পাইকারি বাজারে চালের দাম কমছে

Slider ফুলজান বিবির বাংলা সারাদেশ

a2ed95af1ef5ca037b4ad119fd6ccaa5-59a817c648852

ঢাকা: ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের তিন মন্ত্রীর বৈঠকের পর চালের দাম কমতে শুরু করেছে। পাইকারি বাজারে ভারত থেকে আমদানি করা মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৫ টাকা কমেছে। চালকলের মালিকেরা সরু ও মাঝারি চালের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা কমিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

অবশ্য খুচরা বাজারে দাম কমার প্রভাব এখনো পড়েনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুচরায় চালের দাম কমতে আরও কয়েক দিন লাগবে।

এদিকে দেশের বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দীর্ঘ সময় পর চাল আমদানি শুরু করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তারা চাল আমদানিতে নেমেছে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও ভারত থেকে চাল আমদানির ঋণপত্র খুলেছে।

 

চালের দাম কমছে

গত মঙ্গলবার সারা দেশের চালকল মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। এ বৈঠকে চালকলের মালিকেরা দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা কমানোর আশ্বাস দেন।

ওই বৈঠকের পর চালের বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি পাইকারি ব্যবসায়ীদের। তাঁরা বলছেন, মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের আগে চালকলের মালিকেরা বেশ কিছুদিন চালের সরবরাহ আদেশ নেওয়া প্রায় বন্ধ রেখেছিলেন। এতে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল যে দাম অনেক বাড়বে। এ কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে চাল কিনে রাখার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, যা বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

ঢাকার বড় চালের বাজার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা সরাসরি কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলা থেকে চাল এনে বিক্রি করেন। ফলে দাম ওঠানামার প্রভাব ওই বাজারে আগে পড়ে। বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রাজা প্রথম আলোকে বলেন, মোটা চালের নতুন দর কেজিপ্রতি ৪৩ টাকা, যা কয়েক দিন আগে ৪৮ টাকা ছিল। মিনিকেট চালের দামও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা কমে ৫৮-৫৯ টাকায় নেমেছে। বিআর-২৮ চালের দাম কমেছে ২ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ৫৩ টাকা দরে।

ঈদুল আজহার পর বাজারে সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল মিনিকেট ও ভারতীয় মোটা চালের দাম। এ সময় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দাম পাইকারি বাজারে ৬২ টাকায় উঠে যায়, যা খুচরা বাজারে ছিল কেজিপ্রতি ৬৫-৬৬ টাকা।

বাবুবাজার-বাদামতলীর চালের আড়ত শিল্পী রাইস এজেন্সির মালিক কাওসার রহমান বলেন, মোটা চালের দাম কেজিতে ৩ টাকার মতো কমেছে। নতুন করে চাল এলে দাম আরও কিছুটা কমবে। কারণ, বেনাপোলে দাম আরেকটু বেশি হারে কমেছে। তিনি বলেন, চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ তাঁর কোম্পানির মিনিকেট চালের দাম ২ টাকা কমিয়ে বস্তাপ্রতি ২ হাজার ৯৫০ টাকা নির্ধারণ করেছেন। অন্যরাও মোটামুটি একই হারে কমিয়েছেন।

বেনাপোল বন্দরে মোটা চালের দাম কয়েক দিন আগে কেজিপ্রতি ৪৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার একই চাল সর্বোচ্চ ৪১ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দাম কমার দিকে থাকায় ক্রেতারা চাল কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।

কারওয়ান বাজারে গতকাল চাল কিনতে গিয়েছিলেন স্থানীয় একটি হোটেলের কর্মী মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, সরু চালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছিল। গত দুই দিনে ২ টাকা কমেছে। এতে বিশেষ কোনো লাভ হবে না।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে প্রথম আড়াই মাসে ১৮ লাখ ৬১ হাজার টন চাল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে এসেছে ৭ লাখ ১৮ হাজার টন চাল।

 

চাল আমদানিতে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী

সম্প্রতি চাল আমদানিতে দেশের যে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো যুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো দেশবন্ধু গ্রুপ।গত দুই মাসে এই গ্রুপ সহযোগী একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ২০ হাজার টন চাল আমদানি করেছে। আমদানির প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও ৩০ হাজার টন চাল।

এ বিষয়ে দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে চাল আমদানি করে সরকারের কাছে সরবরাহ করেছিলাম। এখন সংকটের কারণে আবারও সরকার ও জনগণকে সহযোগিতার জন্যই চাল আমদানি করছি।’ কাস্টমের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ সর্বশেষ চাল আমদানি করেছিল ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর। সিমেন্ট, ইস্পাত, চিনি ও ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানা, ব্যাংক, পরিবহন ও আবাসন খাতের ব্যবসায় যুক্ত এই শিল্প গ্রুপও প্রায় সাড়ে ৭ বছর পর চাল আমদানি শুরু করেছে।

এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, লাভের জন্য নয়, দেশের স্বার্থে চাল আমদানি শুরু করেছেন তাঁরা। ইতিমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলেছেন তাঁরা। এর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার টন দেশে এসে পৌঁছেছে। এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে আরও দেড় লাখ টন চাল আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।

চট্টগ্রামের বিএসএম গ্রুপ ভোগ্যপণ্য আমদানি করে থাকে। তবে সর্বশেষ চাল আমদানি করেছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে। পাটকল, হ্যাচারি, সুতাসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ রয়েছে এই ব্যবসায়িক গ্রুপের। গত আড়াই মাসে গ্রুপটি ৫০ হাজার টন চাল আমদানি করেছে, যা একক আমদানিকারক হিসেবে এখন পর্যন্ত শীর্ষস্থানে রয়েছে।

খুচরা বাজারে দাম কমার প্রভাব এখনো পড়েনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুচরায় চালের দাম কমতে আরও কয়েক দিন লাগবে

বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে চাহিদা না থাকায় এত দিন সেভাবে চাল আমদানি করেননি তাঁরা। এখন যেহেতু চালের চাহিদা রয়েছে, সে কারণে দীর্ঘদিন পর তাঁরা আমদানি শুরু করেছেন। তবে ২৮ শতাংশ শুল্ককর দিয়ে আমদানি করা চালের চালানে তাঁরা লোকসান দিয়েছেন, কিন্তু তারপরও তাঁরা আমদানি বন্ধ করেননি।

বড় ওই তিন শিল্প গ্রুপের মতো পারটেক্স গ্রুপও কয়েক বছর পর চাল আমদানিতে যুক্ত হয়েছে। দুটি চালানে গত জুলাই ও আগস্ট মাসে দেড় হাজার টন চাল আমদানি করেছে গ্রুপটির একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

চট্টগ্রামের চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় শিল্প গ্রুপগুলো চাল আমদানিতে যুক্ত হওয়ায় দেশের বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এতে ধীর ধীরে চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। গত আড়াই মাসে শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই ৩৬টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চাল আমদানি করেছে।

বাজারে চাহিদার কারণে চাল আমদানিতে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গ্রিনগ্রেইন। পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে এই প্রতিষ্ঠান। গত আড়াই মাসে ৩ হাজার টন চাল আমদানি করেছে তারা। গ্রুপের কর্ণধার শাকিল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে চালের সংকটের কারণে চাল আমদানিতে যুক্ত হয়েছেন তাঁরা।

বেসরকারি খাতে আমদানি বাড়ায় চালের দাম কমেছে বলে জানান চাক্তাই ধান-চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনামুল হক। গত বুধবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত কয়েক দিনে স্বর্ণা সেদ্ধ চাল কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৪ টাকা কমেছে। আতপ চালের দাম কমেছে কেজিপ্রতি আড়াই টাকা।

 

শুধু আমদানিতে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করা যাবে

শুধু আমদানি করা চালের ক্ষেত্রে পাটের বস্তার পরিবর্তে পলিথিন বা প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করা যাবে। ওই ব্যাগের গায়ে অবশ্যই আমদানিকারক দেশের নাম ও সময়কাল লেখা থাকতে হবে। গতকাল বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন শুধু চাল আমদানির ক্ষেত্রে তিন মাসের জন্য শিথিল করেছি। তবে অন্য সব পণ্যের ক্ষেত্রে ওই আইন কার্যকর থাকবে। এমনকি স্থানীয় চালকলমালিকদের জন্য পাটের ব্যাগের ব্যবহার এখনো বাধ্যতামূলক আছে।’

চাল আমদানির ক্ষেত্রে পাটের বস্তার পরিবর্তে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহারের অনুমতি দেশের পাটশিল্পকে ধ্বংস করার একটি পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছে পাট ব্যবসায়ীদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল সংগঠনটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় স্বার্থে পাটশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহারে সরকারের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখার দাবি জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে সংগঠনটির সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী প্রথম আলোকে বলেন, পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের ব্যাগের ব্যবহারের ফলে দেশের পাট খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। প্লাস্টিকের ব্যাগের ব্যবহার যদি আবারও শুরু হয়, তাহলে পাট খাত বিপদে পড়বে।

 

নয় দিন বেশি মজুত রাখায় ৮০ হাজার বস্তা চাল জব্দ

চট্টগ্রামে একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ৮০ হাজার বস্তা চাল (প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি করে মোট চার হাজার টন) চাল জব্দ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে (৩০ দিন) গুদামে নয় দিন বেশি মজুত রাখায় এই চাল জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল দুপুরে অভিযান পরিচালনার পর গুদামটি সিলগালা করা হয়। একই সঙ্গে গুদামের ব্যবস্থাপককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এর আগে গত বুধবার চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাদার শিপিং কোম্পানি নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আট দিন বেশি মজুত রেখেছিল চাল।

গতকালের অভিযান শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের বেশি গুদামে চাল মজুত রাখা যায় না। আহমেদ ট্রেডিংয়ের গুদামে এক মাস নয় দিন চাল মজুত ছিল। যে কারণে চাল জব্দ করা হয়।

আমদানি করা চাল কত দিন মজুত রাখা যাবে, তা খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ২০১১ সালের ৫ মে প্রকাশিত এক গেজেটে বলা আছে। ওই গেজেট অনুযায়ী, আমদানিকারকেরা আমদানি পণ্য ৩০ দিন পর্যন্ত মজুত রাখতে পারবেন। আমদানি পণ্যের পরিমাণ ৫০ ভাগ ৪০ দিন পর্যন্ত, ২৫ ভাগ ৫০ দিন পর্যন্ত এবং ২৫ ভাগের নিচে যেকোনো পরিমাণ ৬০ দিন মজুত রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ৬০ দিনের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে আমদানিকারক বিষয়টি সরকার নির্ধারিত কর্মকর্তাকে নির্ধারিত ছকে জানাবেন। অর্থাৎ পণ্য আমদানির পর ধারাবাহিকভাবে বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত মজুত রাখার সুযোগ আছে।

চট্টগ্রামের চাল আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল জব্দ করা চালের আমদানিকারক খাতুনগঞ্জের বিএসএম সিন্ডিকেট। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, বন্দর থেকে খালাস করে গত ১ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ওই গুদামে ৭ হাজার ৬০০ টন চাল রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ধাপে ধাপে ৬ হাজার ৭৪০ টন চাল পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। গুদামে তাঁদের অবিক্রীত চাল রয়েছে ৮৬০ টন। বিক্রি করা সব চাল গুদাম থেকে খালাস নেননি পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *