সিলেটের বড় হাওরদ্বীপ নামে পরিচিত কাঁঠালবাড়ী সৌন্দর্যের এক অপরুপ লীলাভূমি

Slider বাংলার মুখোমুখি
Katalbar-sylhet5
.
হাফিজুল ইসলাম লস্কর, সিলেট প্রতিনিধি :: এই ঈদে ঘুড়ে আসুন কাঁঠালবাড়ী, সারি-সারি গাছ-গাছালী, পাখপাখালির কলতান, খালবিল, পাল তুলা নৌকা আর নৌকায় মানুষের যাতায়াত, জেলেদের মাছ ধরা, দলবন্ধ হাঁসের অবাধ বিচরণ, স্বচ্ছ সাদা পানি, পানিতে শাপলা ফুল , পানির উপরে নীল আসমান, চারিদিকে থৈ থৈ জল, পানির মাঝে হিজল গাছ, কনচ গাছ, চতুর্দিকে উচু নিচু টিলা, টিলার বুকে ছোট-বড় বাড়ী, আরো আছে টিলার মাঝে কাটাল গাছ, পেয়ারা গাছ, অাম গাছ এ সব মিলিয়ে এক একটা টিলা যেন একেকটা আলাদা আলাদা রাজ্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যেন এক অপরুপ লীলাভূমি। এ যেন এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। যা আপনাকে অবশ্যই মুগ্ধ করবে।
আপনারা কি বুঝতে পারছেন কোন জায়গার কথা বলছি, কোন স্থানের কথা বলছি? চিন্তা করছেন এমন স্থান আবার কোথায়? হ্যা বলছি, সেটা ‘‘কাঁঠালবাড়ী”। ভাবছেন কাঁঠালবাড়ী আবার কোথায়? সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা কানাইঘাটের রাজাগঞ্জ ইউনিয়নে এই কাঁঠালবাড়ীর অবস্থান।
নিঝুম ঝকঝকে সকাল। তটিনীর কূলে ডেকে যায় একলা ডাহুক। এমন সকালে শুধু নৌকার বৈঠা আর ইঞ্জিনের শব্দ করছে ছলাৎ ছল ছলাৎ ছল। এমনই এক ঘোর মাখা সময়েই ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম সিলেটের বড় হাওরদ্বীপ নামে পরিচিত কাঁঠালবাড়ী।
কক্সবাজার, সুন্দরবন ও কোয়াকাটার মধ্যে আটকে থাকা এদেশের পর্যটন শিল্প তরুণ পর্যটকদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্রের। বিশেষ করে সিলেটের কথাই যদি বলি তবে এইতো কিছুদিন আগে উন্মোচিত হওয়া রাতারগুল, বিছনাকান্দি, মায়াবন পর্যটন কেন্দ্রে ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকরা।
পাহাড়ে বা গহীন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা সুন্দর্য্যর খুঁজে প্রতিনিয়ত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ছেন তরুণ পর্যটকরা, সন্ধান করছেন নতুন নতুন পর্যটন স্পটের। তারাই আবিস্কার করছেন নতুন নতুন পর্যটন কেন্দ্র। যা ধীরে ধীরে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে তুলছে। এমনি এক পর্যটন কেন্দ্রের সন্ধান পেয়েছেন কানাইঘাটের কিছু সৃষ্টিশীল তরুণরা। তারা খুঁজে পেয়েছেন সিলেটের আরেক রাতারগুল, যার নাম কাঁঠালবাড়ী। রাতারগুল আর কাঠালবাড়ীর মধ্যে রয়েছে অনেকটা মিল। মিল রয়েছে উপজেলার নামের মাঝেও।
রাতারগুলের অবস্থান সিলেটের গোয়াইঘাটে আর কাঠালবাড়ীর অবস্থান সিলেটের কানাইঘাটের রাজার গঞ্জ এলাকায়। শুধু যে ঘাটে ঘাটেই মিল তা নয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও রাতারগুল থেকে কম নয় কানাইঘাটের কাঠালবাড়ীর সৌন্দর্য।
যে কাঠালবাড়ীতে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা ভূমি সেই কাঠালবাড়ীর প্রত্যকটি টিলা সত্যিই যেন আলাদা আলাদা একটি রাজ্য, একেকটি যেন অালাদা অালাদা দ্বীপ। যেখানে নেই কোন যাতায়াত ব্যবস্থা, নেই কোন শিক্ষাব্যবস্থা, নেই কোন সরকারী সুযোগ-সুবিধা। আছে শুধু ভ্রমনকারীদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিটানোর অপরূপ দৃশ্য। অনিন্দ্যসুন্দর বিশাল এ কাঁটালবাড়ীর সঙ্গে অবশ্যই তুলনা চলে সিলেটের রাতারগুলের। কোন অংশেই যেন কম নয় কাঁঠালবাড়ী।
বর্ষায় বড়ই অদ্ভুত এই জলের রাজ্য। কোনো গাছের কোমর পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। একটু ছোট যেগুলো, সেগুলো আবার শরীরের অর্ধেকই ডুবিয়ে আছে জলে। কোথাও চোখে পড়বে মাছ ধরার জাল পেতেছে জেলেরা। ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন যেন অন্ধকার লাগবে টিলাগুলো। মাঝে মধ্যেই গাছের ডালপালা আটকে দিবে পথ। হাত দিয়ে ওগুলো সরিয়ে পথ চলতে হয়। জলের নিচের অপূর্ব জগত। বর্ষায় হাওরের স্বচ্ছ পানির নিচে ডুবে থাকা গাছগুলো দেখার অভিজ্ঞতা অপূর্ব।
কাঁটালবাড়ী টিলায় ঢুকতে হয় ডিঙি নৌকায় চেপে। নৌকা একবার বনে ঢুকলেই আর কথা নেই ! দুটি মাত্র শব্দ লাগবে আপনার ভাব প্রকাশের জন্য, আপনি হয় তো বলে উঠবেন- “আমি মুগ্ধ” ! ইট পাথরের শহর ছেড়ে বারবার যেতে মন চাইবে এমন স্থানে।
সিলেটের সোবহানীঘাট থেকে কানাইঘাট উপজেলার বোরহান উদ্দিন রোড সংলগ্ন রাজাগঞ্জ বাজার থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাঠালবাড়ী। কাঠালবাড়ী পর্যবেক্ষণে গেলে সেখানকার নয়নাভিরাম দৃশ্য নজর কাড়ে পর্যটকদের। যদি হাতে সামান্য একটু সময় থাকে তবে স্বচক্ষে দেখে আসুন আমাদের সম্ভাবনাময় কাঁঠালবাড়ীকে।
রাজাগঞ্জ বাজার হতে পারকুল রাস্তা হয়ে আতলার পাহাড়রস্থ গ্রামের ভিতর দিয়ে কিছুটা আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে যাবার পথে নয়ামাটি গ্রামের লাল মাটি অাপনাকে কিছুটা অবাক করে দিবে। যেখানে থেকে সামনে অগ্রসর হলেই হাওর, সেই হাওরে নৌকা যোগে কাঁঠালবাড়ীর পৌছতে পারেন। নৌকা চলার পথটাও অনেকটা অাঁকাবাঁকা।
আকাঁ বাকাঁ নৌপথ ধরে সামান্য সময় চললেই পৌছে যাবেন কাঠাঁলবাড়ীতে। কাঠাঁলবাড়ীতে পৌছে স্বচ্ছ জলরাশি দেখে ভূলে যাবেন ভ্রমনের সকল ক্রান্তি। কাঁঠালবাড়ী পৌছে কথা হয় এলাকাবাসীর সাথে।
কাঁঠালবাড়ী এলাকার মানুষেরা অভিযোগ করে বলেন , আমাদের কেউ খোঁজ খবর নেন না, আমরা সম্পুর্ণ একটি আলাদা রাজ্য হিসেবে বসবাস করছি। আমাদের নেই কোন শিক্ষাপ্রতিষ্টান, নেই কোন বাজার খরছ করার মাধ্যম। নেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। নেই কোন প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা। একটি মাত্র আনন্দ স্কুল ছিল তাও কেটে নেওয়া হয়েছে। এখন বাচ্চাদের শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম মসজিদের মক্তব।
স্থানীয় হেলাল আহমদ বলেন, আমরা একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারলে, আমরা আনন্দ স্কুলের ব্যবস্থা করে দিতে পারব। এর জন্য সরকারী পদক্ষেপ খুবই দরকার। এখানকার মানুষের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম কৃষি ও মৎস চাষ। এখান থেকে প্রতিবছর সরকার লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব পেয়ে থাকে। বিলগুলো অনেক টাকা নিলাম হয়। বড় হাওর তো প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার মতো নিলাম হয়।
উপস্থিত স্থানীয় সকল জনগণ বলেন, কাঁঠালবাড়ীকে একটি পর্যটন এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে অত্র অঞ্চল অনেক লাভবান হবে। অতঃপর অামরা অাবারো ঘুরতে শুরু করি। এক বাড়ী থেকে অারেক বাড়ী যাবার একমাত্র মাধ্যম ডিঙ্গি নৌকা। প্রত্যেকটি বাড়ীর জন্য রয়েছে অালাদা অালাদা নৌকা। এ নৌকা দিয়েই প্রয়োজনীয় সব কাজ করতে হয় তাদের। প্রতিটি টিলায় ঘুরলে মনে হবে এ যেন এক ভাল লাগার অন্য জগত। মন খারাপ হলে কিংবা পরিবার পরিজন নিয়ে একটু রিলাক্সের জন্য যেতে পারেন সেথায়।
কাঁঠালবাড়ীর নামকরণ: বৃটিশ আমল থেকেই কাঠালবাড়ীতে জনগণের বসবাস। তবে এরা কেউই এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। বিভিন্ন স্থান থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আসা লোকজন এখানে বসতী গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের তালবাড়ী, বীরদল গ্রামের লোকজন সেখানে বসতী স্থাপন করেন। কেননা কাঠালবাড়ীতে এ দুগ্রামের জমি ছিল বেশি। পরবর্তীতে তাদের অনুসরণ করে অনেকই সেখানে পাড়ি জমান। তখন কাঠালবাড়ী এক একটি টিলায় ২৫-৩০টি কাঠালগাছ ছিল। সেই কাঠাল গাছের নামেই এখানকার নাম হয়েছে কাঠালবাড়ী।
যদিও বর্তমানে আগের মতো আর কাঠাল গাছ নেই।
ভৌগলিক অবস্থান: সিলেটের কানাইঘাট এলাকার রাজগঞ্জ ইউপির বোরহান উদ্দিন রোড সংলগ্ন রাজাগঞ্জ বাজার থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাঠালবাড়ী। আবার কাঠালবাড়ী থেকে সিলেটের হরিপুরের দুরত্ত মাত্র ৫ কিলোমিটার। কাঠালবাড়ীর পশ্চিম অংশে বড়হাওর, পূর্ব অংশে কালিজুড়ী, উত্তরে বেতকান্দি হরিপুর, দক্ষিণে রওয়া এবং রাঙ্গাউটি বিল।
যাতায়াত: সিলেট নগরী থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে কানাইঘাট গাজী বোরহান উদ্দিন রোড হয়ে রাজাগঞ্জ যেতে হয়। রাজগঞ্জ ইউনিয়নের বোরহান উদ্দিন রোড সংলগ্ন রাজাগঞ্জ বাজার থেকে গাজীপুর রাস্তা অথবা পারকুল রাস্তা হয়ে নৌকা যোগে পাড়ি দিতে হয় কাঠালবাড়ীতে। রাজাগঞ্জ থেকে গ্রামের আঁকা-বাঁকা রাস্তা দিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট হেটে ইঞ্জিন নৌকা অথবা ডিঙ্গি নৌকায় পাড়ি দিতে হয় কাঠালবাড়ীতে। অথবা সিলেট নগরী থেকে হরিপুর হয়ে যাওয়া যায় কাঠালবাড়ী।
এছাড়াও কানাইঘাট সদর থেকে গাছবাড়ী হয়ে বিভিন্ন পথে সেখানে যাওয়া যায়। গাছবাড়ী নারাইনপুর গ্রাম থেকে নৌকা যোগে, বাঁশবাড়ী থেকে নৌকা যোগে, শহরউল্লাহ হয়ে কাপ্তানপুর গ্রাম থেকে নৌকা যোগে যেতে পারবেন কাঠালবাড়ী। তবে বর্ষাকালে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ছাড়া নৌকা পাওয়া যায় না। সেখানে যেতে হলে স্থানীয়দের সাথে আগেই কথা বলে নৌকার ব্যবস্থা করতে হবে।
জনবসতী: কাঠালবাড়ীতে রয়েছে ৩০টির মত টিলা এরমধ্যে ১৫-১৬টি টিলার মধ্যে বসবাস করে প্রায় ২৫টি পরিবার। কোন কোন টিলায় একটি মাত্র পরিবার আবার কোন কোন টিলায় ৩টি, ৪টি, ৫টি পরিবারও বসবাস করছেন। প্রায় ২০০ জন জনসংখ্যা, ৮০ জনের মত ভোটার, লুন্টির পাহাড় এবং কুচিয়া নামে ২টি মৌজা নিয়ে কাঠালবাড়ী অবস্থান।
স্থানীয়দের তথ্যমতে- এই কাটালবাড়ীর আয়তন তিন কিলোমিটার। বৃটিশ আমল থেকে কাঠালবাড়ীতে মানুষের বসবাস হলেও আজ পর্যন্ত নেই কোন উন্নয়নের ছোঁয়া। রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের অধিভুক্ত এই কাঠালবাড়ীতে কোন জনপ্রতিনিধি যান না বলেই চলে। স্থানীয় ৯০ বছর বয়সের মৌলানা আব্দুল মুকিত বলেন, আমরার ইবায় কোন মেম্বার, চেয়ারম্যান আইন না। আমরার ইতা কেউ দেখেনা।
কাঁঠালবাড়ী কে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলা খুবি জরুরী। এ জন্য প্রয়োজন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, সরকারের সার্বিক সহযোগিতা। তবে অামরা মনে করি স্থানীয় সরকার যদি উদ্দ্যেগ গ্রহণ করেন তবে সরকার অবশ্যই এগিয়ে অাসবেন। কেননা বর্তমান সরকার পর্যটন শিল্পকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই এখনি সময় এ ব্যাপারে উদ্দ্যোগ গ্রহণের।
কিছু সতর্কতাঃ কাটালবাড়ী বা তার আশপাশে খাবারের হোটেল বা থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই খাবার রাজাগঞ্জ বা সিলেট থেকে নিয়ে যেতে পারেন। আরেকটা বিষয়, নৌকায় করে বেড়ানোর সময় পানিতে হাত না দেয়াই ভালো। জোঁকসহ বিভিন্ন পোকামাকড় তো আছেই, বর্ষায় বিষাক্ত সাপও পানিতে দেখতে পাওয়া যায় । সাঁতার না জানলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখা জরুরি।
এ ছাড়া ছাতা, বর্ষাতি কিংবা রোদ টুপিও সঙ্গে নিতে হবে। আরেকটি কথা- পলিথিন, বোতল, চিপসের খোসা, বিস্কুটের খোসা ইত্যাদি জিনিস পানিতে ফেলবেন না দয়া করে। আমাদের নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই।
.
বার্তা প্রেরক
হাফিজুল ইসলাম লস্কর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *