রাজধানী ঢাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সংকট ও এলপিজির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। নিরুপায় হয়েই সাধারণ মানুষ এসব পণ্য কিনছেন। এতে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি খরচের চাপ। একদিকে লাইনের গ্যাসের জন্য নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদ্যুতিক চুলা বা রাইস কুকার ব্যবহারের ফলে তাদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল।
ঢাকায় বেশ কিছুদিন ধরে লাইনের গ্যাসে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণত তীব্র শীতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পাইপলাইনে তরল পদার্থ জমে গ্যাস প্রবাহের চাপ কমে যায়। এবার এর সঙ্গে তুরাগ নদের তলদেশে গ্যাস পাইপলাইনের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং কোনো কোনো এলাকায় সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে রান্নার বিকল্প হিসেবে বাধ্য হয়েই বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ।
গ্যাসের ভোগান্তি থেকে বাঁচতে সম্প্রতি ইলেকট্রিক চুলা কিনেছেন মগবাজারের সোলাইমান-সুমি দম্পতি। এই দম্পতি বলেন, ‘তাদের বাসায় লাইনের গ্যাসের পাশাপাশি এলপিজি ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু শীত শুরু হওয়ার পর গভীর রাত ছাড়া লাইনের গ্যাস তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। এলপিজি দিয়ে দিনের কাজ ঠিকঠাক চলে যাচ্ছিল। তবে এলপিজি শেষ হওয়ায় ৫-৭ দিন আগে তারা ১৩০০ টাকার গ্যাস কিনতে গিয়ে দেখেন দাম ২২০০ টাকা হয়ে গেছে। পরে তারা বাধ্য হয়ে ৫ হাজার টাকায় একটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন।’
বিল দিয়েও মেলে না গ্যাস, উভয় সংকটে গ্রাহকরা
তাদের ভাষ্য, চুলা কিনতে এককালীন ৫ হাজার টাকা ব্যয়ের চেয়ে মাসে মাসে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল দেওয়াটা আরও বেশি কষ্টকর। সব রান্না বৈদ্যুতিক চুলায় করা হলে মাসে ৫০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত বিল আসবে বলে বিক্রেতারা তাদের জানিয়েছেন। ফলে এখন থেকে এলপিজি ব্যবহার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই দম্পতি।
শুধু সোলাইমান-সুমি দম্পতি নন, গ্যাস সংকটে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের দিকে ঝুঁকছেন তাদের মতো অনেকেই। মাসে মাসে লাইনের গ্যাসের বিল দেওয়ার পাশাপাশি এটি তাদের সংসারে বাড়তি খরচ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর গুলিস্তানের ন্যাশনাল স্টেডিয়াম মার্কেট, কয়েকটি রিটেইল চেইন শপ এবং খিলগাঁও, মুগদা ও মানিকনগর এলাকার বেশ কয়েকটি খুচরা দোকান ঘুরে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সব ব্যবসায়ীরই বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের বিক্রি বেড়েছে। মহল্লার দোকানগুলোতে মাসে দুই-তিনটি বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা রাইস কুকার বিক্রি করা যাদের জন্য কষ্টসাধ্য ছিল, তারাও এখন সপ্তাহে অন্তত দুই-তিনটি বিক্রি করতে পারছেন।
বৈদ্যুতিক চুলার ধরন
বাজারে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড— এই দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে। এর মধ্যে ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা বেশি। ইন্ডাকশন চুলায় সব ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায় না; কিন্তু ইনফ্রারেড চুলায় যেকোনো ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায়।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ইন্ডাকশন চুলা সরাসরি তাপ তৈরি করে না; এটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ নীতিতে কাজ করে। চুলার ভেতরের তামার কয়েল বিদ্যুৎ প্রবাহে পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। এতে পাত্রের তলদেশে ঘূর্ণি তড়িৎ প্রবাহ তৈরি হয়। ফলে তাপ সরাসরি পাত্রেই তৈরি হয় এবং চুলার কাঁচের উপরিভাগ তুলনামূলকভাবে কম গরম হয়।
অন্যদিকে, ইনফ্রারেড চুলায় হ্যালোজেন বা ইনফ্রারেড হিটারের মতো শক্তিশালী হিটিং উপকরণ সরাসরি তাপ উৎপন্ন করে। এই উপকরণ গরম হয়ে ইনফ্রারেড বিকিরণ ছড়ায়, যা সূর্যের আলোর মতো পাত্রকে গরম করে। এটি মূলত পুরোনো ইলেকট্রিক কয়েল চুলার আধুনিক রূপ, যেখানে তাপ সরাসরি স্থানান্তরিত হয়। ফলে চুলা চালু হলে উপরিভাগের কাঁচের প্লেট লাল হয়ে যায় এবং সেখান থেকেই তাপ বিকিরণ ঘটে।

