চিকনগুনিয়ার বাবা- —ওমর অক্ষর

Slider সাহিত্য ও সাংস্কৃতি
20289675_1080203082109955_1410032227_n
—বউয়ের প্রতি ভালোবাসা কেমন জানি কমে গেছে! আগের মতো হৃদয়ের সে প্রনয় টানটা আর নেই। মনে হচ্ছে অন্য কেউ ভালোবাসার ভাগ বসাইছে আপন মনে। কি অদ্ভুত ভাবে সময়ের সাথে সব পরিবর্তন হয়ে গেলো। অদ্রি বড় ধরনের কোনো ভুল করে ফেলে, আমি যখন রাগ করতাম, তখন নীল শাড়ী পড়ে এসে বলতো, “দেখতো আমাকে কেমন লাগছে?” আমি হেসে দিতাম। সে আশ্লেষে নীল মিশিসে দিতো আমার কায়ায়! আমার নীলের প্রতি দুর্বলতাটা সে কাজে লাগাতো।
একটা সময় ছিলো তাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারতাম না। এখন ভাবনাও দুই রকম হয়ে গেছে। সম্পর্ক করে বিয়ে করেছি, অদ্রি মা বাবার অমতে আমার কাছে চলে এসেছে। তাই সে ভালোবাসা পাওয়া অধিকার বেশি রাখে। কিন্তু কেন আমি তাকে আগের মতো ভালোবাসতে পারছি না। এ নিয়ে খুবই অপরাধী লাগে নিজেকে। বাবা মার কলিজাটা টেনে ছিড়ে, যে আদরের মেয়েটা কে আমার ঘরে নিয়ে আসলাম শুধু মাত্র ভালোবাসার মালিকানায়। তাকে আজ ভালোই বাসতে পারছি না, ভালো মতো। তাকে আমার বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর আব্বু আম্মু আমাদের সাথে কথা বলতেছিলো না। দুই মাস পর থেকে আম্মু আমার সাথে একটু একটু কথা বলে কিন্তু আমার বউয়ে সাথে কথা বলছিলো না কেউ_____ যে দিন এ কর্মস্থলে আসার জন্য ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বের হবো। ঠিক সে সময় আমি অদ্রির দিকে তাকাতে পাচ্ছিলাম না। তার চোখে ঢেউ ছলছল করছিলো। বাই বলার মনোবল পাচ্ছিলাম না। জড়তা আমাকে চেপে ধরে গলায়। বাই বলার সাথে সাথে অঝরে বর্ষা ঝরবে চোখ ভেঙ্গে। আমি কিছু বলার আগেই অদ্রি জড়িয়ে ধরলো সমর্থ ভাবে। অশ্রুধারায় ভাসিয়ে দিলো আমার বুক। ঠিক বাচ্ছাদের মতো বিলাপ করতে লাগলো। কেপে কেপে বলতে লাগলো আব্বু আম্মুতো আমার সাথে কথা বলে না। তুমি চলে গেলে কেমনে থাকবো একা? ঐ দিকে আমার আমার বাড়িতেও কেউ ফোন ধরে না। ঠিকিতো বলছে অদ্রি। কি নির্দয় নিষ্ঠুর ভাবে তাকে রেখে চলে যেতে চাচ্ছি গাধার মতো। আমি ছুটি বাড়িয়ে তার কিছুদিন পড় বউ নিয়ে ঢাকায় আসছি।
আজ চার বছর হয়ে গেলো দুইটি পরিবারের আমরা এই দুই অপরাধীর। আমি এর ভিতর কয়েক বার আমার গ্রামের বাড়ি গিয়ে সবাইকে দেখে আসছি। কিন্তু আমার বউ অদ্রি এক বারো তার বাবা মার মুখ দেখতে পারেনি। অদ্রি আমার বেচেঁ আছে আমার ভালোবার জন্য। কিন্তু এ ভালোবাসারো আজ ধস নেমেছে! আজ ডিউটি থেকে খুব অতিশীঘ্র বাসাই ফিরলাম। পূর্বে চেয়ে প্রায় দুই ঘন্টা আগে। এতো আগেভাগে ফেরার জন্য অবাক হতে পারে অদ্রি। কলিং ঘণ্টা বাজালাম, ভিতর থেকে পায়ের শব্দ পেলাম। কিন্তু দরজা খুলছে না। আবার পর পর দুই বার কলিং সুইচে চাপ দিলাম। তাও দরজা খুলে দিচ্ছে না। এবার দরজায় কিল দিলাম রেগে। তবুও খুলছে না। এ বার মেজাজটা খুবই তেড়া হয়ে গেলো। কি হয়েছে ভিতরে? বউকে ফোন দিলাম। রিংটনও বাজছে না কি অনাকাঙ্ক্ষিত অদ্ভুত? দরজা ধাক্কা দিবো ভাতেই ধরজা খুলে গেলো। বউ ভিজা চুল নীল তুয়ালে পেচাতে পেচাতে বলো জানু তুমি এতো তাড়াতাড়ি? বউয়ে কথার উত্তর দেয়ার সময় নেয়। এক মুঠো ডেরিমিল্ক পকেট থেকে বের করে অরিণের হাতে দিতেই লাফ দিয়ে গলা ধরে ফেললো। অরিণ বলতে লগলো রাজ্জের সব অভিযোগ। “বাবা বাবা জানো? মা আমাকে আজ আংগুল তুলে ধমক দিয়ে। বলছে চুপ, একদুম চুপ। আমি বলছি বাবাকে বলে দিবো। মা বলছে বলে দিলে মারবো। দেখছো বাবা মা দিনে দিনে কতো দুষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তুমি মাকে বকে দিবে ওকে? আমি ভালো হয়ে যাচ্ছি ঠিক না বাবা? কিন্তু আম্মু পাজি হয়ে গেছে?” আমি বলাম “হুম আম্মু ঠিক বলছো।” মেয়েটা খুবই পাকা পাকা কথা বলে। তার কথা শুনে সারা দিনের ক্লান্তি হারিয়ে যায়। ভুলে যায় ক্লাশ যন্ত্রণা, অকৃতার্থ। তার কথায় যেমন অবাক হয় আবার মাঝে বিভ্রান্তও হয়। তার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। যেমন বলে “আমাদের কি নানা নানী নেই বাবা? তারা কোথায়?” কিছু দিন আগে প্রশ্ন করলো “বাবা ধর্ষণ কি?” এ প্রশ্নের কি উত্তর দিবো? টিভি থেকে শব্দটি শুনছে। আমি বলছি আপাদতত এটা না জানলেও হবে। অরিণ তা মানতে নারাজ। প্রতিটি বাচ্চার কাছে বাবা একজন নায়ক এবং সবজান্তা। তাই সব বাবার কাছে জানতে চায়। আমাকে মনযোগী করতে বাবা বাবা দুই বার বলে, বললো, “আজ আমি ভাত খেয়েছি বাবা। আমার অনেক শক্তি হয়েছে।” মেয়ে তার শক্তি প্রমান করতে আমাকে বিছানাই ফেলে দিলো। চুল টেনে কান টেনে খামছিয়ে আমাকে ঘোড়া বানিয়ে বসে বসে লাফাচ্ছিলো। অরিণের প্রতিটা কমল হাতের স্পর্শ ভালোবাসার এক অন্যরকম আভাস পাই, শান্তি পাই। বাবা হওয়ার আগে বুঝতামনা সন্তানের প্রতি ভালোবাসাটা কেমন? এখন বুঝি এর উপরে ভালোবাসা হয় না। যার জন্য বউয়ের প্রতিও ভালোবাসা কমে গেছে।
 সন্তানের প্রতি ভালোবাসার কোনো উপমা – তুলনা হয় না। আমাদের অরিণের কোন খাবারটা তার সাস্থের জন্য ভালো, সেই খাবারটাই দেই। কোন লোশনটা তার শরীলের সাথে স্যুট করে সে লোশনটা ব্যবহার করি। কোন জামাটা অরিণের মানাবে সে জামাটাই কিনে দেই। অরিণ অসুস্থ্য হলে আমরা মুখে অন্ন দিতে পারিনা। ঘুমাতে পারিনা চিন্তায়। এইতো গত বর্ষায় অরিণের চিকনগুনিয়া হয়েছিলো। তীব্র জ্বর ব্যথা এবং চোখ উঠলো। আমরাতো তার এ অবস্থায় পাগল হওয়ার মতো। আমি ছুটি ডাক্তারের পিছে আর অরিণের মা জায়নামযে বসে দুই চোখের জল ছেড়ে হাত তুলে আরাধনা করে সুস্থ্যতার জন্য। পুরো পুরি সুস্থ্য হতে এক মাসের বেশি লাগলো। সে সময় আমি আমাদের বাসার নিচে দুইশ মিটার পর্যন্ত কোদাল কাঁচি দিয়ে ঝক ঝক করে ফেলেছিলাম। কচু লতাপাতা জঙ্গল কেটে ধ্বংস করেছি হাজার হাজার ডেংঙ্গু মশার আস্থানা। বাড়ীওয়ালা আমার কাজ দেখে সেই খুশি। আর প্রতিটি ফ্লাটে ঢুকে সবার বারান্দার ফুলের টবে পানি আছে কিনা চেক করতাম। আর প্রতিটি দরজায় চিকনগুনিয়া সতর্কীকরণির পোস্টার ছাপিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। এসব কান্ডের জন্য এ ফ্লাটের এখনো সবাই আমাকে চিকনগুনিয়ার বাবা বলে ডাকে। সবার কাছে শুনতে অরিণের মাও এ নামে ডাক দেয় মাঝে মাঝে। সন্তানের প্রতি ভালোবাসার জন্য কতোই না পাগলামি, কতোই না কষ্ট, কতোই না ত্যাগ তিতিক্ষা করছি। মাত্র চার বছর পড়ে বুঝলাম আমরা ভুল করেছিলাম। যেমন অরিণ অসুস্থ্য হলে অন্ন দিতে পারিনা মুখে। ঠিক তেমননি আমার বাবা মাও দিতে পারেনি এবং আমার বাবা মাও কোন খাবারটা আমার সাস্থ্যের জন্য ভালো সেই খাবারটাই দিয়েছে। কোন লোশন আমার শরীরের সাথে স্যুট করে সে লোশনটাই ব্যবহার করেছে। কোন জামাটা আমার সাথে মানাবে সে জামাটাই কিনে দিয়েছে। আমার সাথে কোন মেয়েটা মানাবে নিশ্চয় বাবা মাই ভালো জানে। তারা নিশ্চয় সেরাটা বেছে লাল টুক টুকে বউ নিয়ে আসার স্বপনো দেখে ছিলো। তারা তাদের রক্তের এক টুকরো মাংস কে তিলে তিলে তাদের ঘরে ২৪ বছর লালন পালন করে আমাকে মানুষ বানিয়ে ছিলো। আর আমি অমানুষের মতো তাদের স্বপনো কে মূল্যহীন করে তাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছিলাম। একি ভাবে অরিণের মাও তার বাবা মার আদরের সন্তান ছিলো। সেও তার বাবা মাকে না জানিয়ে বিয়ে করে আমার মতোয় পাপ করেছে।
আমাদের উচিৎ ছিলো বাবা মাকে আমাদের সম্পর্কের কথা জানানো, বুঝানো। তাদেরকে অনুরোধ উপরোধ করা। নিশ্চয় মা বাবা আমাদের ভালোবাসার মূল্যায়ন করতো। অরিণ বড় হয়ে আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করলে আমরাতা মেনে নিতে পারবো? ভাবতেই বুকটা ধুকধুক করে উঠে। ভিতরটা অদৃশ্য কষ্ট মুচুর দিয়ে উঠে। অরিণকে এক দিন তার মা না দেখলে কষ্টে পাগল হয়ে যাবে। আর ৪টি বছর আমার বউকে তার মা বাবা দেখে না। সময় আমাদের অরিণকে উপহার দিয়ে বুঝিয়ে দিছে আমরা ভুল করেছি। মহা ভুল করেছি। এই ভুলকে আর সময় উপঢৌকন করা যাবে না। এবার ঈদের ছুটিতে আমরা বাড়িতে যাবো। আমাদের বাবা মার কাছে ক্ষমা চাবো। প্রয়োজনে চরণে লুটিয়ে ভুল মার্জন করবো। তানা হলে অরণি বড় হলে কি জবাব দিবো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *