সামনে প্রায়ই মারধর করতেন। কিন্তু স্বামী বা শশুর কিছুই বলতেন না। এই নিয়ে মালা খুব কষ্ট পেতেন। সোমবার (২৬ জানুয়ারী) সকাল সাড়ে ৯টায় মালা মেয়ের স্কুলে যায় ও দুই জন মেডামের কাছে জানায়, তার দেবর আবারো মারধর করেছে। তিনি তার দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাবেন। এই কথা বলে মেয়ে নুসরাতকে নিয়ে যেতে চাইলে মেডামরা বাঁধা দেয়। এক পর্যায়ে মেয়ের স্কুল ব্যাগ মেডামদের কাছে রেখে মেয়েকে নিয়ে চলে যায়। মেডামরা ব্যাগ নিয়ে যেতে বললে মালা জানায়, ফিরে আসলে কোন এক সময় ব্যাগ নিয়ে যাবে। এই বলে সাথে থাকা ছেলে মারুফ ও স্কুল থেকে মেয়ে নুসরাতকে নিয়ে চলে যায় মালা। এরপর সোমবার সকাল ১১টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের নয়ানীপাড়া রেল ক্রসিংয়ের অদূরে পূবাইলে দুই শিশুসন্তান সহ ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে তিনজনই আত্মহত্যা করেন।

স্থানীয় রেল ক্রসিং এর গেটম্যান আব্দুস সাত্তার জানান, সোমবার সকালে গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল রেল ক্রসিংয়ের পূর্ব পাশে নয়ানীপাড়া এলাকায় দুই সন্তানকে নিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটছিলেন মালা বেগম। এ সময় গেটম্যান তাদের রেললাইন থেকে সরে যাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করেন। ট্রেন দেখে ওই নারীর ছেলে ও মেয়ে সরে যেতে চাইলেও তিনি তাদের নিয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অত:পর পুলিশ তিনটি লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

ঘটনাস্থল পূবাইল থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) আতিকুল ইসলাম জানান, পারিবারিক কারণে মা তার দুই সন্তান নিয়ে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে জেনেছি। যেহেতু বিষয়টি রেলওয়ে পুলিশের আওতাধীন তাই তারাই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবেন।

এ বিষয়ে ভৈরব রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ( ওসি) সাইদ আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, লাশ তিনটি থানায় আনা হয়েছে। এই বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।

ক্যাপশন-২( চাঞ্চল্যকর মা ও দুই সন্তানের আত্মহত্যার পর ঘটনাস্থলে জনতার ভীড়—-ছবি গ্রামবাংলানিউজ)

ঘটনার পর গণমাধ্যমের নিকট মালার পরিবার অভিযোগ করে বলেন, দেবর প্রায়ই মালাকে মারতে যেতেন। এটা তারা শোনেছেন।

এই বিষয়ে আতুরী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক দিলরুবা জাহান ও তাসলিমা আক্তার বলেন, নুসরাতে মা মালা মেয়েকে আনা নেওয়ার জন্য প্রায়ই স্কুলে যাতায়াত করতেন। দেবর তাকে স্বামী ও শশুরের সামনে প্রায়ই মারধর করতো বলে তাদের জানিয়েছেন। ঘটনার দিন সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নুসরাতের মা, মালা দেবরের মারধরের কথা আবারো তাদের জানিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাবে বলে মেয়েকে নিতে চায়। আমরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেও পারিনি। এক সময় মেয়ের ব্যাগ স্কুলে রেখেই মেয়েকে নিয়ে চলে যায় মালা। ব্যাগটি বর্তমানে স্কুলেই যতœ করে রাখা আছে। এসময় মালার সাথে তার ছেলেও ছিল। অত:পর ছেলে ও মেয়ে নিয়ে মালা স্কুল ত্যাগ করেন।

সোমবার সন্ধায় আতুরী গ্রামে মালার শশুর বাড়িতে গিয়ে স্বামী উজ্জ্বলকে ঘুমাতে পাওয়া যায়। পরিবার থেকে বলা হয়, উজ্জ্বল অজ্ঞান হয়ে ঘুমিয়েছে। তবে বাড়িতে সবাই থাকলেও মালার দেবর সজিবকে পাওয়া যায়নি। সজিব কোথায় এমন প্রশ্নের সদোত্তর বাড়ির কেউ দেয়নি। সজিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনটি ফরোয়ার্ড করে রাখা হয়েছে। উজ্জ্বলদের বাড়ির একাধিক প্রতিবেশী জানায়, ভাবীকে মারধর করত সজিব। এখন ভাবী দুই সন্তান নিয়ে আত্মহত্যা করার পর থেকে সে পালিয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানায়, পুলিশের মাধ্যমে দুই পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। মঙ্গলবার লাশ আতুরী গ্রামে দাফন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *