
সরকারের পক্ষ থেকে ‘সংকট নেই’ বলে আশ্বস্ত করা হলেও বাস্তবে চরম হাহাকার চলছে এলপিজি গ্যাসের বাজারে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসের ঠিক উল্টো চিত্র ফুটে উঠেছে রাজধানীসহ সারা দেশে। গুটিকয়েক কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশের সরবরাহ বন্ধ থাকায় ১ হাজার ৩০০ টাকার সিলিন্ডার এখন বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে ২২০০ টাকায়। নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ গুনেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে।
গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এলপি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করে। এক হাজার ২৫৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাজারে এর কাছাকাছি দামেও কোনো সিলিন্ডার নেই। প্রতিটি সিলিন্ডার বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকায়।
শীতকাল আসার সঙ্গে সঙ্গে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে, সবমিলিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি পৌঁছেছে তুঙ্গে।
রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বসবাস করেন বেসরকারি চাকরিজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস। তার বাসায় পাইপলাইন গ্যাসের সংযোগ থাকলেও ইদানীং দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকে না। বিকল্প হিসেবে বাসায় থাকা এলপিজি সিলিন্ডারটি রিফিল করতে গিয়ে তিনি পড়েছেন চরম বিপাকে। একে তো বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আর পাওয়া গেলেও দাম চাওয়া হচ্ছে ২১০০ থেকে ২২০০ টাকা।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “প্রতি মাসে আমাকে পাইপলাইন গ্যাসের জন্য নির্দিষ্ট বিল পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু লাইনে গ্যাস থাকে না বললেই চলে, বিশেষ করে শীতকালে অবস্থা আরও নাজুক হয়। ফলে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু এখন সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না। আজ বেশ কিছু দোকান ঘুরেও সিলিন্ডার পাইনি, আর যেখানে আছে সেখানে রাখা হচ্ছে গলাকাটা দাম। আমাদের খরচ ও ভোগান্তি— দুটিই সমানতালে বেড়েছে। গ্যাসের সংকট এভাবে চলতে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও খাওয়া-দাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে।”
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সুমনের বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সিলিন্ডারই তার একমাত্র ভরসা। তিনি বলেন, “১২ কেজির একটি সিলিন্ডারে আমার মোটামুটি এক মাস চলে যায়। বর্তমান সিলিন্ডারটি আর কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। বাজারে যেভাবে এলপিজির সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে সামনে নতুন সিলিন্ডার পাব কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
এদিকে বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় অনেকে এখন হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। তবে, গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে হোটেলগুলোতেও; সেখানে রান্নার স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের এই সময়ে বাজারে ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত রান্নার কাজ সেরে নেওয়া যায় বলে গ্রাহকরা এখন এই প্রযুক্তির দিকে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। বিক্রেতারাও নিশ্চিত করেছেন যে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে। বর্তমানে মান ও ব্র্যান্ডভেদে এসব চুলা আড়াই হাজার থেকে শুরু করে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের জুবায়ের ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জুবায়ের বলেন, “বৈদ্যুতিক চুলায় সব ধরনের রান্না অনায়াসে করা যায়। রান্নার পরিমাণ অনুযায়ী মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মতো আসে। খরচ সাশ্রয়ী হওয়ায় গ্রাহকরা এখন সিলিন্ডার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা কিনছেন।”
গ্যাসের ভোগান্তি থেকে বাঁচতে সম্প্রতি ইলেকট্রিক চুলা কিনেছেন গৃহিণী পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, “বাজারে কোথাও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার দিনের পর দিন হোটেল থেকে খাবার কিনে আনাও সম্ভব না। তাই নিরুপায় হয়ে ইলেকট্রিক চুলা কিনলাম। এটি বেশ সুবিধাজনক। যেখানে গ্যাসের পেছনে মাসে দুই হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হচ্ছিল, সেখানে এই চুলায় বিল আসবে বড়জোর ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এটি আমাদের জন্য অনেক সাশ্রয়ী।”
দেশের বাজারে বর্তমানে ২৮টি প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে এলপিজি বিক্রির সাথে যুক্ত থাকলেও, সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে মাত্র ৪ থেকে ৫টি কোম্পানি বাজারে গ্যাস সরবরাহ করছে। এর মধ্যে ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, ইউনিগ্যাস এবং ফ্রেশ এলপিজি অন্যতম।
তবে, বর্তমানে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কার্যত দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে সরবরাহ সংকট ও লোকসানের কারণ দেখিয়ে আজ খুচরা পর্যায়ে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল ‘এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’। যদিও কয়েক ঘণ্টা পর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। সরবরাহ সংকট আর সমিতির এই আকস্মিক ঘোষণায় নগরজুড়ে এলপিজির হাহাকার আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে এলপিজি সিলিন্ডার নেই। আর কোথাও পাওয়া গেলেও তার দাম রাখা হচ্ছে ২,২০০ টাকা। মোহাম্মদপুর টাউন হলে অবস্থিত বেশ কয়েকটি এলপিজি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ দেখা গেছে।
সেখানে খোলা থাকা ‘বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স’-এর রুবেল আহমেদ বলেন, “বাজারে এখন গ্যাস নেই বললেই চলে। যে দু-একটি কোম্পানির গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, আমাদেরই কিনতে হচ্ছে ২ হাজার টাকায়, আর বিক্রি করতে হচ্ছে ২,২০০ টাকায়। কিন্তু এখানেও বিপদ আছে। অনেক ক্রেতা অতিরিক্ত দামে কিনে ভোক্তা অধিকার দপ্তরে অভিযোগ করেন। তখন ম্যাজিস্ট্রেট এসে আমাদের জরিমানা করেন। অথচ এখানে আমাদের কোনো দোষ নেই, কারণ কেনাই বেশি দামে।”
মুগদা এলাকার ‘জলিল স্যানিটারি অ্যান্ড ইলেকট্রিক’-এর স্বত্বাধিকারী মো. জলিল মিয়া বলেন, “কয়েক দিন ধরে আমরা এলপিজি পাচ্ছি না। ৩-৪ দিন আগেই দোকানের সব সিলিন্ডার শেষ হয়ে গেছে। আজ থেকে তো আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ডিস্ট্রিবিউটররা বলছেন, কোম্পানি থেকে গ্যাসের গাড়ি আসছে না।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমিতির ঘোষণাকে অনুসরণ করে অনেকে প্রকাশ্যে বিক্রি বন্ধ রাখলেও কেউ কেউ গোপনে চড়া দামে গ্যাস বিক্রি করেছেন। আর নিরুপায় হয়ে সাধারণ ক্রেতারা সেই দামেই সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোহাম্মদপুর এলাকার একজন ডিস্ট্রিবিউটর ঢাকা পোস্টকে বলেন, “কোম্পানি থেকে সরবরাহ অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের কাছ থেকেও দাম অনেক বেশি রাখা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, চলতি মাসের মধ্যে এই সংকট কাটার সম্ভাবনা খুব কম।”
দেশে এলপিজির এই সংকটের কারণ হিসেবে বিভিন্ন বিষয়কে তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। আমদানিকারক অনেক কোম্পানি এলসি খুলতে গিয়ে জটিলতায় পড়েছে, আবার কেউবা আমদানি বৃদ্ধির অনুমোদন পায়নি। এ ছাড়া, বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তাদের জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও সংকট তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করছেন তারা।
এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, দেশের বাজারে সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে রিফিল হচ্ছে এক কোটি ২৫ লাখের মতো। বড় আকারের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় এই ঘাটতি পূরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এর মধ্যে অনেক কোম্পানির ব্যাংক ঋণ রয়েছে, আবার কেউ কেউ আমদানি বৃদ্ধির অনুমতি চেয়েও তা পাননি।
লোয়াব-এর সহ-সভাপতি ও এনার্জিপ্যাকের সিইও হুমায়ুন রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে এলপিজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এলসি খোলা থাকলেও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় পণ্য আসতে পারছে না। এ ছাড়া বর্তমানে ইউরোপেও এলপিজির চাহিদা অনেকটা বেড়ে গেছে। ফলে সার্বিকভাবে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়েছে।”
তিনি বলেন, “স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) না থাকলে এবং জাহাজগুলো বাংলাদেশে চলে আসলে আর কোনো সমস্যা থাকত না। তবে এখন অনেক পরিবেশক বিভিন্ন উৎস থেকে এলপিজি আমদানিতে কাজ করছেন। আশা করছি, দ্রুত এই সংকট কেটে যাবে।”
ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, “এই সংকট তৈরি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো সরকার কর্তৃক আমদানি বৃদ্ধির অনুমোদন না দেওয়া। আমরা যখন অনুমোদন চেয়েছিলাম, তখন সেটি পেলে আজ এই সমস্যা হতো না। তবে সরকার বর্তমানে অনুমতি দিয়েছে, ফলে আমদানি বাড়বে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুদিন সময় লাগবে।”
ইতোমধ্যে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ক্রমবর্ধমান সংকট ও মূল্য অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনঃনির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাঠানো হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, “আমরা আজ এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছি। এলপিজির যে সংকট চলছে, রমজানের মধ্যে তার সার্বিক সমাধান হয়ে যাবে। আমদানি যাতে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “গত ডিসেম্বরে এক লাখ ২৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। কিন্তু পরিবেশকরা বলছেন, চাহিদার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিইআরসি ও মন্ত্রণালয়— সবাই এ বিষয়ে অবগত আছে।”
মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাজারে যেন উচ্চমূল্যে পণ্যটি বিক্রি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে লোয়াব ও পরিবেশকরা সম্মত হয়েছেন। এই পরিস্থিতি সাময়িক, আমরা তা পর্যবেক্ষণে রাখছি। আশা করি দ্রুতই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
