ধানের শীষে একটি ভোট তারপর নারকীয় রাত, আজও ক্ষত কাটেনি পারুলের

Slider ফুলজান বিবির বাংলা


আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটকে ঘিরে সারাদেশে যখন প্রস্তুতির ব্যস্ততা, তখন সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলি ইউনিয়নের চার সন্তানের জননী পারুল আক্তারের মনে ভর করছে ভয় আর তিক্ত স্মৃতির ভার। ভোটার তালিকায় তার নাম রয়েছে, আছে ভোট দেওয়ার অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের মূল্য তাকে দিতে হয়েছিল ভয়াবহভাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৮ সালের নির্বাচনে পছন্দের প্রতীকে ভোট দেওয়ার অপরাধে যে নারকীয় রাত তার জীবনে নেমে এসেছিল, তা আজও তাকে তাড়া করে ফেরে।

ব্যালট হাতে নেওয়ার আগে তার মনে ভেসে ওঠে সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ভয়াবহ রাত আজও তার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকালে ভোটকেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের পছন্দের বাইরে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেন পারুল আক্তার। তাকে সেই ভোট প্রদানের ‘শাস্তি’ দেওয়া হয় রাতের অন্ধকারে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে সন্তানদের সামনেই তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। দেশজুড়ে ওই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ উঠে, কিন্তু ওই রাতের ঘটনা পারুলের স্বাভাবিক জীবনকে ধীরে ধীরে আড়ালে ঠেলে দিয়েছে সামাজিক অবহেলা ও অর্থনৈতিক সংকট।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য যে বর্বরতার শিকার হয়েছিলেন পারুল, সেই ঘটনার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। শারীরিক যন্ত্রণা, আর্থিক কষ্ট এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় প্রতিটি দিন যেন তার পরিবারের জন্য নতুন করে সেই বিভীষিকাময় রাতের পুনরাবৃত্তি হয়ে ওঠে।

পারুল আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঢাকা পোস্টকে বলেন, সারা শরীরে এখনও ব্যথা। অনেক সময় বিছানা থেকেও উঠতে পারি না। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারিনি। এখনো সারারাত হাত-পা কাপড় দিয়ে বেঁধে শুয়ে থাকি। সেই রাতের পর থেকে জীবন আর আগের মতো নেই।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার ব্যয় ও সংসারের দায়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্বামী সিরাজ উদ্দিন দীর্ঘদিন অসুস্থ ও কর্মক্ষম নন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য বড় ছেলে আব্দুল কুদ্দুস। আরেকটি ছেলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। পরিবারের দৈনন্দিন খরচ ও আমার চিকিৎসা করায় কুদ্দুস। অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তাতে দিন চলে। সংসারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে।

ঘটনার পর তৎকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পারুলকে ঘর ও জমি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কিছুই পাননি। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহানুভূতি ছিল। পারুল বলেন, ঘটনার পর থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন। এছাড়া খুশি কবির আপা আমাদের জন্য একটি ঘরও নির্মাণ করে দিয়েছেন। তবে তৎকালীন প্রশাসন কিছু দেয়নি।

পারুল বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনসহ ১৬ জনকে আসামি করে মামলার পর আদালত ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়েও তা কার্যকর হয়নি। আমি চাই রায় কার্যকর হোক। আর কোনো মাকে যেন সন্তানের সামনে লাঞ্ছিত হতে না হয়—এটাই আমার প্রার্থনা।

স্বামী সিরাজ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, সামাজিক অপবাদও ভোগ করছি আমরা। বাজার বা দোকানে গেলেই নানা কটু কথা শুনতে হয়। অনেকেই তাদের বাড়িকে ‘ধর্ষণের বাড়ি’ নামে ডাকেন।

বড় ছেলে আব্দুল কুদ্দুস ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাস্তাঘাটে চলাফেরা করলে মানুষ কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। অনেক জায়গায় আমাদের বসতেও দেওয়া হয় না। সমাজ আমাদের সম্মান করে না, যেন আমরা অপরাধী। আসামিদের পরিবারের পক্ষ থেকেও নানা কথা বলা হয়। আমরা কি কষ্টে আছি, তা কেবল আমরা জানি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. শাহজাহান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাকে ভোট দেওয়ায় সেদিন পারুলের ওপর বর্বর নির্যাতন করা হয়। তখন সারাবিশ্বের মানুষ তা দেখেছে। আমাদের দলের পক্ষ থেকে তাকে আইনসহায়তাসহ সব সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সব সময় আমরা তার পাশে আছি। সে একটা স্বচ্ছ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথিকৃৎ। কারণ একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তার সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। আমরা আশা করি এবার একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।

প্রসঙ্গত, এ ঘটনায় ২০২৪ সালে সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২–এর বিচারক (জেলা জজ) ফাতেমা ফেরদৌসের রায়ে ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ৬ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও রায় এখনো কার্যকর হয়নি।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা আসামিরা হলেন- মৃত খুরশিদ আলমের ছেলে মো. রুহুল আমিন, মৃত আবদুল হাসেমের ছেলে মো. হাসান আলী বুলু, মৃত ইসমাইলের ছেলে মো. সোহেল, মৃত আবদুল মান্নানের ছেলে স্বপন, আবুল কাশেমের ছেলে ইব্রাহীম খলিল, মৃত ছিডু মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন আবু, ফকির আহাম্মদের ছেলে মো. সালাউদ্দিন, মো. মোতাহের হোসেনের ছেলে মো. জসীম উদ্দিন, মো. রফিকের ছেলে মো. মুরাদ ও মৃত চাঁন মিয়ার ছেলে মো. জামাল হেঞ্জু।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো. হানিফ, আবদুল হামিদের ছেলে মো. চৌধুরী, মৃত আহম্মদ উল্যার ছেলে মো. বাদশা আলম, তোফায়েল আহম্মদের ছেলে মোশারফ, মৃত আরব আলীর ছেলে মো. মিন্টু ওরফে হেলাল ও আবুল কালামের ছেলে মো. সোহেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *