পুলিশে কইছে সরকার আনবে, কিন্তু কবে আনবে তা তো কয় না’

Slider বিচিত্র


‘মনুর (ছেলের) কথা ভোলতে পারি না। ওই পোয়ায় আমারে খাওয়াইছে। এহন হেই পোয়ারে আল্লায় কি রহম রাখছে জানি না। খবর পাইছি ভারতে আছে। যতজন লোক একসঙ্গে গেছে তার মধ্যে ১৭ জন লোক ওই দেশে আছে। এহন যদি তাড়াতাড়ি একটু আইন্না দিতো তাইলে পরানডায় একটু শান্তি অইতো। মেগো তো আর শক্তি অইবেনা যে মোরা তারে আনমু। বাবোর কথা মনে ওঠলে বুঝায় যেন এইত্তারা গেছে। কেমনে ভুইল্লা থাকমু, ভুইল্লা থাকতে পারি না। পুলিশে কইছে সরকার আনবে, কিন্তু কবে আনবে তা তো মোগো কয় না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সাগরে মাছ শিকার করতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া বরগুনার জেলে ইউনুস সর্দারের মা তারাবানু। গত দুই বছর আগে ঘূর্ণিঝড় মিধিলিতে ইউনুস সর্দারসহ বরগুনার বিভিন্ন এলাকার ১৭ জন জেলে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। নিখোঁজের পরপরই তাদের সন্ধান পেতে বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি শুরু করেন ইউনুস সর্দারের মা তারাবানুসহ নিখোঁজ জেলেদের স্বজনরা। সম্প্রতি ইউনুস সর্দারসহ বরগুনার নিখোঁজ ওই ১৭ জন জেলে ভারতের গুজরাটের একটি কারাগারে আছেন বলে জানতে পান স্বজনরা। এছাড়া ভারত থেকে নিখোঁজ থাকা জেলেদের ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদস্যরা তাদের ছবিসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য নিয়েছেন বলেও জানান এসব জেলেদের স্বজনরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর এফবি এলাহী ভরসা নামের একটি ট্রলার নিয়ে ১৭ জন জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড় মিধিলির কবলে পড়ে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ ওই ১৭ জেলেদের মধ্যে রয়েছেন, আউয়াল বিশ্বাস, মাহাতাব, ইউনুস সর্দার, আল-আমীন, কামাল, ফারুক মিস্ত্রি, খালেক ও নানটু মিয়ার বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের মরখালী, খাগবুনিয়া এবং কদমতলা নামক এলাকায়। একই উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের গাজী মাহমুদ ও নাচনা পাড়া নামক এলাকার সিদ্দিক মৃধা, মনির হোসেন, সহিদুল ইসলাম, খলিল, রব, লিটন ও সুবাহান খাঁ নামে মোট ১৫ জন জেলে নিখোঁজ হয়। এছাড়া পাথারঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী এবং বড়ইতলা নামক এলাকা থেকে একই ট্রলারে থাকা শফিকুল ইসলাম ও কালু মিয়া নামে আরও দুই জেলে নিখোঁজ হয়। পরে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের কোনো খোঁজ না মিললেও সম্প্রতি তারা ভারতের গুজরাটের একটি জেলে আছেন বলে জানতে পান স্বজনরা।

ঘূর্ণিঝড় মিধিলিতে নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে ইউনুস সর্দারসহ ৫ জেলের বাড়িই বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের মরখালী নামক এলাকায়। সরেজমিনে নিখোঁজ ১৭ জেলের সন্ধান পাওয়ার বিষয়ে জানতে মরখালী নামক ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শুধু ইউনুস সর্দারের মা তারাবানু নয়, নিখোঁজ জেলেদের ফিরে পেতে এখন অপেক্ষার সময় পার করছেন ওই একই এলাকার নিখোঁজ অন্য জেলেদের স্বজনরাও। কান্নার আড়ালে এখন চোখে মুখে আনন্দের স্বস্তিও ফিরতে শুরু করেছে তাদের। তবে তাদের দাবি সরকারি ব্যবস্থা ছাড়া নিখোঁজ থাকা জেলেদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। আর এ কারণেই দ্রুত তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান নিখোঁজ থাকা ওই জেলেদের স্বজনরা।

মরখালী এলাকার নিখোঁজ জেলে আউয়াল বিশ্বাসের স্ত্রী নার্গিস ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত দুই বছর আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আমার স্বামী নিখোঁজ হয়। এরপর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর নিয়েও তার কোনো সন্ধান পাইনি। এখন থানায় একটা খবর এসেছে নিখোঁজ জেলেরা বেঁচে আছে, এবং ভারতের গুজরাটে আছে। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই যাতে তাদেরকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

একই এলাকার নিখোঁজ জেলে মাহতাবের স্ত্রী খাদিজা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা স্বামী নিখোঁজ হওয়ার সময় মানুষের কাছে ঋণগ্রস্ত ছিল। দুই বছর ধরে বিভিন্ন মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালাইছি। নিখোঁজ হওয়ার তিন মাসের মাথায় একটা নাম্বার থেকে ফোন করা হয়। পরে প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলে তারা বলেন, ভুয়া নাম্বার থেকে কল আসছে। এখন থানা থেকেই আমাদের জানানো হয়েছে ১৭ জন জেলের খোঁজ পাওয়া গেছে।

নিখোঁজ জেলে ইউনুস সর্দারের ভাই ইদ্রিস ঢাকা পোস্টকে বলেন, নিখোঁজের পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও তাদের কোনো সন্ধান আমরা পাইনি। তবে কিছুদিন আগে আমাদের সাবেক চেয়ারম্যান বলছেন তাদের খোঁজ পাওয়া গেছে। পরে তার সঙ্গে থানায় গিয়ে কথা হয় আমাদের। তারা বলেছে নিখোঁজ জেলেদের ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চলছে। আমরা চাই দ্রুত তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

নিখোঁজ জেলেদের সন্ধান পাওয়ার বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল টিটু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় মিধিলির প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে আমার এলাকার একটি মাছ ধরার ট্রলার হারিয়ে যায়। ওই সময় ট্রলারটিতে মাঝি আউয়াল বিশ্বাসসহ মোট ১৭ জন জেলে ছিল। দীর্ঘ অনুসন্ধানেও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিছুদিন আগে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ডিএসবি শাখা থেকে নিখোঁজ জেলেদের অনুসন্ধানের জন্য নাম ঠিকানা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে আমরা জানতে পারি নিখোঁজ হওয়া ওই জেলেরা ভারতের গুজরাটের একটি জেলে বন্দি আছেন। এরপর আমি পরিবারগুলোর সদস্যদের খবর জানাই এবং পুলিশ সদস্যরাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা জেলে পরিবারগুলো বর্তমানে অসহায় অবস্থায় আছেন। আমি আশাকরি দ্রুত সময়ের মধ্যে বরগুনার ১৭ জেলেকে ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বিষয়টি জানতে বরগুনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখায় খোঁজ নিলে জেলা ইন্টেলিজেন্স অফিসার (ওয়ান) মো. কামরুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প থেকে ঘূর্ণিঝড় মিধিলিতে নিখোঁজ বরগুনার ১৭ জন জেলের তালিকা দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং নিখোঁজদের ছবি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে ঢাকার এসবি শাখায় পাঠানো হয়েছে।

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের অধিদপ্তর থেকে ১৭ জন নিখোঁজ জেলেদের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রাপ্ত ওই তালিকা আমাদের মৎস্য দপ্তরের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা নিয়ে কাজ করছেন। নিখোঁজদের বিষয়ে তথ্য মিললেই দ্রুত তারা তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *