ভোগান্তির শেষ নেই পাসপোর্ট অফিসে

Slider ঢাকা

1510690925

 

 

 

 

পাসপোর্ট পেতে ভোগান্তির শেষ নেই। প্রতি পদে পদেই হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। দালাল সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের পাসপোর্ট অফিসগুলো। বকশিশ না দিলে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টও পৌঁছে না পাসপোর্ট অফিসে। প্রতিদিন হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে হাজার হাজার আবেদনকারীকে। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট প্রকল্প চালুর পর প্রথম দিকে পাসপোর্ট প্রদানে কিছুটা গতি সঞ্চারিত হয়েছিল। তবে সম্প্রতি একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর লাগামছাড়া দুর্নীতির কারণে সেখানকার অবস্থারও চরম অবনতি হয়েছে। অবৈধ অর্থের লোভে কর্মকর্তারা নানাভাবে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে দালালের সাহায্য নিতে উত্সাহিত করছেন। এ অবস্থায় অনেক ভুক্তভোগী ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি।

সারাদেশে ৬৭টি পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকায় ৩টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং দেশের বাকি ৬২ জেলায় একটি করে পাসপোর্ট অফিস আছে। প্রতিদিন এসব অফিসে প্রায় ১৫ হাজার নতুন পাসপোর্ট ও নবায়নের আবেদন জমা পড়ে। এরমধ্যে ঢাকার আগারগাঁও, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে জমা পড়ে গড়ে ৩ হাজার আবেদন। সাধারণ পাসপোর্টের জন্য ফি দিতে হয় ৩ হাজার ৪৫০ টাকা এবং জরুরি পাসপোর্ট পেতে হলে জমা দিতে হয় ৬ হাজার ২শ’ টাকা। জরুরি পাসপোর্ট ৮ দিনের মধ্যে দেওয়ার বিধান আছে। নবায়নের জন্য ৬ হাজার ৯শ’ টাকা জমা দিয়েও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেকে নতুন পাসপোর্ট পান না। নবায়নের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হয় না। তারপরও এক্ষেত্রে অহেতুক বিলম্ব করা হয়। পাসপোর্ট অফিসে একটি চক্র রয়েছে। এদের কিছু টাকা দিলে আর হয়রানি পোহাতে হয় না। জানা গেছে, ২০০৯ সালে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রকল্প চালু করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে দুই দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এদিকে পাসপোর্ট অফিসগুলোতে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রায় ১ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী বৃদ্ধি করা হয়। এর বাইরে ২৭০ জন আনসার নিয়োজিত রয়েছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না পাসপোর্ট অফিসগুলোতে। অথচ চিকিত্সা, ব্যবসা, ভ্রমণ, চাকরি বা শিক্ষা অর্জনের জন্য এক দেশ থেকে অন্যদেশে যেতে হলে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হচ্ছে পাসপোর্ট।

পাসপোর্ট অফিসগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীসহ দেশের পাসপোর্ট অফিসে বাড়ছে দালাল চক্রের তত্পরতা। বিশেষ করে আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। অফিসের ভেতরে-বাইরে, এমনকি রাস্তার ওপরও দালালদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মাঝে-মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে গুটিকয়েক দালাল ধরা পড়লেও বাকিরা নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। পাসপোর্টের ফরম পূরণ, জমা দেওয়া, টাকা জমা দেওয়া থেকে শুরু করে তা হাতে পাওয়া পর্যন্ত সব জায়গাতেই রয়েছে দালালদের অবাধ যাতায়াত। আর এই দালাল চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও যোগসাজশ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্যে দিন দিন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মানুষ। দালাল, কর্তব্যরত একদল আনসার সদস্য এবং পাসপোর্ট অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে গড়ে তুলেছেন একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। আর এ সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন আবেদনকারীরা। এই সিন্ডিকেটকে পাশ কাটিয়ে পাসপোর্ট পাওয়া অনেকটাই অসম্ভব। পাসপোর্ট পেতে কোনো না কোনোভাবে পড়তে হয় তাদের কবলে। পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা অনেকেই কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার ও অসহযোগিতার অভিযোগ করেন।

বিভিন্ন সূত্রমতে, পাসপোর্ট অফিসের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ওই দালাল চক্র বিভিন্নভাবে হয়রানির পাশাপাশি প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। জানা গেছে, পাসপোর্ট অফিসে দালালদের খপ্পরে পড়ে আবেদনকারীরা একদিকে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন, তেমনি হয়রানির শিকারও হচ্ছেন। প্রয়োজনের সময় আবার হাতে পাসপোর্ট না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন অনেকেই। পাসপোর্ট প্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি তো দিতেই হয়, আবার কোনো কোনো সময় টাকা নিয়েও পাসপোর্ট না দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে দালালরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি সত্ত্বেও পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্যে দিশাহারা হওয়ার উপক্রম। অনেক সময় চোখের সামনেই এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্বিকার থাকতে দেখা যায়।

আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস, উত্তরা পাসপোর্ট অফিস এবং কেরানীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের সামনের রাস্তা, ভবনের নিচতলা, পাসপোর্ট ভবনগুলোর সামনে সরেজমিনে দেখা গেছে, সর্বত্র দালালের উত্পাত।

দালাল চক্রে নারীরাও আছেন। একজন নারী দালাল দুই ব্যক্তির পাসপোর্ট জরুরি ভিত্তিতে নবায়ন করিয়ে দেবেন বলে টাকা নিযেছেন। তার পিছু নিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় তলার আবেদন জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সারি। কিন্তু ওই নারী দালাল কাউন্টারের পেছনে বন্ধ দরজায় টোকা দিতেই তাকে ভেতরে ডেকে নেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর তিনি হাসিমুখে বেরিয়ে আসেন। দালালেরা পাসপোর্ট অফিসের বিপরীত পাশে রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা খাবারের দোকান, চায়ের দোকান, ফটোকপি ও কম্পিউটারের দোকানগুলোকে নিজেদের কার্যালয়ের মতো ব্যবহার করছেন।

দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি মাঝে মাঝে অভিযানের মাধ্যমে কয়েকজন দালালকে লোক দেখানো গ্রেপ্তারও করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর অবশ্য তারা দ্রুত জামিনে ছাড়া পেয়ে কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আরো বেশি অবৈধ আয়-উপার্জনে মনোযোগী হয়। এদিকে পাসপোর্ট অফিসে দালালদের সাহায্য ছাড়াই পাসপোর্ট করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন আরিফুল ইসলাম। তিনি নিজে কয়েকবারের প্রচেষ্টায় ফর্ম জমা দেন এবং ছবি তোলার কাজ সম্পন্ন করেন। তিনি নির্দিষ্ট তারিখ অনুযায়ী পাসপোর্ট তুলতে গিয়ে জানতে পারেন তার পাসপোর্ট আসেনি। এটি আসতে আরো কয়েকদিন দেরি হবে। এ বিষয়ে মোবাইল মেসেজের কথা বলা হলেও কোনো মেসেজই তিনি পাননি বলে জানান। যদিও দালালদের মাধ্যমে জমা দিতে উত্সাহিত করতেই কর্মকর্তারা এ সময়ক্ষেপণের পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছেন বলে জানা যায়।

আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা গেল হন্তদন্ত হয়ে এদিক-ওদিক ছুটছেন শ্রাবণী নামে একজন নারী। এক সপ্তাহের মধ্যে তার পাসপোর্ট দরকার, বিশেষ কাজে তাকে বিদেশ যেতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই লাইনে দাঁড়িয়ে সেদিন তার পক্ষে ফরম জমা দেয়া সম্ভব নয়। তিনি দীর্ঘলাইনের বেশ পেছনে তার অবস্থান। আবার লাইনও এগুচ্ছে না। এ অবস্থায় শ্রাবণীর দিকে এগিয়ে গেল এক যুবক। বিস্তারিত শুনে ওই যুবক শ্রাবণীকে কানে কানে বলল, ম্যাডাম আজ আর আপনি ফরম জমা দিতে পারবেন না। আমাকে ১ হাজার টাকা দিলে আমি জমা দিয়ে দেব।

এ ব্যাপারে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু তাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *