একটি বকা, জমে থাকা ক্ষোভ আর লোভে প্রাণ গেল কিশোরী নিলির

Slider নারী ও শিশু


বাসায় বাবা-মা, ভাই কিংবা ভাবি— কেউই ছিলেন না। সবাই পারিবারিক কাজে গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জে গিয়েছিলেন। রাজধানীর বাসায় বড় বোন ঝুমুর আক্তার শোভার সঙ্গেই ছিল দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার নিলি। নিলির বাবা সজীবের একটি হোটেলের ব্যবসা রয়েছে। অন্য সব কর্মচারী ছুটিতে থাকলেও ঢাকায় ছিলেন হোটেলের কর্মচারী মিলন।

গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে খাবার আনতে নিলির বাসায় যান মিলন। রাত তখন ১১টা। এত রাতে দরজায় কড়া নাড়তেই ক্ষেপে যায় নিলি। এত রাতে কেন এসেছেন? সন্ধ্যায় আসতে পারেননি?— নিলির এমন প্রশ্নেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মিলন। বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে নিলিকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে সে।

নিহত ফাতেমা আক্তার নিলির ভাই শাকিল জানান, পারিবারিক একটি কাজে দুই বোনকে বাসায় রেখে গত বুধবার আমরা গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ যাই। আমার বাবার একটি হোটেল ব্যবসা রয়েছে। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সুবাদে হোটেলটি বন্ধ ছিল। আরও যারা কর্মচারী ছিল, তারা সবাই ছুটি নিয়ে চলে গেলেও শুধু মিলন ঢাকায় ছিল। পরদিন বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে মিলন আমাদের বাসায় খাবার আনতে যায়। বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় আমার বোন অনেক রাগারাগি করে। সে বলে— এত রাতে এসেছেন কেন? সন্ধ্যায় আসতে পারলেন না? এরপর খাবার নিতে আসলে সন্ধ্যার সময় আসবেন।

তিনি আরও বলেন, রাতের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মিলন। সেদিন জেলখানার খাবারের মতো দরজার নিচ দিয়েই তাকে খাবার দেওয়া হয়। এরপর শনিবার যথারীতি দুপুরের খাবার আনতে আমাদের বাসায় যায় মিলন। সেসময় বড় বোন ঝুমুর আক্তার শোভা ও মিলন দুজনে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। আমার বোন শোভা পাশেই জিমে গিয়েছিল। জিম থেকে ফিরে বাসায় ঢুকে দেখে সবকিছু তছনছ। নিলি বেসিনের সিঙ্কের নিচে উপুড় হয়ে পড়েছিল। পরে হাসপাতালে নিয়ে দেখা যায়, আমার বোনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।

শাকিল বলেন, বাসার সব জিনিসই ছিল এলোমেলো; ওয়ারড্রব, বিছানা সবকিছুই ভাঙা। আমার স্ত্রীর একটি চেইন, একটি আংটি, তিন ভরি রুপার জিনিস এবং মায়ের দুই ভরি ওজনের দুটি বালা, দুটি চেইন, কানের দুল ও আংটি নিয়ে যায় মিলন। সে বটি দিয়ে গলা কেটে আমার বোনকে হত্যা করেছে। হত্যায় ব্যবহৃত বটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। আমাদের ধারণা, রাতে খাবার আনতে গিয়ে আমার বোন তাকে বকা দিলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, নিহত ফাতেমা আক্তারের বোন বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মিলনকে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এরপর তাকে আবার ফাতেমা আক্তারের বাসায় ঢুকতে দেখা যায়। পরে আবার ওই বাসা থেকে তাকে বেশ কিছুক্ষণ পর বের হতে দেখা যায়।

নিহত ফাতেমা আক্তারের বাবা মো. সজিব জানান, সাত-আট বছর মিলন রিকশা চালাত। পরে আমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আমার এখানে ৩০০ টাকা বেতনে এক বছর চাকরি করে। এরপর দীর্ঘদিন তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। ফের গত দুই মাস যাবৎ সে ৫৫০ টাকা বেতনে হোটেলে কাজ শুরু করে। সে শুধু আমার মেয়েকে হত্যাই করেনি, বাসা থেকে পাঁচ ভরি সোনা, তিন ভরি রুপা ও নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমি যে হোটেল চালাচ্ছি, সেটি ছেড়ে দিয়েছি। নতুন একটি হোটেল নিয়েছি; সেই হোটেলের অ্যাডভান্সের তিন লাখ টাকা, ভাড়া ৬০ হাজার এবং বাসা ভাড়া ২০ হাজারসহ মোট পাঁচ লাখ টাকা বাসায় রাখা ছিল। সে আমার হোটেলের পেছনেই থাকত, কিন্তু ঘটনার পর থেকে পলাতক। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে মগবাজার থেকে তার মা ও ছোট ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে র‍্যাব। মিলন মোবাইল ব্যবহার করত না। এ ঘটনায় আমি খিলগাঁও থানায় বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছি।

বনশ্রীতে দশম শ্রেণির ছাত্রীকে গলা কেটে হত্যা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. হারুন অর রশিদ জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারিনি। তবে খুব দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
আরও পড়ুন
মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ে হত্যায় ব্যবহৃত সেই ছুরিও ছিল চুরি করা

হত্যাকাণ্ডের কোনো মোটিভ পাওয়া গেছে কি না— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমরা অনেক কিছু মাথায় রেখেই কাজ করছি। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো মোটিভ পাওয়া যায়নি।

গত ১০ জানুয়ারি বনশ্রীতে ফাতেমা আক্তার নিলি (১৭) নামের ওই শিক্ষার্থীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সে রেডিয়েন্ট স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। খিলগাঁও থানার দক্ষিণ বনশ্রী প্রধান সড়কের এল ব্লকের ‘প্রীতম ভিলা’য় পরিবারের সঙ্গে থাকত সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *