প্রেস্টিজ ইস্যু

Slider সারাদেশ

41978_presss

 

নারায়নগঞ্জ;   যতই দিন গড়াচ্ছে ভোটের মাঠে দৃশ্যমান হচ্ছে প্রতিযোগিতা। সাফল্য ঘরে তুলতে হিসাব নিকাশ চলছে দুই শিবিরেই। সিটি নির্বাচনকে প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্যও এক ধরনের মর্যাদার পরীক্ষা। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রায় সবকটি স্থানীয় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হওয়ায় মেয়াদ শেষে এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করে নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতে চাইবে নির্বাচন কমিশন। এদিকে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাদের নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে বিজয় অর্জন করতে হবে। এটি দলের প্রেস্টিজ ইস্যু। একইভাবে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানিয়েছেন, এ নির্বাচনটি বিএনপির জন্য প্রেস্টিজ ইস্যু। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন বেগবান হবে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কয়েকটি সমীকরণকে সামনে রেখে নাসিক নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ‘কৌশলী’ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি সরকারের পরীক্ষা নিতে চায়। দলীয় সরকার এবং ‘অনুগত’ নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সে বিষয়টিকে ‘আরো এক দফা’ প্রমাণ করতে চায় দলটি। মোটকথা, বিএনপি সরকারের আচরণের পরীক্ষা নিতে এ নির্বাচনকে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নিয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে বিএনপিকে কোনো ইস্যু বানাতে দিবে না, এমন চিন্তা নিয়েই এগুচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগ তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে জনপ্রিয়তার বিবেচনায় দলের মনোনয়ন দিয়েছে ডা. সেলিনা হায়াত আইভীকে। কারণ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে এবং দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে আইভীই বিজয়ী হবে। বৃহস্পতিবার রাতেও গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে নাসিক নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে আবারো দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাসিক নির্বাচনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না। আমাদের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। তবে হাইকমান্ডের নির্দেশে নির্বাচন ঘিরে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগ এখনো হতে পারেনি। ফলে মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত আইভীকে নিজ দলের লোকজনকেই আপাতত মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কারণ, বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাড়া জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে আইভীর সঙ্গে দেখা যায়নি। এতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। যদিও মঙ্গলবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে আইভীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য সবাইকে এক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু শুক্রবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের মনোনয়নপত্র জমার সময় বিএনপির সাবেক তিন এমপি, জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, নগর বিএনপির সেক্রেটারি, বন্দর থানা বিএনপির সভাপতির উপস্থিতি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে তুলেছে।
২০১১ সালের ৩০শে অক্টোবরের নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ডা. সেলিনা হায়াত আইভী নির্বাচন করেছেন। যদিও তার পক্ষে আওয়ামী লীগের একটি অংশ সরাসরি মাঠে ছিল। লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে তিনি আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা শামীম ওসমানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচন হন। এরপর শামীম-আইভীর বিরোধে অনেক জল গড়িয়েছে। এক সময় শামীম ওসমানের চালে আইভী শিবির হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। গতবারের নির্বাচনে আইভীর পক্ষে থাকা নেতারা শামীম শিবিরে চলে আসেন। বিরোধ নতুন করে ঢালপালা ছড়ায়। যার চূড়ান্ত ব্যপ্তি ঘটে এবারের নাসিক নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে। তৃণমূল প্রস্তাবিত তালিকায় মেয়র পদে আইভীর নামই পাঠানো হয়নি কেন্দ্রে। আইভীর অভিযোগ ছিল শামীম ওসমানের ইন্ধনে তার নাম কেন্দ্রে যায়নি। ঘটনা আঁচ করতে পেয়ে লিখিতভাবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দলের মনোনয়ন বোর্ডে আবেদন করেন আইভী। শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের প্রস্তাবনা বাদ দিয়ে মেয়র পদে মনোনয়ন বোর্ড আইভীকেই দলীয় মনোনয়ন দেন। চুপসে যায় শামীম শিবির। ক্ষোভ দানাবাঁধে তাদের মধ্যে। আর আকস্মিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠে আইভীর সমর্থকরা। সব দিক চিন্তা করে নারায়ণগঞ্জের নেতাদের ঢাকায় গণভবনে ডেকে নেন দলীয় সভানেত্রী। তাদের নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
দুই শিবিরের নেতাদের নিয়ে বৈঠকের পর নারায়ণগঞ্জের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হন। কিন্তু তাদের স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় মেয়র প্রার্থী আইভীর সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। শুধু ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই, সোনারগাঁয়ের সাবেক এমপি আবদুল্লাহ আল কায়সার, সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমিনুল হক, বিকেএমইর সাবেক সহ-সভাপতি আবদুর রাশেদ রাশু ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকি মঞ্চের রফিউর রাব্বি। এতে নতুন করে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। যদিও এ বিষয়ে আইভী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যেহেতু নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী ৫ জনের বেশি ব্যক্তি মনোনয়নপত্র জমাদানকারীর সঙ্গে আসতে পারবেন না, সেজন্য তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই, ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং রফিউর রাব্বিকে নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যান।
তবে মনোনয়নপত্র জমার দিন নেতাদের অনুপস্থিতি তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। ভাবিয়ে তুলেছে আইভী শিবিরকেও। তাদের মতে, দলের নেতাদের মধ্যে এমন বিভাজন থাকলে নির্বাচনে সুবিধা পাবে প্রতিপক্ষ প্রার্থী। শামীম ও আইভী শিবির ঐক্যবদ্ধ না হলে নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের ভোটাররা। আবার কেউ কেউ বলছেন, শামীম ওসমান আইভীর পক্ষে নামলে ভোট কমবে। বাড়বে না। ফলে বিজয় নিশ্চিত করতে হলে আইভীকেও ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এমনটা বলছেন আইভীর শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তবে দলীয় একটি সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত শামীম ওসমান শিবির ৫ই ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামবেন। যদিও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, আমরা আইভীর পক্ষে নয়, নৌকার পক্ষে মাঠে নামবো। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী ভোটাররা অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী প্রচারণার।
অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বুধবার রাতে গুলশানে নারায়ণগঞ্জের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে সবার কথা শোনার পর বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে দলের মনোনীত প্রার্থী ঘোষণা করেন এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনার প্রতিফলন দেখা গেছে বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমার দিন। অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে আসেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকার, সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামান, নারায়ণগঞ্জের সাবেক তিন সাংসদ আবুল কালাম, মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলকে। এসব নেতার উপস্থিতি দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে তুলেছে। বিএনপির এসব নেতাকে একসঙ্গে অনেক দিন দেখেননি তৃণমূল নেতাকর্মীরা। ফলে বিএনপির সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। তারা আপাতত দলের মধ্যে কোনো প্রকাশ্য বিভাজন দেখছেন না। পুরোদমে তারা নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন। বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নেতাদের এই ঐক্যে বিএনপির ভোট ব্যাংক বাড়বে। কেন্দ্রীয় বিএনপির সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিও নাসিক নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, মানুষ অনেক দিন ধরে বিএনপিকে ভোট দিতে পারছেন না। এবার সুযোগ এসেছে ভোট দেয়ার, যদি সুষ্ঠু ভোট হয়। তাছাড়া এ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনও একাধিকবার নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। খালেদা জিয়ার প্রচারণা বিএনপির ভোটারদের উজ্জীবিত করবে।
তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রকাশ্যে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ঐক্য দেখা গেলেও ভেতরের চিত্র ভিন্ন। কারো কারো মতে, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন দলের কোনো পদপদবিতে নেই। সাত খুনের ঘটনায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে লড়াই করে আলোচনায় এসেছেন। সাখাওয়াত হোসেন নাসিকের মেয়র হবেন এটা অনেক নেতাই চান না।
এদিকে সূত্রমতে, এবার সেলিনা হায়াত আইভীকে দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। নিজের দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে। কারণ, দলের মধ্যে বিভাজন নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *