কাশিমপুর কারাগারে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মৃত্যু

Slider ফুলজান বিবির বাংলা

গাজীপুর: আওয়ামী লীগের দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সংঘটিত বহুল আলোচিত শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল- এমন প্রেক্ষাপটে ওই মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শহিদুল ইসলাম শিপু (৫৪) গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ মারা গেছেন। রোববার (৪ জানুয়ারি) বেলা সোয়া ১১টার দিকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মারা যাওয়া শহিদুল ইসলাম শিপু গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীর গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা এবং রফিক কন্ডাক্টরের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি অবস্থায় বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর জেলার মো. আবুল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রোববার সকালে কারাগারের ভেতরে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন শহিদুল ইসলাম শিপু। দ্রুত তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে রোববার বিকেলে মরদেহ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে নিহত শহীদের লাশ দেখতে শুভাকাঙ্ক্ষীরা মর্গ ও নিহতের বাড়িতে ভিড় জমায়। সোমবার বেলা ১১টায় টঙ্গী গোপালপুর টিএন্ডটি মাঠে নিহতের জানাযা শেষে লাশ সিটি করপোরেশনের গোপালপুর গোরস্থানে দাফনের কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরদিন নিহতের ভাই মতিউর রহমান মতি ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে এই মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল বলে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠে আসছে।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলাটি ব্যবহার করে তৎকালীন যুবদল কেন্দ্রীয় নেতা নূরুল ইসলাম সরকার, জাতীয় ছাত্র সমাজের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম দিপু এবং তার দুই ভাই শহিদুল ইসলাম শিপু ও অহিদুল ইসলাম টিপুসহ একাধিক ব্যক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করে আসামি করা হয়। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট এ মামলার রায়ে ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং ১১ জনকে খালাস দেন। বর্তমানে এ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আপিল বিভাগে ঝুলে রয়েছে।

এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বর্তমানে নিরপরাধ দাবি করা বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকার এখনও কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মামলাটি পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। পরিবারের অভিযোগ, ভিত্তিহীন তথ্য ও কেবলমাত্র শোনা কথার সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে নূরুল ইসলাম সরকারকে বিচারিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আরও অভিযোগ করা হয়, চূড়ান্ত বিচারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা অন্যান্য আসামিরা যেন বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি থাকে- সেজন্য বাদীপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে আপিল বিভাগে একের পর এক বেঞ্চ পরিবর্তনের মাধ্যমে মামলাটি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখে। অবশেষে রাজনৈতিক বিবেচনায় ৯ম বেঞ্চে মামলাটি নিয়ে গিয়ে নূরুল ইসলাম সরকারকে কথিত ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং অধিকাংশ আসামিকে খালাস দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শহিদুল ইসলাম শিপুর মৃত্যু নতুন করে আলোচিত এ মামলার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *